কুমার নদের পুনঃখননে বিলীন হচ্ছে বাড়িঘর

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফরিদপুর
প্রকাশিত: ০৮:৫৩ এএম, ২০ জানুয়ারি ২০২২

গভীর রাত। কান্নাকাটি আর চেচামেচির শব্দ। শিশুসহ নারী-পুরুষের কান্না আর গগনবিদারি চিৎকার। এমন পরিস্থিতি প্রায়ই সৃষ্টি হয় ফরিদপুরের নগরকান্দার কুমার নদ পাড়ে। তবে এটি কোনো স্বাভাবিক নদীভাঙন নয়। অপরিকল্পিতভাবে কুমার নদ পুনঃখননের পর থেকে নদের পাড়ে ব্যাপক ভাঙন শুরু হয়েছে। জেলা সদর, নগরকান্দা উপজেলার কাইচাইল এলাকা ও পৌর এলাকার গাংজগদিয়া ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বেশ কয়েকটি বসত বাড়ি-ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

এসব এলাকায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার গাংজগদিয়া কুমার নদের পাড় ধরে যতোগুলো বসতবাড়ি ও ঘর আছে সবার ঘরে এখন শুধু কান্নার আওয়াজ। কুমার নদ খনন প্রকল্পে অবৈধভাবে অতিরিক্ত বালু ড্রেজার দিয়ে উত্তলন করে বিক্রি করার জন্য এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি। নদের পাড়ের রাস্তা, বাড়ি, মন্দির, গাছপালাসহ প্রায় সবকিছু ভেঙে গর্ভে পতিত হচ্ছে। নদের পাড় ধরে অসংখ্য ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকার প্রতিটি বসতবাড়ি পাকা, আধা পাকাসহ শত শত বাড়ি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি ফরিদপুর সদর থেকে ভাঙ্গা উপজেলা পর্যন্ত ৭৫ কিলোমিটার কুমার নদ পুনঃখননের কাজ করে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সেই কাজ এখনও চলমান। কাজটি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর তত্ত্ববধানে বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে বেঙ্গল গ্রুপ।

jagonews24

গত সপ্তাহে নগরকান্দা উপজেলার পাঁচকাইচাইল এলাকায় নদের পাড়ের বাসিন্দা মো. আশরাফ মাতুব্বর ও সেলিম মিয়ার বসতবাড়ি নদে বিলীন হয়েছে। এ ছাড়াও নগরকান্দা সরকারি এমএন একাডেমি ভবন, থানা ভবন ও বাজারের কেন্দ্রীয় কালি মন্দির ভবনসহ পৌরবাজার এখন বড় ঝুঁকিতে রয়েছে। পৌর বাজার এলাকায় প্রায় ২০০ মিটার এলাকা নিয়ে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। একাধিক স্থানে প্রায় ৩ থেকে ৪ ফুট দেবে গেছে। বাসিন্দারা ভাঙন আতংকের মধ্যে দিন পার করছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত মো. আশরাফ মাতুব্বর জাগো নিউজকে বলেন, প্রথমে আমার বসত ঘরে সামান্য ফাটল দেখা দেয়। ভয় পেয়ে রাতে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে অন্য বাড়িতে ছিলাম। মধ্যরাতে হুড়মুড় শব্দে উঠে দেখি আমার ঘর নদীর ভেতরে চলে গেছে। কি আর করবো সব হারিয়ে পরিবারের লোকজন নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি।

সোমবার (১৭ জানুয়ারি) একই দিনে নগরকান্দা গাংজগদিয়া ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ১০ থেকে ১২টি ঘরবাড়ি ধসে গেছে নদের পেটে।

jagonews24

ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে উজ্জ্বল মালো, আনন্দ মালো, দ্রীজেন মালো, নিত্য মালো, বিকাশ মালো, মোদাশ্বের মাস্টারসহ একাধিক ব্যক্তি জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের বাড়ি-ঘর ধসে পড়েছে। নিরুপায় হয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে আত্মীয় স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। কিন্তু এভাবে কতদিন থাকবো। অপরিকল্পিত খননের কারণে আজ আমাদের এ করুণ দশা। আমরা ভিটে-মাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেলাম। আমাদের এই ক্ষতিপূরণ দেবে কে?

নগরকান্দা পৌরসভার মেয়র নিমাই চন্দ্র সরকারের ভাতিজা সুমন সরকার জাগো নিউজকে বলেন, নদের পাড়ের প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে এমন অবস্থা। প্রায় শতাধিক পরিবার ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
মঙ্গলবার রাতে ১০-১২টি পরিবারের বাড়িঘর ধসে পড়েছে। পৌরসভার কেন্দ্রীয় গঙ্গা মন্দির ধসে পড়ায় বিপাকে পড়েছেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। তাদের পূজা-অর্চনা বন্ধ হয়ে গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বালু বিক্রয়-বাণিজ্য করতে গিয়ে তারা হয়তো বেশি খনন করেছে যার প্রভাব পড়েছে নদের তীরবর্তী খেটে খাওয়া মানুষের উপর।

এদিকে কুমার নদের ভাঙনের কবলে ফরিদপুর শহরের পশ্চিম খাবাসপুর মহল্লার কাড়ালপাড়া এলাকায় গত ১৫ দিনে ১৫টি বসতবাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে আরো প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার।

ওই এলাকার ননী গোপাল বিশ্বাসের বাড়ি থেকে দক্ষিণে শামসুল উলুম মাদ্রাসা পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটারে নদের ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে তিন স্থানে ভাঙন তীব্র। ওই এলাকায় খবির হাওলাদার, নূরুল ইসলাম, আবদুর রাজ্জাকের বসতবাড়িসহ ১৫টি ঘর বিলীন হয়ে গেছে।

এ ব্যাপারে নগরকান্দা পৌরসভার মেয়র নিমাই চন্দ্র সরকার জাগো নিউজকে বলেন, নগরকান্দায় প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকার নদী তীরের শত শত বাসিন্দাদের এই করুণ অবস্থা। সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অপরিকল্পিতভাবে নদ খনন করে শত শত পরিবারকে ভিটেমাটি ছাড়ার অবস্থা করেছে। মূলত অতিরিক্ত টাকার লোভে পরিমাণের চেয়ে বেশি খনন করে ও বেশি বালু উত্তোলনের ফলে আজকের এই দশা।

jagonews24

তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষের এই ক্ষতি পূরণ করে এই কাজে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানাই। এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা জানান তিনি।

এ বিষয়ে ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পার্থ প্রতিম সাহা জাগো নিউজকে বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছি। খুব শিগগিরই আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।

তিনি আরও বলেন, নদ খননের কাজ চলমান থাকবে। তবে যেখানে বাড়ি-ঘর রয়েছে সেখানে আমরা বিষয়টি মাথায় রেখে কম খনন করবো।

এন কে বি নয়ন/এফএ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]