১০০ টাকায় এক ডাব তাদের সাধ্যের বাইরে

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি দিনাজপুর
প্রকাশিত: ০৯:৩১ এএম, ২৯ মে ২০২২

দিনাজপুরে গত কয়েকদিনের প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন। তাপমাত্রা তুলনামূলক কম হলেও গরমের তীব্রতা বেশি। ফলে কাজ করতে গিয়ে অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠেছেন অনেকে। তাই দুর্বল হয়ে পড়া শরীরে কিছুটা শক্তি ফেরাতে বেড়েছে ডাবের চাহিদা। তবে দাম বেশি থাকায় বিপাকে পড়েছেন নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষ। ৮০ থেকে ১০০ টাকা দিয়ে একটি ডাব কিনে খাওয়া তাদের সাধ্যের বাইরে।

দিনাজপুর আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা যায়, গত এক সপ্তাহ ধরে দিনাজপুরে তাপমাত্রা ৩১ থেকে ৩৫.২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠা নামা করছে। এরমধ্যে ২২ মে ৩১.৮ ডিগ্রি, ২৩ মে ৩৩.১ ডিগ্রি, ২৩ মে ৩৩.১ ডিগ্রি, ২৪ মে ৩৫.২ ডিগ্রি, ২৫ মে ৩৪ ডিগ্রি, ২৬ মে ৩৪.৫ ডিগ্রি, ২৭ মে ৩৪.৬ ডিগ্রি, ২৮ মে ৩২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়।

বৃহস্পতিবার (২৬ মে) দিনাজপুর বলাই মোড়, জোড়া ব্রিজ মোড়, হাসপাতাল মোড়, বাহাদুর বাজার এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ভ্যান কিংবা ফুটপাতে থরে থরে ডাব সাজিয়ে রেখেছেন বিক্রেতারা। তাদের কাছে একটি ডাবের মূল্য আকার ভেদে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। ক্রেতারা আসছেন ডাব পছন্দ করছেন। কিন্তু ডাবের দাম শুনে অনেকেই তা কিনছেন না। এদের মধ্যে নিম্ন ও মধ্যবিত্তরাই বেশি। শারীরিক অসুস্থতার জন্য অনেকে বাধ্য হয়েই কিনছেন।

তীব্র গরম সইতে না পেরে দুপুরে ডাব কিনতে এসেছেন মোহাম্মদ মানিক নামে এক ব্যক্তি। কিন্তু ডাবের দাম শুনে তার দুই চোখ কপালে উঠে গেছে। তাই ডাব না কিনেই ফিরে যাচ্ছিলেন।

এ সময় তার সঙ্গে কথা হয় জাগো নিউজের। তিনি বলেন, ‘এখন যে গরম পড়ছে। কাজ করেন আর না করেন আপনি ঘেমে যাবেন। আমার অবস্থা একই হয়েছে। ঘামানোর কারণে নিজেকে দুর্বল অনুভব করতে লাগলাম। ভাবলাম একটু ডাবের পানি খাই। যদি একটু শক্তি ফিরে পাই। কিন্তু ডাব কিনতে এসে যে দাম চাইলো, তাতে আমার মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে কিনে খাওয়া সম্ভব না।’

Di-(3).jpg

তিনি আরও বলেন, ‘একটা ডাবের দাম চায় ৮০ থেকে ১০০ টাকা। এই ডাবটাই যদি খেতে পারতাম ৪০ থেকে ৫০ টাকায়, তাহলে শুধু আমি না আরও ১০টা মানুষও কিনে খাইতে পারতো।’

শুধু মোহাম্মদ মানিকই নন, তার মতো নিম্নআয়ের অনেকে একই কথা জানান। সক্ষমতা থেকে দাম অনেক বেশি হওয়ায় ডাবের পানি কিনে খেতে চাইলেও, তা পারছেন না তারা।

দিনমজুর ভূপতি রায় বলেন, ‘ভবনে কাজ করি। বর্তমানে যে গরম। কাজ করতে গেলে অনেক ঘেমে যাই। এ সময় ডাব খেলে একটু ভালো হতো। কিন্তু ডাবের যে দাম, তাতে আমার কিনে খাওয়া সম্ভব নয়। যে কয়টা টাকা পাই তা দিয়ে সংসার চালাতে হবে। একটা ডাবের দাম দিয়ে দুই কেজি চাল পাবো। আর সেই টাকা দিয়ে যদি একাই ডাবের পানি খাই, তবে পরিবার খাবে কি!

