সৈকত নয়, সাফারি পার্কেই আগ্রহ উপকূলবাসীর

সায়ীদ আলমগীর
সায়ীদ আলমগীর সায়ীদ আলমগীর কক্সবাজার
প্রকাশিত: ১১:৪৩ এএম, ০২ মার্চ ২০২২

তারেকুল ইসলাম সোহেল পেশায় ব্যবসায়ী। পাইকারি বিকিকিনির ফার্মেসির ব্যবসা তার। জীবন রক্ষার পণ্যের ব্যবসা করেন বলে সপ্তাহের সাতদিনই তার দোকান খুলতে হয়। ফলে পরিবারকে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। এ নিয়ে পরিবারের অন্দরমহলের লোকগুলোর অভিযোগের শেষ নেই। তাই মাস তিনেক পর পর বাড়ির কাছাকাছি ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে আসেন স্বপরিবারে।

পার্কের পাখি বেষ্টনী এলাকায় দেখা হলে এসব কথা বলেন ঈদগাঁওর ইসলামপুর এলাকার বাসিন্দা এ ব্যবসায়ী।

সোহেলের মতে, ১৯৯৯ সালে পথচলা শুরুর পর থেকে এতদঞ্চলের কর্মব্যস্ত মানুষগুলোর পরিবারিক বিনোদনের নির্ভরতা হয়ে উঠেছে চকরিয়ার মালুমঘাট ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক। জেলার অধিকাংশ লোকজন উপকূলবর্তী এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় সৈকত তীরে তেমন কেউ যান না। চিংড়ি ঘের, নদীর জল নিয়ে যাদের নিত্য জীবন তারা সমুদ্রের ঢেউকে নদীর জলের চলাচলই ভাবেন। ফলে সাফারি পার্কের প্রকৃতি, পশু-পাখি ও নানা ধরনের প্রাণিকূলের সান্নিধ্যকে উপভোগ্য মনে করেন সিংহভাগ স্থানীয়রা।

শুধু স্থানীয়রা নন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার পর্যটক কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত দেখে ফেরার পথে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে আসছেন। আসেন বিদেশি পর্যটকও। ঈদ, পূজা-পার্বণ ও বিশেষ দিবসগুলোতে থাকে পার্কে উপচে পড়া ভিড়।

zoo1

দৃষ্টিনন্দন পরিবেশের পার্কটি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানার্জনের সহায়ক। পার্কের প্রথম গেটে প্রবেশ করেই বাম পাশে রয়েছে প্রকৃতি বীক্ষলকেন্দ্র ও ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম। ওখানে ঢুকে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে শিক্ষার্থী ও পর্যটকরা জীববৈচিত্র্য ও প্রকৃতি থেকে বিলুপ্ত প্রাণী সম্পর্কে সহজেই ধারণা নিতে পারে। দর্শনার্থীরা পার্কের অভ্যন্তরে মনের আনন্দে মাদারট্রির ছায়ায় হরেক রকম গাছগাছালি, লতা গুল্ল, দেশি-বিদেশি পশুপাখী, সাপ, কুমির কচ্ছপসহ জীববৈচিত্র্য ঘুরে ঘুরে দেখেন।

ভেতরে ঢুকে দেখা গেলো, আগত নারী-পুরুষ-শিশু দর্শনার্থীরা প্রফুল্ল মনে শতবর্ষী গর্জন ও বাঁশ ঝাড়ের ভেতর দিয়ে যাওয়া পিচঢালা পথে জীববৈচিত্র্য উপভোগ করছেন। ঘন জঙ্গলের ভেতর হাঁটতে গিয়ে পিনপতন নীরবতায় দর্শনার্থীদের গা যেন শিউরে ওঠে। ঝিঁ ঝিঁ পোকা এবং পাখির কিচির মিচির শব্দে ভাঙে সেই নীরবতা।

