টেলিভিশনের পর্দা নয়, ডুলাহাজারায় মিলবে সাফারির সাধ

সায়ীদ আলমগীর
সায়ীদ আলমগীর সায়ীদ আলমগীর
প্রকাশিত: ০২:৩৩ পিএম, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

ছোট ছিদ্রের লোহার জালবেষ্টিত গাড়িতে খাঁচায় আবদ্ধ জন দশেক প্রকৃতিপ্রেমী। সবুজের মাঝে পাকা সড়কে ছুটে চলেছে সেই গাড়ি। হঠাৎ সামনে পড়ে গাড়িটি ঘিরে ধরেছে বাঘ কিংবা সিংহের দল। গর্জন করে পা তুলে মানুষের ছোঁয়া নিতে চাইছে হিংস্র এ প্রাণিকূল।

কল্পনার এমন দৃশ্য বাসার টেলিভিশনের পর্দার ডিস্কভারি চ্যানেলের কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে পাঠকদের। বাস্তবে এ দৃশ্য অবলোকন করাতে পরিপূর্ণ সাফারিতে ফেরার পরিকল্পনায় এগুচ্ছে কক্সবাজারের ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক।

প্রতিষ্ঠার পর থেকে আবদ্ধ করে রাখা বাঘ-সিংহকে প্রকৃতির মাঝে ছেড়ে দিয়ে সত্যিকারের সাফারি পার্ক করার উদ্যোগে কাজ চলছে। বাঘ-সিংহের পাশাপাশি অন্য প্রাণিগুলোও সম্পূর্ণ মুক্ত করে বিচরণের ব্যবস্থা করতে চলছে সুউচ্চ দেয়াল ও নিরাপত্তাবেষ্টনী এবং স্বয়ংক্রিয় ফটক নির্মাণ কাজ।

jagonews24

দ্রুত গতিতে এগুনো প্রয়োজনীয় সব কর্মকাণ্ড সম্পন্ন হলে আগামী বছরের শেষের দিকে উন্মুক্ত বা সাফারির লক্ষ্য ছুঁতে পারার আশা করছেন পার্কের তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) মো. মাজহারুল ইসলাম।

সাফারি পার্কের ইনচার্জ মো. মাজহারুল ইসলামের মতে, দেশের প্রথম সাফারি পার্ক ডুলাহাজারা। মূলত সাফারি পার্ক শিক্ষার্থী ও প্রকৃতি গবেষকদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে সহায়ক। সাফারি বলতে বোঝায় পার্কে থাকা প্রাণীগুলো উন্মুক্ত থাকবে, আর দর্শনার্থী থাকবে খাঁচায় আবদ্ধ। চলন্ত গাড়িতে ঘুরে তারা বন্যপ্রাণি দেখে নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলি পূর্ণ করবেন। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো সেভাবে সাফারি পার্ক গড়ে তোলা যায়নি।

jagonews24

তিনি আরো বলেন, আমরা দক্ষিণ এশীয় পদ্ধতিতে পার্ক চালিয়ে আসছি। পার্কে থাকা প্রতিটি প্রাণীর জন্য আলাদা বেষ্টনী রয়েছে। রয়েছে আলাদা খাবার সংরক্ষণ ব্যবস্থা ও পরিচর্যা এবং নিরাপত্তা কর্মী। প্রতিষ্ঠার দু’যুগে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কটি এতদঞ্চলের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার বেড়ানো এবং বিনোদনের অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে বার্ষিক পিকনিক ও পারিবারিক মিলন মেলা করতে আসছে অনেক শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান। তাই পার্কের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হচ্ছে নতুন করে। এসব সম্পন্ন করার সঙ্গে সঙ্গে বাঘ-সিংহ ও অন্য তৃণভোজি প্রাণিগুলোকে মুক্তভাবে থাকার ব্যবস্থা করে সাফারিতে ফেরার প্রকল্প চলছে।

ইতোমধ্যে ৫৫ হেক্টর বনভূমিতে বাঘের জন্য বিচরণ ক্ষেত্র তৈরির কাজ চলছে। সেই বেষ্টনীর চারপাশে তৈরি হচ্ছে পরিচর্যাকারী পর্যবেক্ষণ পথ। লোহার জালিকে প্রায় ২৫ ফুট উঁচু করে বিশেষ কায়দায় গড়া হচ্ছে নিরাপত্তা বেষ্টনী। একইভাবে ৭৫ হেক্টর ভূমিতে বিচরণক্ষেত্র পাচ্ছে সিংহ। শতাধিক হেক্টর বেষ্টনী গড়া হচ্ছে জেব্রা, ওয়াইল্ডবিস্ট, গয়াল, বনগরু, হরিণসহ অন্য তৃণভোজি প্রাণিদের জন্য।

jagonews24

পুরো পার্কে রয়েছে হরিণের বিচরণ। বাঘ ও সিংহ যেন প্রাকৃতিকভাবে শিকার করে খাবার আহরণ করতে পারে সেই লক্ষ্যে বাঘ ও সিংহ বেষ্টনীতে এখন থেকেই হরিণ প্রজনন বাড়ানো হচ্ছে। প্রকৃতির ছোঁয়া দিতে যত ধরনের অবয়ব দরকার সবটাই করার উদ্যোগ চলছে।

পার্ক সূত্র মতে, ১৯টি বেষ্টনীর মধ্যে সংরক্ষিত আছে বিচিত্রসব প্রাণী। পার্কের ভেতরে নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তায় উন্মুক্ত ও আবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে হাতি, বাঘ, সিংহ, জলহস্তি, গয়াল, আফ্রিকান জেব্রা, ওয়াইল্ডবিস্ট, ভাল্লুক, বন্য শুকর, হনুমান, ময়ূর, স্বাদু ও লোনা পানির কুমির, সাপ, বনগরুসহ দেশি-বিদেশি নানা প্রজাতির প্রাণী। পার্কজুড়ে রয়েছে চিত্রা, মায়া, সম্বর ও প্যারা হরিণ। রয়েছে নাম জানা-অজানা বিচিত্র ধরনের কয়েকশ ধরনের পাখি।

jagonews24

এর পাশাপাশি পার্কে দেখা মেলে কালের সাক্ষী বিশালাকার দুর্লভ ও মূল্যবান বৃক্ষরাজি। সেসব গাছেই বানরের লাফালাফি নজর কাড়ে দর্শনার্থীদের। বিশেষভাবে পুলকিত করে শিশুদের।

jagonews24

কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চকরিয়ার মালুমঘাট এলাকায় ১৯৯৯ সালে পথচলা শুরু ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের। ভেতর-বাইরে ৯০০ হেক্টর আয়তন নিয়ে যাত্রা করা পার্কে বিপুল পরিমাণ মাদার ট্রিসহ (গর্জন) রয়েছে নানা প্রজাতির বনজ গাছ। শুরু থেকেই সবুজের সমাহারে দৃষ্টিনন্দন পরিবেশের পার্কটি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের সহায়ক হওয়ার পাশাপাশি আশপাশ এবং বিভিন্ন এলাকার মানুষের বিনোদনের অনুষঙ্গ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। সপ্তাহের মঙ্গলবার ছাড়া বাকি ৬ দিন দর্শনার্থীদের উচ্ছ্বাস মিশে যায় প্রাণিকূলের কোলাহলের সঙ্গে।

এফএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।