মৃতপ্রায় ইছামতি ঘিরে স্বপ্নে বিভোর পাবনাবাসী
হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী আবারো ইছামতি নদীতে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে পানি উন্নয়ান বোর্ড। রোববার (২৭ ফেব্রুয়ারি) ডিসি রোড আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সামনে থেকে রায় বাহাদুর গেটের পেছন পর্যন্ত এই উচ্ছেদ অভিযান চলে। এতে দখল ও দূষণে মৃতপ্রায় ইছামতি আবার তার প্রাণ ফিরে পাবে বলে আশা পাবনাবাসীর।
বিপুল সংখ্যক র্যাব ও পুলিশ সদস্যের উপস্থিতিতে রোববার দিনব্যাপী অভিযানে নদীপাড় দখল করা দ্বিতল এবং তিনতলা ভবনসহ ১০০টি অবকাঠামো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাইফুল্লাহ, নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম চৌধুরী ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) কাউসার হাবিব।
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাইফুল্লাহ জানান, এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। পর্যায়ক্রমে ইছামতির ৩৩৪ জন তালিকাভুক্ত অবৈধ দখলদারের প্রায় সহস্রাধিক অবকাঠামো উচ্ছেদ করা হবে।
২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি পাবনা সদর, আটঘরিয়া, সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ইছামতি নদীকে কেন পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হবে না তা জানতে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে সি.এস. ম্যাপ অনুযায়ী নদীর সীমানা নির্ধারণপূর্বক অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করে কেন তাদের উচ্ছেদ করা হবে না, ক্ষতিকর স্থাপনা অপসারণ করে কেন নদীর প্রবাহ বৃদ্ধি করা হবে না এবং কেন নদী দূষণ রোধ করা হবে না তা জানতে রুল জারি করেন।

বিচারপ্রতি এম এনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চ বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) কর্তৃক দায়েরকৃত এক জনস্বার্থমূলক মামলার ( নং ১০৭/২০২০) প্রাথমিক শুনানি শেষে ওই রুল জারি করেন। একইসঙ্গে ইছামতি নদীর দখলকারীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে আগামী তিন মাসের মধ্যে আদালতে দাখিলের জন্য ৪, ৭, ৯, ১০, ১১, ১৩, ১৪, ১৫ এবং ১৬ নং বিবাদীগণের ওপর নির্দেশনা দিয়েছিলেন আদালত।
অনুসন্ধানে গেছে, পাবনা সদর উপজেলার ভাঁড়ারা ইউনিয়নের ভাঁড়ারা নামক স্থানে এবং হেমায়েতপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ রামচন্দ্রপুর নামক স্থানে দুইটি স্লুইচ গেট তৈরির পর থেকে এ নদীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। নির্মিত স্লুইচ গেট দিয়ে পর্যাপ্ত পানি প্রবেশ না করতে পারায় এ নদীর প্রবাহ কমে পাবনা শহর এলাকায় নদীটি ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। দুর্গন্ধযুক্ত আবদ্ধ পানিতে জন্ম নিচ্ছে মশা-মাছি। নদী দখল করে উভয় পাড়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন স্থাপনা, বাড়ি-ঘর ও কল-কারখানার বর্জ্য, পয়োঃবর্জ্য এ নদীতেই ফেলা হচ্ছে নিয়মিত।
পাবনা শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ৫ কিলোমিটার বদ্ধ ইছামতি নদী প্রায় দু’ লাখ শহরবাসীর ব্যবহৃত বর্জ্যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীটির অর্ধেকের বেশি জায়গা এখন প্রভাবশালীদের দখলে। দীর্ঘদিন ধরে এ জেলার মানুষ নদীটি দখলমুক্ত করে খননের দাবিতে আন্দোলন করছে। পাবনা শহরে অসংখ্যবার মানববন্ধন, কাফনের কাপড় গায়ে অনশন কর্মসূচি পর্যন্ত পালন করা হয়েছে।