পার্কের ভেতর পথের দু’পাশে খাঁচায় আবদ্ধ প্রাণী ও পাখী শালায় দেখছেন হরেক রকম প্রাণী। দেখছেন বাঘ, ভাল্লুক, সিংহ, সাম্বার, মায়া হরিণ, চিতা, খরঘোশ, বানর, শিয়াল, লামচিতা, উল্টোলেজী বানর, হনুমান, বনবিড়াল, উটপাখী, ময়ূর, দোয়েল, ময়না, বনমোরগ, সারষ, টিয়া, বাজপাখী, জলহস্তি, কুমির, কচ্ছপ ও অজগরসহ নানা ধরনের প্রাণী। বিদেশি প্রাণী জেব্রা, ওয়াইল্ড বিস্ট, কদু, স্প্রিংবক পর্যটকদের নজর কাড়ছে। আনন্দ বাড়াচ্ছে হাতিশাবক যমুনা।

zoo1

বাড়তি আনন্দ পার্কের ভেতরের স্বচ্ছ পানির বিশাল প্রাকৃতিক জলাশয়। লেকের ধারে বিচরণরত হরিণের দল যেন সুন্দরবনের আবহ এনে দেয় দর্শনার্থীদের মনে। দর্শনার্থীদের অনেকের বাচ্চা হাতির পিঠে চড়ছে। আবার কেউ সুউচ্চ পর্যবেক্ষণ টাওয়ারে উঠে অবলোকন করছে সাফারি পার্কের চারপাশ।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া থেকে আসা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা হাবিবাহ সুলতানা বলেন, অনেকের কাছ থেকে শুনে আগ্রহ নিয়েই পার্কে এসেছিলাম। প্রকৃতির মাঝে থাকতে আনন্দ লেগেছে কিন্তু এক বেষ্টনী থেকে অন্য বেষ্টনীতে হেঁটে পৌঁছাতে বেগ পেতে হয়েছে। ভেতরে কোথাও কোনো খাবারের দোকান নেই, নেই পানি পানের ব্যবস্থা। ছোট বাচ্চা ও বয়োবৃদ্ধদের নিয়ে যারা এসেছেন তারা ভোগান্তি পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, হরিণ, জলহস্তি, হাতি, কুমির, বাঘ, সিংহ ও আবদ্ধ পাখিগুলো দেখা গেলেও বিদেশি জেব্রা ও ওয়াইল্ডবিস্ট দেখতে পারিনি। পরিচর্যাকারীরা বলেছেন সেসব প্রাণি পূর্ব প্রান্তে অবস্থান করছে। এতদূর পায়ে হেঁটে যাওয়া সাহসে কুলায়নি। তবে হরিণগুলো গৃহপালিত প্রাণির মতোই কাছে এসে ধরা দিয়েছে বার বার।

zoo1

সাফারি পার্কের ইজারাদার সজীব এন্টারপ্রাইজের মালিক ফজলুল করিম জানান, করোনাকালে পুরো পার্ক দর্শনার্থী শূন্য ছিলো। এখন প্রায় প্রতিদিন কয়েকশ দর্শনার্থী আসছেন। এখানে আসা অধিকাংশ দর্শনার্থী স্থানীয়। সিংহভাগ পরিবার নিয়ে আসেন। প্রাপ্তবয়স্ক ৫০ টাকা আর ৫ বছরের উপরে শিশু-কিশোরদের জন্য ২০ টাকা হারে টিকিট মূল্য রাখা হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য প্যাকেজ হিসেবে প্রবেশ মূল্য নির্ধারণ করা। ১০০ শিক্ষার্থী এলে ৫০০ টাকা আর ২০০ জন হলে নেওয়া হয় ৮০০ টাকা। দর্শনার্থী নিরাপত্তায় পার্কের ভেতর টুরিস্ট পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। এরপরও দর্শনার্থী সংখ্যা বাড়লে নেওয়া হয় বাড়তি নিরাপত্তা।

সাফারি পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, করোনাকালের পর থেকে স্বাভাবিক সিডিউলের সবকিছু এলোমেলো হয়েছে। এখন অত্যাধুনিক রূপে গড়ে তোলা হচ্ছে পার্কটি। নেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় নানা অবকাঠামো গঠন প্রকল্প। এক বেষ্টনী থেকে অন্য বেষ্টনীর দূরত্ব কমাতে নির্মাণ হচ্ছে সংযোগ সড়ক। বিদেশি ও বন্যপ্রাণি খোলাভাবে দেখার ব্যবস্থা করতে করা হচ্ছে আলাদা সাফারি।

তিনি বলেন, পার্কের ভেতর আগে ক্যান্টিন থাকলেও দীর্ঘদিন দর্শনার্থী শূন্য থাকায় পার্কে অনেক কিছু এখন নেই। সামনে কভিড-১৯ পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে সকল সুযোগ সুবিধা পূর্বের নিয়মে চালু হবে। আমাদের লক্ষ্য ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক একটি উৎকৃষ্টমানের পর্যটন স্পট হোক।

এফএ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।