দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ঝালকাঠির খুশিয়া

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঝালকাঠি
প্রকাশিত: ০৯:৫৩ পিএম, ০২ অক্টোবর ২০২২
ঝালকাঠির খুশিয়া বেগম

২০০৮ সালে পিঠে ফোঁড়ার মতো দেখা দেয়। শারীরিক শক্তি এবং কাজের ক্ষমতাও কমতে থাকে। তখন স্বামীও ফেলে চলে যায়। ধীরে ধীরে ফোঁড়াটি বড় টিউমারে রূপ নেয়। অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম ও বরিশালে ডাক্তার দেখিয়ে টিউমার অপারেশন করাই। সেখান থেকে আবারও টিউমার ওঠে। এভাবে একে একে তিনবার অপারেশন করানো হলেও সেখান থেকে এখন পানি বের হচ্ছে।

পিঠের অন্য জায়গা থেকে আরও বড় বড় কয়েকটি টিউমার বের হয়েছে। চিত হয়ে ঘুমাতে পারি না। রোদ উঠলে টিউমারের ভেতরে এমনভাবে জ্বালাপোড়া করে তখন মনে হয় কেউ যেন পিঠে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। বৃদ্ধ মা, ১৩ বছরের মেয়ে আর আমি ছাড়া আমাদের আর কেউ নেই। খুবই কষ্টে জীবন যাপন করছি, এর চেয়ে মরে যাওয়াও অনেক ভালো।

jagonews24

এভাবেই নিজের কষ্টের কথা জানান খুশিয়া বেগম। তিনি ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার কানুদাসকাঠি গ্রামের মৃত সফিজউদ্দিন হাওলাদার মেয়ে।

খুশিয়া বেগম বলেন, ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে আমাদের একটি কন্যা সন্তান হয়। এরপর থেকেই আমার শরীরে রোগ দেখা দেয়। সবসময় জ্বর লেগেই থাকতো। পরের বছর পিঠে একটি ফোঁড়ার মতো দেখা যায়। আস্তে আস্তে সেটি বড় আকার ধারণ করে। কয়েক জায়গায় ডাক্তার দেখিয়ে প্রথমে বরিশালে অপারেশন করাই। কয়েক মাসের মধ্যে আবার জেগে ওঠে। খুলনা ২৫০ বেডের হাসপাতালে অপারেশন করাই। এরপরে ঢাকায় যাওয়ার পরামর্শ দিলে ১৫ দিন পরে ঢাকায় গিয়ে মহাখালীতে ডাক্তার দেখালে একের পর এক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দেয়। যে টাকা নিয়ে গেছিলাম তা পরীক্ষা করাতেই শেষ করে ফেলছি। প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয় তাতে। টাকার অভাবে বাড়িতে চলে এসে বরিশালে মেডিকেলে ভর্তি হই। সেখানের ডাক্তার ক্যানসার বিভাগে পাঠালে টাকা না থাকায় জটিল রোগের চিকিৎসার খরচের ভয়ে চলে আসি। আমার আর ডাক্তার দেখানোর সামর্থ্য নেই, আল্লাহকে ডাকবো আল্লাহ যা করে।

তিনি আরও বলেন, বাবা-ভাই অনেক আগেই মারা গেছেন। নেই কোনো অর্থ-সম্পদও। আমার বৃদ্ধা মা, শিশুকন্যাকে কখনো খেতে দিতে পারি আবার কখনো না খেয়ে থাকি। অনেক কষ্টে আমাদের দিন কাটে। টিউমারের মধ্যে আগুনের তাপের মতো অনেক জ্বালা যন্ত্রণা হয়। টিউমারের ভেতরে এত যন্ত্রণা যে ফ্যানের নিচে বসে থাকতে হয়। আগের অপারেশনের জায়গা থেকে পানি ঝড়ছে। আমাকে দেখার কোনো লোক নেই। আমি একাই এ রোগের সঙ্গে যুদ্ধ করছি। যে ঘরে বসবাস করছি তা থেকে পানি পড়ে। কতদিন এখানে থেকে জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করবো? এখন আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আল্লাহ আমাকে মৃত্যু দিলেও এত কষ্ট আর সহ্য করতে হতো না।

খুশিয়ার ১৩ বছর মেয়ে হাসি আক্তার বলে, আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। আমার মার অসুস্থতার কারণে লেখাপড়াও ঠিকমতো হচ্ছে না। মায়ের চিকিৎসা করানোর জন্য কোনো টাকা-পয়সার জোগাড় নেই। অনেকদিন ধরে অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে। না পারে ঘুমাতে আর না পারে খেতে। বাবাও আমাদের কোনো খোঁজ-খবর নেয় না। বাবাকে আমি ফোন দিলেও তখন সে আমাকে অনেক গালি দেয়। আমি বাড়িতে গেলেও মারধর করে বাবা তাড়িয়ে দেয়। এখন আমরা কিভাবে বাঁচবো?

jagonews24

খুশিয়ার বৃদ্ধা মা তাহমিনা বেগম বলেন, ‘মোর মাইয়াডা অসুস্থ। পিডে (পিঠে) টিউমার হয়ে এহোন (এখন) হাঙ্গা (পুরো) পডে ছড়াইয়া গেছে। তিনফির (তিনবার) অপারেশন করছি, হারে (সারে) নাই। এহোন কী হরমু (করবো) আর কিভাবে চলমু, আল্লাহর ওয়াস্তে হালাইয়া (ফেলে) থুইছি (রেখেছি)। মোর সংসারেও আর কেউ নাই, একটা লায়েক পোলা হেডাও মইরা গেছে। এহোন মোরা মানসের কাছে চাইয়া-চিন্তা খাই। হাঙ্গা পিডে টিউমার লইয়া কোনোহানে যাইতেও পারে না, আর কোনো কামও হরতে (করতে) পারে না। এ অবস্থা দেইখা ওর স্বামীও নেয় না, হালাইয়া থুইছে। মাইয়া একটা আছে, লেহাপড়া (লেখাপড়া) করাইতে পারি না, ভাতও দেতে পারি না, খাওয়াইতেও পারি না।’

স্থানীয় ওবায়দুল হক আকন বলেন, আমরা দেখছি খুশিয়া দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। যেভাবেই হোক খরচ করে বিভিন্ন জায়গায় ডাক্তার দেখিয়েছে। স্বামী চলে যাওয়ায় সে খুবই অসহায়, বৃদ্ধ মা ঘরে, তার একটা মেয়ে আছে, তারও লেখাপড়া চালাতে পারে না। তিনবেলা ঠিকমতো খাবারও খেতে পারে না। দরিদ্র পরিবারে হওয়ায় তারা খুবই অসহায় অবস্থায় আছে।

ঝালকাঠি সিভিল সার্জন ডা. শিহাব উদ্দিন বলেন, খুশিয়ার পিঠের টিউমার সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া রোগ নির্ণয় করা সম্ভব না। মহাখালী থেকে নয়তো বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে পরীক্ষা করানোর পর পরবর্তী চিকিৎসার পরিকল্পনা করা সম্ভব। দরিদ্র পরিবারের ব্যয়বহুল পরীক্ষায় কোনো হৃদয়বান ব্যক্তির হস্তক্ষেপ পেলে সে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারতো।

আতিকুর রহমান/এমআরআর/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।