গাবতলীতে শোকের ছায়া, ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৫৮ পিএম, ০৬ জানুয়ারি ২০২২
বিজিবির গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত ভোটকেন্দ্র

বগুড়ার গাবতলীতে ইউপি নির্বাচনে গুলিবর্ষণে চারজন নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কী এমন ঘটলো যে কারণে বিজিবি সদস্যদের গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এ প্রশ্ন জনমনে।

এদিকে গুলিবর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তাল গাবতলীজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বুধবার (৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যা থেকে ঘরছাড়া বিক্ষুব্ধ লোকজন আজ (বৃহস্পতিবার) ঘরে ফিরেছে। দিনভর সেখানে চলেছে দোষীদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ। উত্তাল জনতার সামনে বিকেল পর্যন্ত কোনো পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি দেখা যায়নি।

অভিযোগের তীর ম্যাজিস্ট্রেটের দিকে
চারজন নিহতের ঘটনায় এলাকাবাসী কালাইহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রের দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেট ও শাজাহানপুর উপজেলার ইউএনও আসিফ আহমেদকে দায়ী করছেন। দফায় দফায় মিছিল করে তার শাস্তিও দাবি করেছেন তারা। বিনা কারণে আসিফ আহমেদ তার সঙ্গে থাকা বিজিবির সদস্যদের গুলি করার নির্দেশ দিয়েছেন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসিফ আহমেদ বলেন, ‘জনগণকে শান্ত করতে সেখানে গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়। তার আগে আমি উত্তেজিত জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করেছি। আমার দেওয়া বক্তব্যের অডিও ও ভিডিও রেকর্ড আছে। জনগণ শান্তি বজায় না রেখে সেখানে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। তিনি বলেন, অন্য আট কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণার পর দেরিতে কালাইহাটা কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণার দাবি করেন তারা। একপর্যায়ে কয়েকশ’ নারী ভোট কেন্দ্রে প্রবেশ করে আমার গাড়িসহ বিজিবির ব্যবহৃত মাইক্রোবাস, ভোট কেন্দ্রের বিভিন্ন কক্ষের দরজা-জানালা ভাঙচুর করে। নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা আত্মরক্ষার্থে প্রিসাইডিং অফিসারের কক্ষে অবস্থান নেন। বিক্ষুব্ধ লোকজন সেই কক্ষে হামলা চালিয়ে দরজা জানালা ভেঙে ফেলে। এমন পরিস্থিতিতে বিজিবি সদস্যরা গুলিবর্ষণে বাধ্য হন। চশমা প্রতীকের প্রার্থী আমার আত্মীয় না, তাকে চিনিও না।

গুলিতে নিহতদের পরিচয়
বালিয়াদিঘী ইউনিয়নের কালাইহাটা মধ্যপাড়ার বাসিন্দা খোকন মণ্ডলের স্ত্রী কুলসুম বেগম (৪০)। নিহত কুলসুম ওই ওয়ার্ডের সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী ছোবেদার নির্বাচনী এজেন্ট ছিলেন। মধ্যপাড়ার মৃত মবদুলের ছেলে আলমগীর হোসেন (৩৫), পশ্চিমপাড়ার মৃত ইফাতুল্লা প্রামাণিকের ছেলে আব্দুল রশীদ (৪৮), উত্তরপাড়ার মৃত ছহির উদ্দিন আকন্দর ছেলে খোরশেদ আকন্দ (৬৫)।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা
আগের বার গাবতলীর বালিয়াদিঘী ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে দায়িত্বরত ম্যাজিস্ট্রেট কেন্দ্রের ভোট শেষ হবার পর উপজেলা সদর গাবতলীতে নিয়ে গিয়ে গণনা করছিলেন। ফলে নৌকার প্রার্থী মাত্র ৮২ ভোটে পরাজিত হন। এবার বালিয়াদিঘী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে তিন প্রার্থী হন। তারা হলেন, আওয়ামী লীগ মনোনীত ইউনুস আলী ফকির (নৌকা), বিএনপি সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহবুবর রহমান (ঘোড়া) ও বিএনপি নেতা সাকিউল ইসলাম তিতু (চশমা)।

