দিনমজুরির টাকায় বিদেশ পাঠানো ছেলেই ঘরছাড়া করলো মাকে
দিনমজুরি ও গয়না বিক্রির টাকায় ছেলেকে প্রবাসে পাঠিয়েছিলেন কক্সবাজার সদরের ঝিলংজা খরুলিয়া কোনারপাড়ার বৃদ্ধা নুর আয়েশা (৭০)। আশা ছিল পরিবারে সচ্ছলতা ফিরে আসবে। তবে বিদেশে গিয়ে ছেলের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হলেও এখন থাকার জায়গা নেই বৃদ্ধা নুর আয়েশার।
শারীরিকভাবেও তিনি অসুস্থ। এ অবস্থায় মাকে দেখাশোনা করা তো দূরের কথা, বৃদ্ধার মোহরানা বাবদ পাওয়া ২০ শতক জমি এবং ভিটেটুকুও নিজের নামে লিখিয়ে নিয়েছেন প্রবাসফেরত ছেলে সাবের। মারধর করে ঘর থেকে বের করে দিয়েছেন মাকে।
এক সন্তানকে সবকিছু লিখে দেওয়ায় খবর নিচ্ছেন না অন্য সন্তানরাও। ফলে জীবনসায়াহ্নে এসে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন এ বৃদ্ধা। মানসিক যন্ত্রণায় নির্ঘুম রাত কাটছে তার।
স্থানীয়রা জানান, দিনমজুরি করে জমানো টাকায় ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেন মা নুর আয়েশা। সেই সন্তান বৃদ্ধা মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব না নিয়ে উল্টো রাস্তায় নামিয়েছেন।
অসহায় এ বৃদ্ধার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিয়ের ১৪-১৫ বছর পর স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে অন্যত্র চলে যান। ছোট সন্তানদের লালন-পালন করতে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান। একটু সুখের আশায় ছেলে সাবেরকে ধারদেনা ও জমিজমা বিক্রি করে বিদেশ পাঠান। টাকার দেখা পেয়ে সাবেরের স্বভাব পাল্টে যায়। নিজের ২০ শতক জমি তার নামে লিখে দিতে চাপ দেন।
সুখের আশায় জমিটি সাবেরের নামে লিখেও দেন বৃদ্ধা নুর আয়েশা। ছয় মাস আগে বিদেশ থেকে ফিরে বসতবাড়িটিও তার নামে লিখে দিতে টালবাহানা করেন ছেলে সাবের। সেটাও রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার কিছুদিন পর তাকে ঘর থেকে বের করে দেন।
নুর আয়েশা বলেন, ‘স্বামীর দেওয়া ২০ শতক জমিতে চাষাবাদ করে ভালোই চলতো। ছেলে ভালো ও সুখে-শান্তিতে থাকুক এমন ভাবনায় জমি লিখে দিয়েছি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। ছেলের নিষ্ঠুর আচরণের শিকার হলাম আমি।’
অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘জমিজমা ছেলের নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার দুমাস না যেতেই ছেলে ও তার বউ ভিন্ন আচরণ শুরু করে। ঠিকমতো খাবার দেয়নি। ভাত দিলেও তরকারি দিতো না। বেলা গড়িয়ে দুপুরের ভাত দিলে সেদিন রাতে আর খাবার দিতো না। ছেলেকে এসব কথা জানালে উল্টো আমার ওপর চড়াও হয়ে গালিগালাজ করতো। সবশেষ আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। আমি নিজের ভিটায় ফিরতে চাই।’
সাবেরের ছোট ভাই আব্দুল্লাহ বলেন, ‘জমি লিখে নিয়ে মাকে ঘর থেকে বের করে দেয় সাবের। প্রতিবাদ করলে ভাই ইউনুস ও ভাগনেসহ আমাদের চারজনের বিরুদ্ধে থানায় উল্টো মিথ্যা মামলা দিয়েছে।’
স্থানীয় মসজিদ কমিটির সভাপতি মাস্টার খুরশেদ আলম, আওয়ামী লীগ নেতা মো. আলম, সালিশকারক বাদশা মিয়া, শহিদুল্লাহ শকু ও ছলিম উল্লাহ বলেন, ‘নুর আয়েশা স্থানীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এনিয়ে একাধিকবার সালিশও হয়েছে। কিন্তু ছেলে সাবের সালিশের সিদ্ধান্ত অমান্য করে মাকে ঘরে উঠতে দেননি। উল্টো মামলা করে মা ও ভাইবোনদের হয়রানি করছেন।’
জানতে চাইলে অভিযুক্ত সাবের বলেন, বিষয়টি আমার পারিবারিক। এখানে কাউকে নাক গলাতে হবে না। স্থানীয় সাংবাদিকরা বিষয়টি নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
কক্সবাজার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মুনীর উল গীয়াস বলেন, এ বিষয় কেউ অভিযোগ নিয়ে আসেননি। সাংবাদিকদের মাধ্যমে জেনেছি। বিষয়টি অমানবিক। তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সায়ীদ আলমগীর/এসআর/জিকেএস