এক বছর ধরে অর্ধেক বেতন পান ১৯৪ গ্রাম পুলিশ

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঝালকাঠি
প্রকাশিত: ০৯:১৫ এএম, ২৪ জানুয়ারি ২০২২

‘১৯৭৬ সালে ৭০ টাকা বেতনে গ্রাম পুলিশে চাকরি নিই। ৪৫ বছরেরও বেশি সময় কাটাইয়া দিলাম। সামান্য সাড়ে ৬ হাজার টাকা বেতন দিয়া বউ পোলাপাইন লইয়া কোনো রকমে বাইচ্যা আছি। অহন বাজারে জিনিসপত্রের যা দাম, তার ওপর পোলাপাইনের লেখাপড়ার খরচ, আর চলতে পারছি না। এর মধ্যে আবার আমাদের রাজস্ব খাত থেকে পাওনা টাকা বছর খানেক ধরে বাকি আছে। এহোন কেমনে চলমু এই বাজারে?’

জীবনযুদ্ধের কথাগুলো বলছিলেন ঝালকাঠি সদর উপজেলার বাসন্ডা ইউনিয়নের গ্রাম পুলিশ বৃদ্ধ ওয়াজেদ আলী। শুধু ওয়াজেদ আলীই নন, তার মতো এমন কষ্টের কথার সায় দেন দফাদার আ. সোবাহান, সৈয়দ আলী, আ. মতিন, নান্না তালুকদার, নুরুল ইসলাম, জয়নাল, আ. মান্নান, চান মিয়া ও নেপাল।

তারা জানান, সাধারণ মানুষের কাছে তারা দফাদার ও চৌকিদার নামে পরিচিত হলেও তারা গ্রামীণ ট্যাক্স কালেকশন, জন্ম-মৃত্যুর তালিকা প্রণয়ন, ভিজিভি-ভিজিএফ বণ্টন, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা বিষয়ে অনুসন্ধান ও তালিকা প্রণয়ন, ইউনিয়ন পরিষদের নোটিশ জারি, পুলিশের সঙ্গে আসামি ধরার কাজ, নির্বাচনী ডিউটি পালনের কাজ করেন।

এছাড়া যেকোনো সরকারি অনুষ্ঠানের চিঠি বিলি, রাতে পাহারা দেওয়া, নিজস্ব এলাকার আইনশৃঙ্খলা শান্ত রাখা, এলাকার অপরাধ সাধ্যমতো সমাধান করা, ইউপি চেয়ারম্যানের নির্দেশে পরিষদের দায়িত্ব পালন, থানার অর্পিত দায়িত্ব পালন, রুটিন অনুযায়ী পরিষদের পাহারার দায়িত্ব পালন ও নিয়মিত থানায় হাজিরা দেয়াসহ ৭০ ধরনের কাজ করেন। কোনো ছুটি নেই। কিন্তু বেতন মাত্র সাড়ে ৬ হাজার টাকা।

বেতনের অর্ধেক সরকারি কোষাগার (রাজস্ব) ও বাকি অর্ধেক ইউনিয়ন পরিষদ অফিস দেয়। রাজস্ব অর্ধেক আবার প্রায় একবছর ধরে বাকি আছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় জীবনঝুঁকি নিয়ে রাত-দিন দায়িত্ব পালনকারী এসব গ্রাম পুলিশ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

jagonews24

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ঝালকাঠি সদর উপজেলার ৯৮ জন গ্রাম পুলিশ ১২ মাস ধরে ও নলছিটি উপজেলার ৯৬ জন গ্রাম পুলিশ ৭ মাস ধরে স্থানীয় রাজস্ব খাত অংশের বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না।

জেলার ৪টি উপজেলার মধ্যে রাজাপুর ও কাঠালিয়া উপজেলার গ্রাম পুলিশেরা নিয়মিত সব ধরনের বেতন-ভাতা পেলেও ঝালকাঠি সদর ও নলছিটি উপজেলার ২১ জন দফাদার ও ১৭৩ জন চৌকিদারসহ ১৯৪ জন গ্রাম পুলিশ তাদের বেতন-ভাতা না পাওয়ায় পরিবার নিয়ে নিদারুন অর্থাভাবে দিন কাটাচ্ছেন।

সদর উপজেলার কয়েকজন গ্রাম পুলিশ জানান, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সদর উপজেলার ৯৮ জন গ্রাম পুলিশের পুরো ১২ মাসের বেতন-ভাতা বাবদ ৫২ লাখ ৬৩ হাজার ২শ টাকা বেতন-ভাতা বকেয়া রয়েছে। এরমধ্যে প্রতি দফাদারের মাসে ৭ হাজার টাকা বেতনের মধ্যে স্থানীয় রাজস্ব খাত অংশের ৩৫শ ও ভাতা ১২শ টাকাসহ মোট ৪হাজার ৭শ টাকা বকেয়া রয়েছে। একই ভাবে প্রতি চৌকিদারের মাসে ৬ হাজার ৫শ টাকা বেতনের স্থানীয় রাজস্ব খাত অংশের ৩ হাজার ২শ ৫০টাকা ও ভাতা ১২শ টাকাসহ মোট ৪ হাজার ৪শ ৫০ টাকা পর্যন্ত বকেয়া রয়েছে। এতে গত এক বছরে দফাদার প্রতি ৫৬ হাজর ৪শ টাকা ও ১০ জন দফাদারের ১২ মাসে ৫ লাখ ৬৪ হাজার টাকা বেতনভাতা বকেয়া রয়েছে। একই ভাবে চৌকিদার প্রতি ৫৩ হাজার ৪শ টাকা হিসাবে ৮৮ জন চৌকিদারের ১২ মাসে ৪৬ লাখ ৯৯ হাজার ২শ টাকা বেতন-ভাতা বকেয়া রয়েছে।

অন্যদিকে নলছিটি উপজেলা সূত্রে জানাগেছে, নলছিটির ৯৬ জন গ্রাম পুলিশের ২০২১ সালে ৭ মাসের বেতনভাতা বাবদ মোট ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫০ টাকা বকেয়া রয়েছে। এরমধ্যে প্রতি দফাদার মাসে ৪ হাজার ৭শ টাকা হিসাবে ৭ মাসে ৩২ হাজার ৯শ টাকা করে ১১ জন দফাদারের মোট ২ লাখ ৩০ হাজার ৩শ টাকার বেতনভাতা বকেয়া রয়েছে। আর প্রতি চৌকিদার মাসে ৪ হাজার ৪শ ৫০ টাকা ও ৭ মাসে ৩১ হাজার ১৫০ টাকা হিসাবে ৮৫ চৌকিদারের বেতনভাতা ২৬ লাখ ৪৭ হাজার ৭শ ৫০ টাকা বকেয়া রয়েছে বলে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে ঝালকাঠি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাবেকুন্নাহার গত বছর করোনার কারণে স্থানীয় রাজস্ব আয় কম হওয়ায় কিছু টাকা বকেয়া হওয়া কথা স্বীকার করে জানান, এ ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসনের আন্তরিকতায় কোনো ঘাটতি নেই বরং শিগগিরই তাদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আতিকুর রহমান/এফএ/জিকেএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]