সন্তান হচ্ছিল না শিউলির, সংসার বাঁচাতে নবজাতক চুরি
দিনাজপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল থেকে চুরি হওয়া নবজাতককে উদ্ধার করেছে পুলিশে । এ সময় শিউলি আরা (২৬) নামে এক গৃহবধূকে গ্রেফতার করা হয়। সংসার বাঁচাতে তিনি ওই নবজাতককে চুরি করেন বলে জানান।
চুরি হওয়ার ২২ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার (৪ জানুয়ারি) দুপুর ১২টার দিকে সদর উপজেলার শেখপুরা ইউনিয়নের জয়দেবপুর শাহাপাড়া গ্রাম থেকে নবজাতককে উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতার শিউলি ওই গ্রামের মোস্তাফিজার রহমানের স্ত্রী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সোমবার সকালে প্রসব ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন চিরিরবন্দর উপজেলার কারেন্টহাট এলাকার আব্দুল লতিফের স্ত্রী জায়েদা বেগম (৩৬)। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার কিছুক্ষণ পরই সকাল পৌনে ৯টার দিকে তিনি একটি মেয়ে সন্তান প্রসব করেন। স্বজনরা চলে গেলেও হাসপাতালে থেকে যান প্রসূতির ছোট বোন হাজেরা বেগম।
দুপুরের দিকে হাসপাতালে বোরকা পরিহিত এক নারীর সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে ভাব জমে। দুপুরের খাবারের সময় ওই নারী শিশুটির দেখাশোনা করবেন জানিয়ে দুই বোনকেই একসঙ্গে হাত-মুখ ধোয়ার জন্য বাথরুমে পাঠিয়ে দেন। পরে তারা উভয়েই বাথরুম থেকে ফিরে এসে দেখেন নবজাতকসহ ওই নারীও উধাও। তখন ঘড়িতে প্রায় ২টা।

ওই নারীকে খোঁজাখুঁজি করেও কোন সন্ধান না মেলায় ৩টার দিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়। খবর পেয়ে কোতোয়ালি পুলিশ ঘটনাস্থলে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করে তারা। নবজাতকের পরিবারের কথা ও সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে পুলিশ ওই নারীকে খুঁজতে থাকে।
পরদিন মঙ্গলবার দুপুর ১২ টার দিকে পুলিশ ওই বোরকা পরিহিত নারী শিউলি আরাকে নবজাতকসহ তার বাড়ি তেকে গ্রেফতার করেন। দুপুর ২টার দিকে দিনাজপুর পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন দিনাজপুর হাসপাতালে গিয়ে নিজ হাতে নবজাতকটিকে তার মায়ের কোলে তুলে দেন। এ সময় মায়ের জন্য নিয়ে আসা ফলমূলও তুলে দেয়া হয় তার হাতে।
উদ্ধার হওয়া নবজাতককে তার মায়ের কোলে তুলে দেওয়ার সময় পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন বলেন, আমরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে চুরি হয়ে যাওয়া নব জাতককে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিতে পেরেছি। এ জন্য আমরা আনন্দিত।
তিনি বলেন, আমরা নবজাতককে উদ্ধারের সময় শিউলি আরা নামে এক গৃহবধূকে গ্রেফতার করেছি। তিনি প্রাথমিকভাবে পুলিশকে জানিয়েছেন, তার সংসার বাঁচানোর জন্য নবজাতকটিকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলেন। কারণ দুটি সন্তান হওয়ার পরও তার প্রথম বিয়ে ভেঙে গেছে। দ্বিতীয় বিয়ের পর তার সন্তান না হওয়ায় পরিবার থেকে তাকে বিভিন্ন কথা শুনতে হচ্ছিল। যাতে সংসার ভেঙে না যায় সে জন্য এ নবজাতককে চুপ করে নিয়ে গিয়েছিলেন।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মোজাফফর হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, এখনো তদন্ত চলছে। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের জন্য গ্রেফতার শিউলি আরাকে আদালতে তুলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চাওয়া হবে। রিমান্ড পাওয়া গেলে প্রকৃত ঘটনা নিশ্চিত হওয়া যাবে।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. পারভেজ সোহেল রানা নবজাতকটিকে উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নবজাতক ও তার মা সুস্থ আছে। বুধবার তাদের ছুটি দেওয়া হতে পারে।
সন্তানকে ফিরে পেয়ে ওই নবজাতকের মা জায়েদা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, সোমবার দুপুর থেকে আজ দুপুর পর্যন্ত আমার প্রায় ২২ ঘণ্টা কীভাবে কেটেছে তা আমিই জানি। ১০ মাস যে সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেছি সেই সন্তানকে জন্ম দেওয়ার ৫ ঘণ্টার মধ্যেই হারিয়ে ফেলেছিলাম। এখন আমার বাচ্চাকে ফিরে পেয়ে অনেক ভালো লাগছে। পুলিশ সদস্যরা অনেক কষ্ট করে আমার সন্তান আমার কোলে ফিরিয়ে দিয়েছেন তাই তাদের ধন্যবাদ জানাই। আমি চির কৃতজ্ঞ তাদের কাছে। আর যে আমার বাচ্চাকে চুরি করছিল তার আমি বিচার চাই।
নবজাতকের বাবা আব্দুল লতিফ জাগো নিউজকে বলেন, বাচ্চা হারানোর কথা শুনে আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছিল না আমার বুকের মানিককে চুরি করে নিয়ে গেছে। চুরি হয়ে যাওয়ার পর থেকেই নানান চিন্তা মাথায় ভর করেছিল। নানান অজানা আশঙ্কা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। পুলিশ ভাইয়েরা আমার সন্তানকে সুস্থভাবে ফিরিয়ে দিলো। আল্লাহ যেন তাদের ভালো করেন। এখন আমি অনেক খুশি।
এমদাদুল হক মিলন/এসজে/এএসএম