পুত্র-কন্যাকে হারিয়ে বাবার বিলাপ, ওষুধে ঘুম পাড়ানো হয়েছে মাকে

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নওগাঁ
প্রকাশিত: ০৪:১০ পিএম, ৩১ অক্টোবর ২০২১

নওগাঁ সদর উপজেলার আরজি-নওগাঁনামা শেরপুর এলাকার টিপু-পারভিন দম্পতির অতি আদরের সন্তান ছিল ফরহাদ হোসেন (৭)। চার মেয়ের পর ঘর আলোকিত করে পৃথিবীতে আসে ফরহাদ। এজন্য পরিবারের সবার অনেক আদরের ছিল সে। এক দুর্ঘটনায় সেই ফরহাদ চিরবিদায় নিয়েছে, তার সঙ্গে চলে গেছে বড় বোন সুরাইয়াও। এ দুই শিশুকে হারিয়ে পরিবারে চলছে শোকের মাতম। মা পারভীন বেগমকে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়েছে। বাবা টিপু মণ্ডল পুত্র-কন্যার শোকে বারবার প্রলাপ বকছেন।

শনিবার (৩০ অক্টোবর) সদর উপজেলার শেরপুর এলাকায় তিন পরিবারের তিন মেয়ে ও এক ছেলে শিশু পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার পর এলাকায় এমনই শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

জানা যায়, শনিবার দুপুর ১২টার দিকে টিপু মণ্ডলের মেয়ে সুরাইয়া (১০) ও ছেলে ফরহাদ হোসেন (৭), আনোয়ার হোসেনের ছেলে আশা (১১), আব্দুস সালামের মেয়ে খাদিজা (৯) এবং আরও দুই শিশু রেদোয়ান ও রাজিয়া গ্রামের মাঠে নালা (ড্রেন) থেকে কাদামাটি তুলে সেখানে খেলা করছিল। পাশেই একটি পুকুর। গত বছর পুকুরটি সংস্কার করা হয়। তবে গত বছর থেকে ওই পুকুরে কেউ গোসল করে না। খেলা শেষে রেদোয়ান ও রাজিয়া বাড়ি চলে আসতে চায়। এসময় অন্যরাও বাড়ি আসার জন্য কাদা পরিষ্কার করতে পুকুরে নামে।

পুুকুরে নামার পর সুরাইয়া, ফরহাদ হোসেন, আশা ও খাদিজা পানিতে তলিয়ে যায়। এসময় রেদোয়ান ও রাজিয়া বাড়ি গিয়ে তাদের পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানায়। পরে এলাকার লোকজন গিয়ে দুপুর দেড়টার দিকে চার শিশুকে উদ্ধার করে নওগাঁ সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। এ সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক ওই চার শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন। রাত সাড়ে ৮টায় তাদের দাফন সম্পন্ন হয়।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পারভীন বেগম ও টিপু মণ্ডল দম্পতির চার মেয়ের পর জন্ম নেয় ছেলে ফরহাদ হোসেন। টিপু মণ্ডল পেশায় ফল ব্যবসায়ী। পারভীন বেগম অন্যের বাসাবাড়িতে কাজ করেন। শনিবার টিপু মণ্ডল শহরের মসজিদ মার্কেট সংলগ্ন ফলের দোকানে ছিলেন। ছেলে ও মেয়ে পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার সংবাদ পেয়ে বাড়ি ছুটে আসেন তিনি।

ঘটনার পর থেকেই পারভীন বেগম অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকেও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি নেওয়া হয়। জ্ঞান ফিরলে ছেলে ও মেয়ের শোকে আহাজারি করতে থাকেন পারভীন। পরে তাকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়। বাবা টিপু মণ্ডল বারবার ছেলে ও মেয়ের শোকে বিলাপ করতে থাকেন।

টিপু মণ্ডলের বড় মেয়ে স্বর্ণা জানান, তারা পাঁচ ভাই-বোন। চার বোনের পর ফরহাদ ছিল সবার ছোট। ঘটনার পর থেকে বাবা-মা শুধু বিলাপ করছে। মা বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলায় তাকে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে।

ফরহাদ হোসেন আরজি নওগাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি এবং সুরাইয়া তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। মারা যাওয়া আরেক শিশু আশা আরজি নওগাঁ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তো। তার দুই ভাইবোন। আশা বড়। বাবা আনোয়ার হোসেন ব্যাটারিচালিত ভ্যানের চালক। ঘটনার পর থেকে আশার মা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

অপর শিশু খাদিজারও দুই ভাইবোন। খাদিজা সবার বড়। তার বাবা আব্দুস সালাম ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি। তার মা-ও বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছেন। স্বজনরা মাথায় পানি ঢালছেন আর সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

স্থানীয়রা জানান, ওই শিশুদের তিন পরিবারই হতদরিদ্র। চার শিশুর জানাজা ও আগত অতিথিদের খাবার খরচ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শাহ পরান নয়ন বহন করেছেন।

সুরাইয়া ও ফরহাদ হোসেনের বড় চাচা মুকুল মণ্ডল বলেন, আমার ছোটভাই টিপু মণ্ডল কষ্ট করে সংসার চালায়। ঘটনার পর থেকে ভাই পাগলের মতো প্রলাপ করছে। যদি সরকার থেকে কোনো সহযোগিতা করা হতো তাহলে অনেক উপকার হতো।

নওগাঁ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মির্জা ইমাম উদ্দিন বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে শিশুদের পরিবারকে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হবে।

আব্বাস আলী/এসআর/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।