টুটুল রায় নামে এক গাড়িচালক বলেন, ‘ডাবের দাম সত্যি বেশি। এত দাম দিয়ে আমাদের মতো আয়ের মানুষ কিনে খাইতে পারবে না। যাদের অনেক আয় রোজগার তারাই একমাত্র ডাব কিনে খেতে পারবে। ডাবের দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা হলে খেতে পারতাম।’

রফিকুল আলম নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমার ডায়াবেটিসসহ আরও রোগ আছে। তাই ডাব কিনেছি। কিন্তু বাজারে দামটা অনেক বেশি। এত দাম দিয়ে কিনে খেতে একটু সমস্যাই মনে হয়। কিন্তু কী আর করার, বাধ্য হয়ে ডাব কিনে খাচ্ছি।’

মোহাম্মদ কামাল নামে এক ডাব ব্যবসায়ী বলেন, আমি দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে ডাবের ব্যবসা করে আসছি। দিনাজপুরে এ বছর ডাব তেমন একটা পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা যেসব ডাব বিক্রি করছি, তা বাইরে থেকে আসছে। ফলে বাজারে ডাবের দামটা বেশি। আমাদেরই বেশি দিয়ে কেনা। একটা ডাব বিক্রি করে দুইটা টাকা না আয় করলে খাবো কী?

Di-(3).jpg

আরমান নামে এক ডাব ব্যবসায়ী বলেন, আমরা যেখানে থেকে ডাব কিনে নিয়ে আসি, সেখানেই ডাবের দাম ধরে ৭০-৮০ টাকা। আমরা যদি লাভ না করি তবে কী করে খাবো। দুই টাকা লাভের জন্যই এ ব্যবসা করা। আর একটা ডাব গাছ থেকে দোকান পর্যন্ত আনতে অনেক খরচ হয়। পরিবহন খরচ আছে, যে ডাব গাছ থেকে পেড়ে দিবে তাকে দিতে হবে। সব মিলিয়ে খরচ বেশি। তাই ডাবের দাম বাজারেও বেশি।

ডায়াবেটিস ও স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. ডিসি রায় জাগো নিউজকে বলেন, আমরা একজন ডায়াবেটিস রোগীকে কচি (ছোট) ডাবের পানি খেতে বলি। কারণ এতে প্রচুর পরিমাণে ইলেক্ট্রোলাইট ও পটাশিয়াম থাকে। যা একজন ডায়াবেটিস রোগীর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি উপাদান। আমরা প্রতিটি রোগীকে তাই ছোট ডাবের পানি প্রতিদিন খেতে পরামর্শ দিয়ে থাকি। একই সঙ্গে ম্যাচুরেট ডাবের (নারিকেল) পানি খেতে বারণ করি।

জেলা সিভিল সার্জন ডা. এ এইচ এম বোরহান-উল-ইসলাম সিদ্দিকী জাগো নিউজকে বলেন, ছোট ডাবের পানিতে প্রচুর পরিমাণে ইলেক্ট্রোলাইট ও পটাশিয়াম থাকে। যা একজন ব্যক্তির শরীরের জন্য প্রচুর পুষ্টিগুণ বহন করে। যাদের শরীর দুর্বল কিংবা যাদের ডায়রিয়া আছে তাদের জন্য এ ডাব অত্যন্ত উপকারী। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আছে যারা ইনজেকশনের সিরিঞ্জ ব্যবহার করে ডাবের মধ্যে চেতনানাশক ওষুধ মিশিয়ে দিয়ে থাকে। যা একজন ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাই সাবধানতার সঙ্গে ডাব কিনে খেতে হবে।

এমদাদুল হক মিলন/এসজে/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]