আন্দোলনের মূল দাবিসমূহ হচ্ছে- নদীদস্যুদের অবৈধ দখল থেকে ইছামতিকে মুক্ত করতে হবে, খনন করে নদীর গভীরতা বৃদ্ধি করতে হবে, নদীর পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে, দুই পাশের পাড় নিশ্চিত করতে হবে (পায়ে হাঁটা রাস্তাসহ), দুই ধারে বসার ব্যবস্থা করে নগর পরিকল্পনা করতে হবে, কলকারখানার বর্জ্য শোধন ছাড়া নদীতে ফেলা যাবে না, ক্লিনিকাল বর্জ্য কোনোমতেই নদীতে ফেলা যাবে না, শহরের যানজট কমাতে আধুনিক নৌযান সার্ভিস চালু করতে হবে, নদীকে পর্যটন মডেল পরিণত করতে হবে, শোভা বর্ধনের জন্য নদীর দু‘ধারে ঔষধিবৃক্ষসহ বনায়ন করতে হবে।
উল্লেখিত দাবিসমূহ এলাকাবাসী বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর উপস্থাপন করে ব্যর্থ হয়ে ইছামতি রক্ষায় আইনগত সহায়তা চেয়ে পরিবেশবাদী সংগঠন ‘বেলা’ বরাবর আবেদন জানালে ‘বেলা’ হাইকোর্টে মামলা দায়ের করে। সেই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকার্টের নিদের্শনা অনুযায়ী উচ্ছেদ অভিযান চলছে।
খোজ নিয়ে জানা গেছে, পাবনা থেকে বেড়া পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ নদীর প্রায় অর্ধেক এখন নর্দমা ও বেদখল। এর মধ্যে পাবনা পৌর এলাকার মধ্যে রয়েছে ৫ কিলোমিটার। দীর্ঘকাল ধরে মরা খালে পরিণত হওয়া নদীটির দখল এবং দূষণ রোধে কোনো সরকারই কোনো সময়ই কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। অথচ প্রতিবারই স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনী প্রচারণায় ও ইশতেহারে নদীটি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু বারবার উপেক্ষিত এই মরা নদীটি পাবনা শহরবাসীর জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, বাংলার নবাব ইসলাম খাঁ (১৬০৮-১৬১৬ খ্রিষ্টাব্দ) দায়িত্ব পালনকালে সৈন্য পরিচালনার সুবিধার্থে পদ্মা ও যমুনা নদীর সংযোগ স্থাপনার্থে পাবনা শহরে একটি খাল কাটেন, যার নাম দেন ইছামতি। স্বাধীনতার পর কয়েক বছর প্রবাহমান এই নদী ছিল পাবনাবাসীর জন্য আশির্বাদ। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার প্রিয় বজরা বা বোটে চড়ে ইছামতি নদী নিয়ে লিখেছিলেন কবিতা।
কিন্তু এক সময় নদীর দুই পার দখল করে বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার মহোৎসব শুরু হয়। শহরের সকল বাসা বাড়ি, হোটেল রেস্তোরাঁর আবর্জনা, ক্লিনিকের যাবতীয় বর্জ্য ও আবর্জনা যায় ইছামতিতে। মৃত নদীটি এখন পরিণত হয় ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে।
পাবনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্র জানায়, ২০০৩ সালে ইছামতি নদী জরিপ কমিটির আহ্বায়ক তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক দাবিরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক জরিপ থেকে জানা যায়, সেসময় ২৮৪ জন অবৈধ দখলদার চিহ্নিত করা হয়। ২০১১ সালে কিছু জমি দখলমুক্ত করাও হয়। কিন্তু ফের বেদখল হয়ে যায়। এরপর আইনি জটিলতায় ইছামতি নদী আর দখলমুক্ত হয়নি।
পরিবেশবিদ অধ্যাপক রফিকুল হাসান বলেন, ইছামতি নদী মরে যাওয়ার বিরূপ প্রভাবে পাবনা শহরকে এখন বসবাসের অযোগ্য মনে করা হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে বিশুদ্ধ পানির সংকটের পাশাপাশি দূষিত বাতাসে নিঃশ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। নদী কেন্দ্রিক ফসল উৎপাদনও প্রায় বন্ধ।

পাবনা পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ পেয়ে গত ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ইছামতি নদী খননে সামান্য কিছু কাজ করেছিল পাবনা পৌরসভা। সামান্য বরাদ্দে ইছামতি নদী খনন করে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হয়নি। এজন্য দরকার বৃহৎ পরিকল্পনা।
ইছামতি নদী উদ্ধার আন্দোলনের আহ্বায়ক এস.এম. মাহবুব আলম জানান, ২০১৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে তারা সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। ইছামতি নদী উদ্ধার করে পানির প্রবাহ নিশ্চিতসহ ১০ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তারা ইতোমধ্যে ২২টি মানববন্ধন, লিফলেট বিতরণ,গণসমাবেশ এবং গণস্বাক্ষর নেওয়ার কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করলে নদীটি দখলমুক্ত হবে এবং প্রাণ ফিরে এলে লাখ লাখ শহরবাসী স্বাস্থ্যকর পরিবেশ পাবে।
এফএ/জিকেএস