দশ মাসেও সংস্কার হয়নি বাঘা যতীনের সেই ভাস্কর্য

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুষ্টিয়া
প্রকাশিত: ০৩:৩৫ পিএম, ৩০ অক্টোবর ২০২১

দীর্ঘ ১০ মাস আগে দুর্বৃত্তদের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে অবস্থিত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্রনায়ক বিপ্লবী বীর বাঘা যতীনের ভাস্কর্য। তারপর সেটি আর সংস্কার করা হয়নি। চিঠি চালাচালির মাঝেই আটকে রয়েছে ভাস্কর্যটির সংস্কারকাজ।

গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে দুর্বৃত্তরা উপজেলার কয়া ইউনিয়নের কয়া মহাবিদ্যালয়ের সামনে নির্মিত বাঘা যতীনের ভাস্কর্যটি ভেঙে রেখে যায়। হামলায় বাঘা যতীনের ভাস্কর্যটির মুখ ও নাকের একাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ঘটনার পরদিন কলেজের অধ্যক্ষ হারুন অর রশীদ বাদী হয়ে কুমারখালী থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের নামে মামলা করেন। মামলার পর গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর কয়া ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আনিসুর রহমানকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে তার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে তার সহযোগী যুবলীগ কর্মী সবুজ হোসেন ও হৃদয় আহমেদকে পুলিশ গ্রেফতার করে।

পুলিশ জানায়, কয়া ইউনিয়ন যুবলীগ সভাপতি আনিসুর রহমানই ভাস্কর্যটি ভাঙচুর করার মূল পরিকল্পনাকারী।

কুমারখালী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাকিবুল ইসলাম বলেন, গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর আসামিদের আদালতে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডে তারা পুলিশকে জানায়, কয়া কলেজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জের ধরে অন্য নেতাদের ফাঁসাতে তারা চারজন মিলে পরিকল্পিতভাবে বাঘা যতীনের ভাস্কর্যটি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়েছেন। এ ঘটনার পর আনিসুরকে দল থেকে বহিষ্কার করে কুমারখালী উপজেলা যুবলীগ।

jagonews24

অভিযুক্ত যুবলীগ নেতা আনিসুর রহমান ও তার দুই সহযোগী বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। ঘটনার পর থেকে মামলার অপর আসামি কয়া গ্রামের বাচ্চু শেখ পলাতক রয়েছেন।

এদিকে ভাস্কর্যটি ভাঙচুরের ঘটনার প্রায় দশ মাসের বেশি সময় পার হলেও বিল্পবী বীর বাঘা যতীনের সেই ভাস্কর্যটি সংস্কার বা মেরামত করা হয়নি। চিঠি আদান-প্রদানের বেড়াজালে আটকে আছে ভাস্কর্যটির সংস্কার কাজ।

ভাস্কর্যটি এতদিনেও কেনো সংস্কার করা হয়নি জানতে চাইলে কয়া মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হারুন অর রশীদ বলেন, ভাস্কর্যটি সংস্কার করার জন্য চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি কলেজ অধ্যক্ষ বরাবর জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে সহকারী কমিশনার রিজু তামান্না সই করা একটি চিঠি দেওয়া করা হয়। ওই চিঠিতে শিগগির ভাস্কর্যটি সংস্কার করার জন্য নির্দেশ দেওয়া করা হয়। একইসঙ্গে কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ওই চিঠির অনুলিপি দেওয়া হয়।

আলোচিত এ ঘটনাটি নিয়ে মামলা আদালতে বিচারাধীন থাকায় আইনি জটিলতা এড়াতে কলেজের পক্ষ থেকে গত ৩ মার্চ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কুমারখালী আদালতের বিচারক সেলিনা খাতুনের আদালতে ভাস্কর্যটি সংস্কারের অনুমতি চেয়ে আবেদন করা হয়। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট আদালত গত ৭ মার্চ ভাস্কর্য সংস্কারের অনুমতি দেন।

অধ্যক্ষ হারুন অর রশীদ জানান, আদালতের অনুমতি পেয়ে তিনি ওই দিনই ভাস্কর্যটি সংস্কারের জন্য কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেন। কিন্তু পুুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলার চার্জশিট না দেওয়া পর্যন্ত ভাস্কর্যটি সংস্কার না করায় জন্য অনুরোধ জানানোর কারণে ভাস্কর্যটি সংস্কার করা সম্ভব হচ্ছে না বলে তিনি দাবি করেন।

তবে অধ্যক্ষের দাবি অস্বীকার করে কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুজ্জামান তালুকদার বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে কলেজ কর্তৃপক্ষকে লিখিত বা মৌখিক কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

jagonews24

ভাস্কর্য সংস্কারের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) এসিল্যান্ড তামান্না তাসনিম জানান, তিনি মাত্র কিছুদিন আগে কুমারখালীতে যোগদান করেছেন। মামলাটি যেহেতু আদালতে বিচারাধীন রয়েছে সে কারণে ভাস্কর্য সংস্কার করা নিয়ে আইনি জটিলতা আছে কি না বিষয়টি তার জানা নেই।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, ভাস্কর্যটি এতদিনেও কেনো সংস্কার করা হলো না তা খতিয়ে দেখে যত দ্রুত সম্ভব সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এদিকে দীর্ঘসময় পার হলেও ভাস্কর্যটি সংস্কার না হওয়ায় জেলার সংস্কৃতিকর্মীরা ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।

কুষ্টিয়া জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম বলেন, এটি খুবই লজ্জার ও দুঃখজনক ঘটনা। কুষ্টিয়ার কৃতি সন্তান যে বীরের নাম শুনলে এক সময় ব্রিটিশ শাসক পর্যন্ত ভয়ে কাঁপতো সেই বীরের ভাস্কর্যটি দুর্বৃত্তদের হামলার ক্ষত নিয়ে এভাবে দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকবে এটি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তিনি শিগগির ভাস্কর্যটি সংস্কারের দাবি জানান।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্রনায়ক বিপ্লবী বীর বাঘা যতীনের স্মৃতি ধরে রাখতে কুমারখালী উপজেলা প্রশাসনের অর্থায়নে কয়া মহাবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ২০১৮ সালে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়। খুলনার তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার আব্দুস সামাদ প্রধান অতিথি হিসেবে ভাস্কর্যটি উদ্বোধন করেন।

আল-মামুন সাগর/ইউএইচ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।