কাঁদছে তিন প্রজন্ম

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফরিদপুর
প্রকাশিত: ১০:১৮ এএম, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২

ফরিদপুরের নগরকান্দার জীবন কুমার শীল। তার বয়স প্রায় ৯১ বছর। দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে কাজ করছেন নরসুন্দরের। বর্তমানে জীবন কুমার শীলের ছয় ছেলে এবং নাতিপুতি মিলে ৩৫ সদস্যের পরিবার। উপজেলা সদরে গার্লস স্কুলের সামনের সড়কের পাশে একই দোকানে তার ছয় ছেলে ও নাতিরাও করছেন নরসুন্দরের কাজ। এই দোকানটিই তাদের আয়ের একমাত্র অবলম্বন।

জীবন কুমারের পৈত্রিক ভিটা ছিলো পাশের গ্রাম জগদিয়া বাইলা গ্রামে। বাবার ৩ শতক জমির সঙ্গে আরো ১০ দশক জমি কিনে কোনোরকম একটি ভিটে তৈরি করেছেন। জমিজমা বলতে কতোটুকুই। সেখানেই বসবাস করছেন ছয় ছেলেসহ ৩৫ জন নাতিপুতি নিয়ে। আর এতো বড় পরিবারটির একমাত্র আয়ের উৎস নরসুন্দরের দোকান।

তবে হঠাৎ যেন জীবন কুমার শীল ও তার পরিবারের ওপর নেমে এসেছে কালো মেঘ। গার্লস স্কুল সংলগ্ন তার দোকানের পেছনে পুকুর ভরাট করে সম্প্রতি অনেকগুলো দোকান ঘর তৈরি করা হয়েছে। এল প্যাটার্নের ওই বিপণী বিতানে প্রবেশের মূল পথটি গার্লস স্কুলের সড়ক লাগোয়া। তবে মার্কেটের একেবারে উত্তর-পশ্চিমে একটি বাইপাস পথ তৈরির পরিকল্পনা আছে। সেজন্য সেখানকার কতিপয় যুবক জীবন কুমার শীলকে দোকান ছেড়ে দিতে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।

একেবারেই নিরীহ গোছের এই পরিবারটি এতে নিদারুণ ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। উপার্জনের সম্বল হারানোর ভয়ে নির্ঘুম রাত কাটছে তাদের। ঘুম হারাম হয়ে গেছে পরিবারটির সদস্যদের।

সোমবার (৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে সরেজমিনে গিয়ে পরিবারটির সঙ্গে কথা বলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন জীবন কুমার শীল, তার ছেলে ও নাতিরা। তারা জাগো নিউজকে বলেন, উপজেলা ভূমি অফিস থেকে ২০ বর্গমিটারের এই জমি ফি বছর একসনা বন্দোবস্তের ভিত্তিতে গত প্রায় ৫০ বছর যাবত তারা এখানে নরসুন্দরের দোকান করছেন। নরসুন্দরের পেশা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। এখন তাদেরকে এই দোকান ছেড়ে দিতে বলছে সেখানকার কতিপয় ব্যক্তি।

তারা বলেন, এই দোকানটি হারালে তাদের আয়ের সব পথ বন্ধ হয়ে পথে বসতে হবে। তারা এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সুদৃষ্টি কামনা করেন।

এ ব্যাপারে নগরকান্দা বাজারের পার্শ্ববর্তী ভূসিমাল ব্যাবসায়ী বলরাম সাহা জাগো নিউজকে বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে জীবন কুমার শীল এখানে দোকান করছেন। তিনি খুবই নিরীহ প্রৃকতির মানুষ। তার ছেলেরাও বাবার মতো একই পথে জীবিকা উপার্জন করছেন।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে দেশের গৃহহীনদের জমিসহ ঘর দিচ্ছেন। বর্তমানে আমাদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও প্রধানমন্ত্রীর এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। আমরা তাকে যে সময়টুকু পেয়েছি তাতে মনে হয় না তিনি এই অসহায় পরিবারের ক্ষতি হয় এমন কিছু করবেন। আমরা আশা করবো তিনি বিষয়টি মানবিক দিকে থেকে বিবেচনা করবেন।

এ বিষয়ে জীবন কুমার শীল জাগো নিউজকে বলেন, এককভাবে আমার দোকান জুড়ে বাইপাস পথ তৈরি না করে আশপাশের অন্যদের থেকে অল্প জায়গা নিয়ে একটি চলাচলের সরু গলি তৈরি করা হোক। এটাই আমার বিনীত অনুরোধ। এতে অন্তত আমার দোকানটি উচ্ছেদ করতে হবে না।

এ প্রসঙ্গে নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জ্যেতি প্রু বলেন, পরবিারটিকে কোনোভাবেই উচ্ছেদ করার কোনো পরিকল্পনা নেই। তবে সেখানে নতুন মার্কেট তৈরির পর জীবন কুমারের দোকানটি দিয়ে একটি বাইপাস পথ তৈরির প্লান রয়েছে। ওই পরিবারটিকে এজন্য দোকান ছাড়তে হবে। তারপরও আমি নিজে সেখানে গিয়ে পরিবারটির সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলেছি।
তিনি আরও বলেন, প্রথমে আমি তাদেরকে নতুন মার্কেটের একটি পজিশন দিতে চেয়েছি। দোকানের পেছনেই ওই পজিশনটি নিতে তারা প্রথমে রাজিও হয়েছিলো। ওই পজিশনটি নিতে একজন জনপ্রতিনিধি আগ্রহী ছিলো। আমি ওই জনপ্রতিনিধিকে বাদ দিয়ে সেটি জীবন কুমার শীলদের দিতে চেয়েছি। তবে প্রথমে তারা রাজি হলেও এখন রাজি হচ্ছে না। সমস্যাটি এখানেই হয়েছে।

জীবন কুমার শীলের দোকানটির পুরো অংশজুড়ে বাইপাস পথ তৈরি হলে এই পরিবারটিকে পথে বসতে হবে জানালে ইউএনও বলেন, বিষয়টি নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

এন কে বি নয়ন/এফএ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।