যৌবন হারিয়ে এখন মৃত খাল নওগাঁর তুলসীগঙ্গা নদী

আব্বাস আলী
আব্বাস আলী আব্বাস আলী , জেলা প্রতিনিধি নওগাঁ
প্রকাশিত: ১০:৪৫ এএম, ০৪ মে ২০২২

এক সময় নওগাঁ সদরের মানুষের যাতায়াতের একটি অন্যতম মাধ্যম ছিল তুলসীগঙ্গা নদী। এছাড়া এ নদী দিয়ে বিভিন্ন জায়গা থেকে ব্যবসায়ীরা পালতোলা নৌকা নিয়ে আসতেন জেলা শহরে। মৎস্যজীবীদের জালে ধরা পড়তো ছোট-বড় নানা প্রজাতির মাছ। কালের বিবর্তনে তুলসীগঙ্গা নদী এখন মরা খাল। তবে নদীটি পুনরায় খনন করে পানির প্রবাহ সচল করা গেলে স্থানীয় কৃষকসহ মৎস্যজীবীরা উপকৃত হবেন বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। সেইসঙ্গে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার জন্য গতিরোধক বাঁধটি সরিয়ে সেখানে রেগুলেটর নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

নওগাঁ শহরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ছোট যমুনা ও তুলসীগঙ্গা নদী। এর মধ্যে ছোট যমুনা নদীর অস্তিত্ব এখনো কোনোভাবে টিকে থাকলেও তুলসীগঙ্গা মৃত নদী।

জানা গেছে, জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার পাশাপাশি দুটি বিল থেকে হারাবতী নদী ও তুলসীগঙ্গার সৃষ্টি। এ নদী দুটি প্রবাহিত হয়ে জয়পুরহাটের বটতলীতে মিলিত হয়েছে। সেখান থেকে তুলসীগঙ্গা নাম ধারণ করে নওগাঁর সীমানায় প্রবেশ করেছে। নওগাঁয় প্রবেশ করে রানীনগর উপজেলার ত্রিমোহনীর চককুতুব রেগুলেটর পর্যন্ত যার দৈর্ঘ্য ১৮ কিলোমিটার। এক সময় নদীটি খরস্রোতা ছিল। এ নদী দিয়ে নওগাঁ সদর উপজেলার চন্ডিপুর, শিকারপুর, বোয়ালিয়া ও তিলোকপুর ইউনিয়নের প্রায় ৪০ গ্রাম এবং নওগাঁ পৌরসভার বাসিন্দারা যাতায়াতসহ নানা সুফল পেতেন।

একসময় নদীর পানি দিয়ে চাষাবাদ করা হতো। স্থানীয় মৎস্যজীবীরা মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। জালে ধরা পড়তো ছোট-বড় নানা প্রজাতির মাছ। ব্যবসায়ীরা পালতোলা নৌকায় মালপত্র পরিবহন করতেন। বিশেষ করে পাটের মৌসুমে ব্যবসায়ীদের আনাগোনায় এ নদীর আশপাশের হাট-বাজার জমে উঠতো।

যৌবন হারিয়ে এখন মৃত খাল নওগাঁর তুলসীগঙ্গা নদী

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ষাটের দশকে সদর উপজেলার তিলোকপুর ইউনিয়নের ছিটকিতলায় তুলসীগঙ্গা নদীর গতিপথ রোধ করার পর থেকে এ ১৮ কিলোমিটার অংশটি মরতে শুরু করে। রূপ-যৌবন বলতে আর কিছুই নেই। সব হারিয়ে খরস্রোতা তুলসীগঙ্গা এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। এতে নদীর প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য হারিয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি খানিকটা জমলেও শুকনো মৌসুমে চলে চাষবাস আর দখল। পলি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে নদী। কোথাও কচুরিপানার স্তূপ, কোথাও হাঁটু পানি আবার কোথাও শুকনা। নদীর মাঝে অনেকে আবার ধান রোপণ করেছেন। অথচ একসময় নদীটি স্থানীয় জনমানুষের যাতায়াতের একটি বড় মাধ্যম ছিল।

বোয়ালিয়া ইউনিয়নের ইকড়কুড়ি গ্রামের বৃদ্ধ শরিফুল, তিলোকপুর ইউনিয়নের আদম, দূর্গাপুর গ্রামের বৃদ্ধ হাফিজার রহমান ও বেলাল হোসেন জানালেন, প্রায় ৫০-৬০ বছর আগে এ নদীতে পালতোলা নৌকা চলতো। পাবনা ও জয়পুরহাট জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা আসতেন। নদীর মুখ বন্ধ করার পর থেকে পলি পড়ে এখন ভরাট হয়ে গেছে। এটি এখন মরা নদীতে পরিণত হয়েছে।

