৭ টাকায় মাসজুড়ে পানি পাচ্ছেন বরেন্দ্র এলাকার বাসিন্দারা

আব্বাস আলী
আব্বাস আলী আব্বাস আলী , জেলা প্রতিনিধি নওগাঁ
প্রকাশিত: ০৭:১২ পিএম, ২২ মার্চ ২০২২
সাবমার্সিবল পাম্পের মাধ্যম আসা পানি পান করছে শিশুরা

বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে পরিচিত নওগাঁর সাপাহার, পোরশা ও নিয়ামতপুর উপজেলা। খরার সময় দৈনন্দিন কাজে মানুষের একমাত্র ভরসা ছিল পুকুর এবং কুপের পানি। তবে চৈত্র-বৈশাখ মাসে ফুরিয়ে যায় সে পানি। শুরু হয় দুর্ভোগ।

তবে ২০১৭ সাল থেকে কমিউনিটি পানি সরবরাহ প্রকল্পের মাধ্যমে এসব অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ লাঘব হয়েছে। তাদের আর কূপ বা পুকুরের পানির অপেক্ষায় থাকতে হয় না। এমনকি পানি আনতে পাশের গ্রামেও যেতে হয় না। এখন বাড়ির উঠানেই ৭-১৫ টাকায় মাসজুড়ে বিশুদ্ধ সুপেয় পানি পাচ্ছেন বরেন্দ্র অঞ্চলের বাসিন্দারা।

গ্রামাঞ্চলে শতভাগ মানুষের নিরাপদ পানি নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার। এ লক্ষে শতভাগ নিজস্ব অর্থায়নে সরকার গ্রামাঞ্চলে ‘নিরাপদ পানি সরবরাহ’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ২০২৫ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে জানা গেছে।

নওগাঁ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলাধীন নিম্ন পানির স্তর এলাকায় কমিউনিটি ভিত্তিক পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় ২০২১-২২ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ হাজার ৫০টি এবং ২০১৯-২০ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৫১৬টি পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি পাম্পের বরাদ্দ ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। একটি পাম্প থেকে আটটি পরিবার সুবিধা ভোগ বা পানি ব্যবহার করতে পারবে।

jagonews24

বরেন্দ্র ভূমি সাপাহার, পোরশা ও নিয়ামতপুর উপজেলায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ২০০-৩০০ ফুট গভীরে। এসব এলাকায় নলকূপ বসিয়ে পানি পাওয়া দুষ্কর। তবে কিছু কিছু এলাকায় নলকূপ বসিয়ে বর্ষাকালে পানি পাওয়া গেলেও চৈত্র-বৈশাখে থাকে না। পানির জন্য তাদের পুকুর, ডোবা কিংবা কুপের ওপর নির্ভর করতে হতো। চৈত্র মাসে পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়। নারী-পুরুষদের এক থেকে দুই কিলোমিটার দূরে গিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হতো। বর্তমানে বরেন্দ্র এলাকায় পানির অভাব দূর হয়েছে কমিউনিটি ভিত্তিক পানি সরবরাহ প্রকল্পে।

গ্রামে গ্রামে সাবমারসিবল মোটরের সাহায্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এ পানি উঁচু স্থানে ট্যাংকি বসিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। পরিবর্তীতে ওই পানি ট্যাংকি থেকে নলের সাহায্যে বাড়ি বাড়ি ট্যাপকলের মাধ্যমে ব্যবহৃত হচ্ছে। কেউ ট্যাংকির নিচে প্রধান ট্যাপকল থেকে পানি সংগ্রহ করছে, আবার কেউ বাড়ির উঠানেই ট্যাপকলেই পানি নিচ্ছে। এখন আর দূর দূরান্তে কলসি, জগ বা বাটি নিয়ে পানির জন্য ছুটতে হয় না। আবার কূপের পানিও খেতে হয় না। এ পানি খাবারের পাশাপাশি গৃহস্থালির কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে।

পোরশা উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নে বড়-রোনাইল গ্রামের বাসিন্দা ও কমিউনিটি ভিত্তিক পানি সরবরাহ প্রকল্পের সভাপতি আরিফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, এ কমিটির আওতায় আটটি পরিবারে ৪০ জন্য সদস্য রয়েছে। গত ২০দিন থেকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল থেকে দেওয়া সাবমার্সিবল পাম্পের সুবিধা ভোগ করছি। এরআগে আমরা কূপ (ইন্দারা) থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতাম। আমাদের গ্রামে পাঁচটি কূপ আছে। গত বছর প্রায় দেড় মাস তিনটি কূপে পানি ছিল না। পানির জন্য আমাদের খুবই কষ্ট করতে হয়েছে। বর্তমানে পানির কষ্ট দূর হয়েছে। খাবারের পাশাপাশি গৃহস্থালির কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে।