গাবতলীতে শোকের ছায়া, ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ এবার চশমা মার্কার প্রার্থী সেখানে দায়িত্বরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসিফ আহমেদের ভায়রার ছেলে। আত্মীয়কে জয়ী করতে গত নির্বাচনের মতো এ নির্বাচনেও ব্যালটবাক্স গাড়িতে তুলে তিনি গাবতলীতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু স্থানীয়রা বাঁধা দেওয়ায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গে তাদের বাগবিতণ্ডার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে স্থানীয়রা প্রতিবাদ করে রাস্তায় শুয়ে পড়ে। এতে করে প্রশাসনের কর্মকর্তারা ভোট কেন্দ্রে আটকা পড়ে।

একপর্যায়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে তার সঙ্গে থাকা বিজিবির মোবাইল টিম ভোটকেন্দ্রের জানালা দিয়ে সাধারণ মানুষের ওপর গুলি ছোঁড়ে। গুলিতে একজন নারী এজেন্ট ও তিনজন নিরীহ পথচারী নিহত হয়েছেন।

নিহতদের পরিবারের বক্তব্য
নিহত রিকশাচালক আলমগীরের স্ত্রী হোসনে আরা জানান, আমার একমাত্র মেয়ে আদুরীকে নিয়ে আমরা বগুড়া জেলা সদরের কৈপাড়ার বাসাভাড়া নিয়ে থাকি। আমার স্বামী শহরে রিকশা চালাতেন। ভোট দিতে আমার স্বামীসহ গ্রামের বাড়ি কালাইহাটাতে এসেছিলাম। আমার স্বামী ভোটের ফলাফল জানতে ভোটকেন্দ্রে গিয়েছিল। গুলির শব্দ শোনার পর পরই আমরা আমার স্বামীর খবর নিতে গিয়ে পথিমধ্যে তার মাথায় গুলি লাগার খবর পাই।

নিহত আলমগীরের বড়ভাই বাবলু মিয়া (৫৮) বলেন, আমার ভাই নিরীহ মানুষ। গুলিতে সে মারা গেছে। এখন আমার ভাবি আর ভাতিজির কী হবে। আমরা হত্যাকারীর ফাঁসি চাই।

নিহত আব্দুর রশিদ প্রামাণিকের স্ত্রী বুলবুলি বেগম (৫০) জানান, তার স্বামী একজন বর্গাচাষী। নিজের ভিটেমাটি ছাড়া তাদের কোনো জায়গা জমি নেই। পরের জমি চাষ করে তাদের সংসার চলে। তার দুই ছেলে এক মেয়ে। ছোট ছেলে কালাইহাটা দাখিল মাদরাসায় সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। বড় ছেলে বাবুল মিয়া ১০ম শ্রেণিতে পড়ে।

তিনি জানান, আমার ছেলে বাবুলকে পুলিশ লাঠি দিয়ে মেরে মারাত্মকভাবে আহত করেছে। সে এখন বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজে (শজিমেক) ভর্তি আছে। আমার স্বামী বাজার করতে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে বিজিবির এলোপাতাড়ি ছোঁড়া গুলিতে সে বিদ্ধ হয়েছে।

নিহত খোরশেদ আকন্দের ছেলে এরশাদ আকন্দ (৩০) জানায়, আমার বাবা শাক বিক্রি করার জন্য বাজারে যায়। শাক বিক্রি করে বাড়িতে ফেরার সময় গুলিবিদ্ধ হন। বাবার মরদেহ পুলিশই ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে নিয়ে যায়। আমার বাবার হত্যাকারীর আমরা ফাঁসি চাই।