ইকড়কুড়ি গ্রামের কৃষক লিটন হোসেন ও মোতাহার হোসেন, বোয়ালিয়া গ্রামের কৃষক সাইদুর জানান, এ নদীর পানি দিয়ে একসময় আশপাশের কৃষকরা চাষাবাদ করতেন। সেই নদী এখন মৃত। কোথাও কচুরিপানা স্তূপ জমে আছে, কোথাও হাঁটু পানি আবার কোথাও শুকনা। নদীর মাঝে অনেকে আবার ধান রোপণ করেছেন।

যৌবন হারিয়ে এখন মৃত খাল নওগাঁর তুলসীগঙ্গা নদী

তারা বলেন, নদীর মুখে গতিরোধক বাঁধটি সরিয়ে সেখানে স্লুইচগেট করা হলে পানির প্রবাহ ঠিক থাকবে। নদীতে পানি থাকলে কৃষকদের জন্য সুবিধা হবে।

নওগাঁ সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শরিফুল ইসলাম খাঁন বলেন, নওগাঁ শহরের মধ্য দিয়ে দুটি নদী প্রবাহিত হয়েছে। একটি ছোট যমুনা ও অপরটি তুলসীগঙ্গা। ছোট যমুনা নদীর অস্তিত্ব এখনো কোনোভাবে টিকে আছে। কিন্তু তুলসীগঙ্গা নদীটি মৃত। জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ বাঁচাতে হলে নদীটি পুনর্জীবিত করা খুবই প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার জন্য গতিরোধক বাঁধটি সরিয়ে সেখানে রেগুলেটর নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি। তবে রেগুলেটর নির্মাণ না করে গতিরোধক বাঁধটি সরিয়ে পানি সরাসরি প্রবাহ করা গেলে বেশি ভালো হয়।

যৌবন হারিয়ে এখন মৃত খাল নওগাঁর তুলসীগঙ্গা নদী

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) নওগাঁ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রভাবশালীদের দখলের কারণে তুলসীগঙ্গা নদী সরু ও মৃত হয়ে গেছে। পাড়ের মাটি অসাধু ব্যবসায়ীরা কেটে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের বাঁধা দেওয়ায় রোষানলে পড়তে হয়েছিল। দখল রোধ করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।

বোয়ালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আফেলাতুন নেছা বলেন, এক সময় তুলসীগঙ্গা নদীর পানি দিয়ে আশপাশের জমিতে সেচ কাজের পাশাপাশি মৎস্যজীবীরা মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতো। কালের বিবর্তনে এখন নদীটি মৃত হয়ে গেছে। যদি নদীটি খনন করা হয় তাহলে আবারও আগের মতো প্রাণ ফিরে পাবে।

নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী প্রবীর কুমার পাল বলেন, দিনাজপুরের শালখুড়িয়ার নিম্নভূমি থেকে তুলসীগঙ্গা উৎপন্ন হয়েছে। যার দৈর্ঘ্য প্রায় ১০০ কিলোমিটার। যেখানে নওগাঁ জেলার মধ্যে পড়েছে সদর উপজেলার চকনদীকুল থেকে রানীনগর উপজেলার ত্রিমোহনীর চককুতুব রেগুলেটর পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার। ত্রিমোহনীর চককুতুব রেগুলেটর থেকে নওগাঁ শহরের চকরামপুর পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার খনন করা হয়েছে।

যৌবন হারিয়ে এখন মৃত খাল নওগাঁর তুলসীগঙ্গা নদী

নওগাঁ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফউজ্জামান খান বলেন, তুলসীগঙ্গা এরইমধ্যে মৃত নদী হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। নওগাঁর মধ্যে নদীটি মৃত অংশের দৈর্ঘ্য ১৮কিলোমিটার। এর মধ্যে ১০ কিলোমিটার খনন করা হয়েছে। যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭ কোটি ৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা। ২০২০ সালে কাজটি শেষ হয়েছে। আরও ছয় কিলোমিটার খননের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ কোটি টাকা। তুলসীগঙ্গা নদী খনন করা সেচ কাজে সুবিধার পাশাপাশি নৌ চলাচল করতে পারবে। এছাড়া মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় এর ওপর নির্ভরশীলরা জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, অনেক বছর থেকে তুলসীগঙ্গা নদী মৃত অবস্থায় থাকার ফলে অনেক এলাকায় নদীর জায়গা বেদখল হয়ে গেছে। আশা করা যাচ্ছে, নদী খননের ফলে এসব সমস্যা লাঘব হবে। তবে তুলসীগঙ্গা নদীর মুখ যেখানে বন্ধ রয়েছে সেখানে আপাতত স্লুইচগেট স্থাপন করা সম্ভব হবে না। আরেকটি প্রজেক্টে স্লুইচগেটের প্রস্তাবনা দেওয়া আছে। সেক্ষেত্রে যদি স্লুইচগেট নির্মাণ করা যায় তবে প্রধান নদীর (ছোট যমুনা) সঙ্গে সংযোগ স্থাপন হবে।

এমআরআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।