সাপাহার উপজেলার তিলনা ইউনিয়নের অরুনপুর গ্রামের বাসিন্দা রাব্বানী জাগো নিউজকে বলেন, চৈত্র-বৈশাখ মাসে কূপে পানি পাওয়া যেত না। সে সময় পুকুরের ঘোলা পানিও আামাদের খেতে হয়েছে। এমনকি গ্রামের বউ-ঝিদের প্রায় আধা কিলোমিটার দূর থেকে দিঘির পানি নিয়ে এসে রান্না করতে হয়েছে। আমরা সেখানে থেকে গোসল করে এসেছি। নলকূপ বসিয়েও পানি পাওয়া যায়নি। গত তিন বছর আগে গ্রামে দুটি সাবমার্সিবল পাম্প বসেছে। বর্তমানে গ্রামে সাবমার্সিবল পাম্পের সংখ্যা আটটি। আমাদের পাম্পের আওতায় ৬০ পরিবার ৩৬০ জন ছোট-বড় সবাই সুবিধা ভোগ করছি।

তিনি আরও বলেন, অনেকে বাড়ির ভেতরে ট্যাপের লাইন টেনে নিয়েছে। মহিলারা এখন আর পুকুর ঘাটে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। পুকুরঘাট নাই বললেই চলে। বিদ্যুৎবিল পরিশোধে মাসে জনপ্রতি ৭টাকা চাঁদা ধরা হয়েছে। কোনোদিন ভাবিনি এমন সুবিধা আমরা পাবো।

jagonews24

উপজেলার ওমরপর আদর্শ গ্রামের আতোয়ার রহমান জাগো নিউজকে বলেন, গত দুবছর আগে গ্রামের জনসংখ্যা ছিল ১৪০ জন। সে সময় গ্রামে একটিমাত্র কূপ ছিল। যার গভীরতা প্রায় ২০০ ফুট। খরা মৌসুমে পানি প্রায় তলায় চলে যেত। আর বর্ষাকালে ১৫-২০ হাত নিচে পানি পাওয়া যেত। বর্তমানে গ্রামের জনসংখ্যা ১৭০ জন। ৪৫টি পরিবার সাবমার্সিবল পাম্পের পানির সুবিধা ভোগ করেছি। বিদ্যুৎ বিল হিসেবে মাসে জনপ্রতি ১৫ টাকা করে দিতে হয়।

পোরশা উপজেলা উপ-সহকারী প্রকৌশলী মিলন কুমার জাগো নিউজকে বলেন, এ উপজেলাটি বরেন্দ্র এলাকা। পানির সমস্যা দূরীকরণে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছে। কমিউনিটি ভিত্তিক পানি সরবরাহ প্রকল্পের এ পর্যন্ত ৪০২টি সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। আরও কিছু প্রকল্পের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে। সেগুলো বাস্তবায়িত হলে আশা করছি শতভাগ পানি সমস্যা দূর করা সম্ভব হবে।

নওগাঁ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাহমুদ আলম জাগো নিউজকে বলেন, গত দুই অর্থবছরের প্রথম পর্যায়ে ৫২২টি সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। আশা করা যায় বাকি কাজ জুনের মধ্যে শেষ হবে। বরেন্দ্র এলাকায় পানির স্বল্পতা ছিল। ওইসব এলাকায় পাম্পের মাধ্যমে সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। খাবারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি তারা গৃহস্থালি কাজেও পানি ব্যবহার করতে পারছে। এলাকাভিত্তিক একটা কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। সাবমার্সিবল পাম্পের আওতায় যারা আছেন তারা পাম্প চালু করায় যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল আসবে তারা তা পরিশোধ করবে। সাবমার্সিবল পাম্পে এলাকাবাসীরা উপকৃত হচ্ছে।

তিনি বলেন, এখনো কিছু এলাকায় পানি স্বল্পতায় রয়েছে। আগামী প্রজেক্টে ওইসব এলাকায় পাম্প স্থাপন করা হবে। এছাড়া আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে শতভাগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

আব্বাস আলী/এসজে/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।