নিহত কুলসুম বেগমের স্বামী খোকন মণ্ডল জানান, আমার স্ত্রী কালাইহাটা স্কুল কেন্দ্রের এজেন্ট ছিল। কেন্দ্রের ভেতরেই সে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। পুলিশ ও বিজিবি জানালা দিয়ে অতর্কিতভাবে গুলি করেছে। তারা এলাপাতাড়িভাবে গুলি না করলে কেন্দ্রের মধ্যে আমার স্ত্রী কীভাবে গুলিবিদ্ধ হলো।

গাবতলীতে শোকের ছায়া, ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

আহত শিক্ষার্থীর বক্তব্য
আহত কালাইহাটা উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মেহেদী হাসান জানায়, ভোটের খবর দেখতে গিয়ে ধাওয়া পাল্টার সময় সে পড়ে যায়। এসময় তার শরীরে গুলি লাগে। পরে সে জানতে পারে এগুলো রাবার বুলেট। তার সারা শরীরে গুলির চিহ্ন রয়েছে। মেহেদী হাসানের মা সমাপ্তি আকতার বলেন, আমার ছেলে আহত হয়ে বিছানা থেকে উঠতে পারছে না। পুলিশের হুমকি-ধমকির কারণে কারো কাছে সত্য কথা বলতে পারছি না।

সর্বশেষ পরিস্থিতি
বুধবার সন্ধ্যার পর থেকে কালাইহাটা এলাকায় উত্তেজনা ও ভীতিকর পরিবেশ বিরাজ করছে। এলাকাবাসী বৃহস্পতিবার দিনভর দফায় দফায় দোষীদের বিচার চেয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে। তারা হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবি জানায়। নিহতদের লাশের ময়না তদন্তের জন্য বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মরদেহ স্বজনদের কাছে পৌঁছায়নি। রাত পর্যন্ত নিহতদের পরিবারগুলোকে মরদেহের অপেক্ষায় থাকতে দেখা গেছে।

পুলিশ কর্তারা নীরব কেন?
এলাকাবাসী বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা কেন জনগণকে দমাতে পারেনি। পুলিশ সদস্যরা তাহলে সেখানে নীরব ছিল কেন? এমন প্রশ্ন এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। ঘটনার সময় ভোটকেন্দ্রে একটি মোবাইল টিম ছিল। এছাড়া ভোট কেন্দ্রের নিরাপত্তায় ১৭জন আনসার সদস্য ছাড়াও ৫-৬ জন পুলিশ সদস্য ছিল। তারপরও পরিস্থিতি কীভাবে এতোটা অস্থিতিশীল হলো সেটা বোধগম্য নয়।

গাবতলী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়া লতিফুল ইসলাম জানান, ভোটকেন্দ্রে হামলা ঘটনায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মামলা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করলেও তিনি সংখ্যাটি জানাতে পারেননি। ওই কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসার জাকারিয়া হোসেন বাদী হয়ে এ মামলা করেন।

গাবতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রওনক জাহান বলেন, কালাইহাটা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ শেষ হলেও নৌকার প্রার্থীর সমর্থকরা গণনায় বাঁধা দেন। অন্য কেন্দ্রের ভোট গণনা শেষে তারা ভোটের ফলাফল ঘোষণা করতে বলেন। এতে আপত্তি জানালে নৌকা মার্কার প্রার্থী ইউনুছ আলী ফকিরের সমর্থকরা ভোট কেন্দ্রে হামলা চালান। হামলায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বে থাকা শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আহমেদ ছাড়াও বিজিবি পুলিশের চার সদস্য আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুলি ছুঁড়তে বাধ্য হয়েছিলো।

বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলী হায়দার চৌধুরী জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ হারালে পুলিশ সদস্যরা রাবার বুলেট ছুঁড়েছে। এ বুলেটে কারো প্রাণ যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।

আরএইচ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।