যাত্রাশিল্পী ধলু মালিদের খোঁজ রাখে না কেউ
পটুয়াখালী শহরের অদূরে বাদুরা পশুর হাট। সবাই যখন গরু-ছাগল কিংবা মহিষ কিনতে দরদাম নিয়ে ব্যস্ত সেসময় কানে ভেসে আসে বাঁশের বাঁশির সুর। কৌতুহলী মনে কাছে গিয়ে দেখা যায় বুট আর বাদাম বিক্রি করা একজন হকার বাঁশি বাজাচ্ছেন। বাঁশি বাদকের নাম ধলু মালি। বয়স ৭৭ থেকে হয়ত বেশি কম হতে পারে।
এক সময়ে প্রতাপের সঙ্গে যাত্রাদলে অভিনয় এবং বাঁশি বাজালেও এখন আর সেসব যাত্রা দলের অস্তিত্ব নেই। তাইতো পেশা পরিবর্তন করে পেটের তাগিদে ফেরি করে বুট, বাদাম বিক্রি করে কোনোমতে চলে সংসার। তবে বাঁশি আগলে রেখেছেন তিনি।
কথা হয় যাত্রাশিল্পী ধলু মালির সঙ্গে। তিনি বলেন, জীবনে অনেক যাত্রা দলে অভিনয় করছি, বাঁশি বাজাইছি। বিশ্ব শ্রী নাট্য সংস্থা, কহিনুর অপেরা, জয়টুক অপেরা, ভোলানাথ অপেরা, বাবুল অপেরা, দ্বীপালি অপেরা, নিউ বাসন্তি যাত্রা দলের মতো বড় বড় দলে কাজ করছি। আগে বাঁশি বাজিয়ে সংসার চালালেও যাত্রা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় হিন্দুদের বিয়ের অনুষ্ঠানে বাজনা বাজাইতাম। কিন্তু গত দুই বছর করোনার কারণে সেই ব্যাবস্থাও বন্ধ হয়ে গেছে। বাজনা বাদ্য যা ছিলো তা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন আর কী করবো, বাধ্য হয়ে বাজারে বাদাম বিক্রি করি আর সুযোগ পাইলে বাঁশি বাজাই। বাঁশি বাজাইতে ভালো লাগে। মানুষও দাঁড়াইয়া বাঁশির সুর শোনে।
কথাগুলো বলার সময় আবেগে কেঁদে ফেলেন ধলু মালি। বলেন, জীবনের সোনালী দিনগুলোর কথা মনে করলে নিজেকে আর সামলে রাখতে পারি না। বড় একটি ছেলে আছে সে ঢাকায় একটি সেলুনে কাজ করে। ছোট ছেলে, মেয়ে এবং স্ত্রী নিয়ে কোনোরকমে জীবন চলছে তার।
গত কয়েক দশক থেকেই আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে অস্তিত্ব সংকটে যাত্রা দলের শিল্পীরা। তাদের অনেকেই ভালো নেই। অভাব অনটনে থাকা এসব মানুষগুলো অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছেন। আর করোনার দুই বছর এসব মানুষের জীবনকে আরও কঠিন করে দিয়েছে।

এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে শিল্পীদের সহযোগিতা করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও প্রকৃতপক্ষে বঞ্চিত তৃণমূল পর্যায়ের শিল্পীরা। জেলায় কী পরিমাণ যাত্রা দল এবং কত মানুষ এই পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলো এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। যার ফলে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় অসহায় এসব শিল্পীদের সহযোগিতার উদ্যোগ নিলেও প্রকৃতপক্ষে যাদের প্রাপ্য তারা এ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
পটুয়াখালী শিল্পকলা একাডেমি সূত্রে জানা যায়, করোনাকালীন সময় দুই বছরে পটুয়াখালী জেলায় সরকার দুই দফায় ৫ হাজার টাকা করে মোট ৯০ জনকে ১০ হাজার টাকা প্রণোদনা দিয়েছে।
জেলা কালচারাল অফিসার মো. কামরুজ্জামান বলেন, সরকার বিভিন্ন সময় শিল্পীদের সহযোগিতা করে থাকে, তবে ধলু মালির বিষয়টি আমরা অবগত ছিলাম না। এখন যেহেতু এই গুণী মানুষটির বিষয়ে জানতে পারলাম, দ্রুত তাকে সরকারি সহযোগিতা এবং একটি সন্মানজনক পেশা নিয়ে তিনি যেন বেঁচে থাকতে পারেন সে বিষয়ে আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করবো।
আব্দুস সালাম আরিফ/এফএ/জেআইএম