বলেশ্বরে ইলিশের নতুন প্রজনন এলাকা চিহ্নিত

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি চাঁদপুর
প্রকাশিত: ০৭:৪৮ পিএম, ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২

দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বলেশ্বর নদী ও সাগর মোহনা অঞ্চলের প্রায় সাড়ে সাত হাজার বর্গকিলোমিটারকে ইলিশ মাছের নতুন প্রজনন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় এটি হবে ইলিশের পঞ্চম প্রজনন ক্ষেত্র।

বুধবার (৯ ফেব্রুয়ারি) বিষয়টি জাগো নিউজকে নিশ্চিত করেন নদী কেন্দ্র, চাঁদপুরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুসারে, এরই মধ্যে মায়ানী-মীরসরাই, পশ্চিম সৈয়দ আওলিয়া পয়েন্ট-তজুমুদ্দিন, গন্ডামারা-বাঁশখালী এবং লতা চাপালি কলাপাড়া এলাকার মোহনা অঞ্চলে আরও চারটি প্রজনন এলাকা শনাক্ত করা হয়েছে। নতুনভাবে বলেশ্বর নদীর প্রায় ৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এবং ৩৪৮ বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত অঞ্চল নিয়ে পঞ্চম প্রজনন ক্ষেত্রের প্রস্তাব করা হয়েছে।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইলিশ গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক এম এ বাশার জাগো নিউজকে বলেন, ইলিশ গবেষণা জোরদারকরণ প্রকল্পের আওতায় ২০১৮-২১ মেয়াদে বলেশ্বর নদীতে ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইনস্টিটিউটের ইলিশ বিজ্ঞানীরা গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করেন। গবেষণায় জাটকার প্রাচুর্যতা, পানির ভৌত-রাসায়নিক গুণাগুণ, প্ল্যাঙ্কটন ও গাট কনটেন্ট, মাছের শ্রেণী-দৈর্ঘ্য, প্রতি ইউনিটে মাছ ধরার প্রচেষ্টা, প্রজননোত্তর ইলিশের হার পর্যবেক্ষণ করা হয়।

গবেষণার তথ্য মতে, বলেশ্বর নদী ও মোহনা অঞ্চলে পানির গুণাগুণ ইলিশের প্রাকৃতিক প্রজননের জন্য অনুকূলে রয়েছে। বিশেষ করে বলেশ্বর নদীর মোহনা অঞ্চল ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীটির মোহনা অঞ্চল হাব (কেন্দ্রস্থল) আকারে বিস্তৃত। এই হাব দিয়ে বলেশ্বর ছাড়াও বিষখালী, পায়রা, আন্ধারমানিক ও লতাচাপালী নদীতে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ বঙ্গোপসাগর থেকে নদীর উজানে প্রবেশ করে। এই নদীর পূর্ব অংশে সুন্দরবনের নদী ও খালসমূহ (ভোলা নদী, বেতমোরি গাঙ, সুপতি খাল, দুধমুখী খাল ও ছোট কটকা খাল) সংযুক্ত রয়েছে। বলেশ্বর নদী হয়ে ইলিশসহ অন্যান্য মাছ এসব খাল ও নদীতে প্রবেশ করে।

প্রস্তাবিত প্রজনন এলাকার মধ্যে বাগেরহাট জেলার শরণখোলা উপজেলার বগী বন্দর থেকে বাগেরহাট জেলার শরণখোলা উপজেলার পক্ষীরচর সংলগ্ন পয়েন্ট পর্যন্ত এবং পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার সাপলেজা থেকে পটুয়াখালী (বরগুনা জেলার সীমানা সংলগ্ন) জেলার কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপালী ইউনিয়নের লেবুর বাগান পয়েন্ট পর্যন্ত।

গবেষকরা তাদের তিন বছরের গবেষণালদ্ধ ফলাফল অনুযায়ী প্রস্তাবিত প্রজনন এলাকায় বছরওয়ারী ডিমওয়ালা মাছের সংখ্যা যথাক্রমে ৬৫, ৬৯ এবং ৫১ শতাংশ, ডিম ছাড়ারত (ওজিং) মাছের সংখ্যা যথাক্রমে ৪৯, ৫৫ এবং ৪৩ শতাংশ এবং ডিম ছেড়ে দেওয়া (স্পেন্ট) মাছের সংখ্যা যথাক্রমে ৪৫, ৫০ এবং ৪০ শতাংশ নির্ণয় করেন। এছাড়া প্রজননত্তোর ইলিশ মাছের হার যথাক্রমে ৪৫, ৫০ এবং ৪০ শতাংশ শনাক্ত করা হয়। একইভাবে নিষিক্ত ডিমের সংখ্যা যথাক্রমে ৩ হাজার ৮২২, ৪ হাজার ৫০৮ এবং ২ হাজার ৬৬৬ কেজি নিরূপণ করা হয়।

এ জন্য ইলিশসহ অন্যান্য মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বলেশ্বর নদীতে প্রজনন ক্ষেত্র দ্রুতই ঘোষণা করা প্রয়োজন। বলেশ্বর নদী ও মোহনা অঞ্চল প্রজনন ক্ষেত্র ঘোষণা ও সুরক্ষা করা হলে প্রতিবছর অতিরিক্ত প্রায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন অধিক ইলিশ উৎপাদিত হবে। যার বাজর মূল্য প্রায় ২৬৪ কোটি টাকা।

নদী কেন্দ্র চাঁদপুরের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের গবেষকদল দীর্ঘ তিন বছর সেখানে গবেষণা করে বলেশ্বর নদীসহ আশেপাশের এলাকাটিকে প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। এ পর্যন্ত যে কয়টি জায়গাকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে তার উপকার আমরা পাচ্ছি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক আবহাওয়া ও প্রকৃতির অনেক পরিবর্তন ঘটে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে এখন এলাকাটিকে ইলিশের প্রজনন ক্ষেত্র হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। জায়গাটি একেবারে সুন্দরবন সংলগ্ন। বর্তমানে জায়গাটি সংরক্ষণ খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, আগেও বলেশ্বর নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। তবে তখন সেখানে ইলিশ ছিল অরক্ষিত। তাই প্রজনন বাড়ানোর লক্ষ্যে সেখানেও অভয়াশ্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এছাড়া অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হলে সেখানকার স্থানীয় মানুষ ও জেলেরা আরও সচেতন হবে এবং তাদের সরকারি প্রণোদনার আওতায় নিয়ে আসা হবে। বঙ্গোপসাগরের নিকটবর্তী নদী হলেও বলেশ্বর নদীর ইলিশ মিঠাপানির ইলিশ হিসেবেই গণ্য করা হবে। কারণ, ইলিশ সাধারণত মিঠাপানিতে প্রজননের উদ্দেশ্যে আসে।

গবেষক ড. আনিছুর রহমান বলেন, আমরা একটি প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। তবে আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মা ইলিশ রক্ষা কার্যক্রম থেকে সেখানে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা যেতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে কিছু অফিসিয়াল কার্যক্রম রয়েছে যা এখনো সম্পন্ন হয়নি। ওই জায়গা যদি সংরক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা যায় তাহলে শুধু ইলিশ নয় সব প্রজাতির দেশীয় মাছের উৎপাদন বাড়বে। সে ক্ষেত্রে আনুমানিক ২৬৪ কোটি টাকার উৎপাদন বাড়বে বলে আমরা ধারণা করছি।

নজরুল ইসলাম আতিক/এসজে/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।