ফরিদপুরে উপ-নির্বাচন: হেভিওয়েটদের ভিড়ে কে হচ্ছেন নৌকার মাঝি

এন কে বি নয়ন এন কে বি নয়ন ফরিদপুর
প্রকাশিত: ১১:৩১ এএম, ০৪ অক্টোবর ২০২২

ফরিদপুর-২ আসনের উপ-নির্বাচন আগামী ৫ নভেম্বর। মনোনয়নপত্র জমার শেষদিন ১০ অক্টোবর। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন তুলে জমা দিয়েছেন ১৭ জন সম্ভাব্য প্রার্থী।

মঙ্গলবার (৪ অক্টোবর) আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। জাতীয় সংসদের উপনেতা, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর মৃত্যুর পর থেকে তার আসনে কে হবেন নৌকা মার্কার প্রার্থী, তা নিয়ে সালথা ও নগরকান্দায় চলছে ব্যাপক আলোচনা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফরিদপুর-২ (সালথা-নগরকান্দা ও কৃষ্ণপুর) আসনের উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন চেয়েছেন সাজেদা চৌধুরীর দুই ছেলে আয়মন আকবর বাবলু চৌধুরী ও শাহদাব আকবর লাবু চৌধুরী। এছাড়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য বিপুল ঘোষ, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা বাহালুল মজনু চুন্নু, ফরিদপুরের আটরশী পিরের নাতি জাকের পার্টির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান সায়েম আমীর ফয়সাল, নগরকান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট জামাল হোসেন মিয়া, নগরকান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান সরদার, আওয়ামী লীগের শ্রম ও জনশক্তি বিষয়ক উপকমিটির সদস্য মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) আতমা হালিম, ফরিদপুর জেলা শ্রমিক লীগের সাবেক সহ-সভাপতি সাইফুজ্জামান জুয়েল, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিক্ষা ও মানববিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য সাব্বির হোসেন, ফরিদপুর জেলা মৎসজীবী লীগের আহ্বায়ক কাজী আব্দুস সোবহান, সাবেক ছাত্রনেতা ও সাংবাদিক লায়েকুজ্জামান, বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু ইউসুফ মিয়া, কালাচাঁদ চক্রবর্তী, কাজী দেলোয়ার হোসেন, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান হাবিব এবং এ বি এম শফিউল আলম বুলু আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর বড় ছেলে আয়মন আকবর বাবলু চৌধুরী এলাকায় পরিচিত বড় মামা হিসেবে। ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি মায়ের একান্ত ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস) হিসেবে সালথা-নগরকান্দার রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। বর্তমানে তিনি নগরকান্দা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। আর কনিষ্ঠ ছেলে শাহদাব আকবর লাবু চৌধুরী পরিচিত ছোট মামা হিসেবে। নানা অভিযোগে বাবলু চৌধুরীর অপসারণের পর লাবু চৌধুরী ২০১৮ থেকে সংসদ উপনেতার রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। তবে রাজনীতির মাঠে তারা বিভিন্ন সময়ে একে অপরের বিরুদ্ধে চরম বিষোদগারে লিপ্ত হওয়ার পাশাপাশি তাদের নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের কারণে নগরকান্দা ও সালথায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েন। এছাড়া তাদের অনুসারীদের মাঝেও দ্বন্দ্ব-সংঘাতে এলাকার পরিবেশ অশান্ত হয়ে ওঠে বিভিন্ন সময়ে।

এখন তাদের দুই ভাইয়ের পরিবর্তে উপ-নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের মনোনয়ন পত্র কেনার খবরে এলাকাবাসীও উৎসুক। সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর অবর্তমানে কে হচ্ছেন এ আসনের নৌকার মাঝি সেটিই সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিমত, ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক বলয়কে নিজের পক্ষে টানতে বিশেষ করে নগরকান্দা ও সালথায় রাজনৈতিক বিবাদের নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হচ্ছে দলের ত্যাগী নেতাকর্মী ও নিরীহ জনগণকে। আবার দুই মামার দ্বন্দ্বের কারণে সাজেদা চৌধুরীকে জীবন সায়াহ্নের শেষ সময় ঢাকায় একপ্রকার ঘরবন্দি অবস্থাতেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে হয়েছে। সারাজীবন নগরকান্দা-সালথার রাজনীতি করেও তাকে নিজ গ্রামের পরিবর্তে ঢাকায় দাফন করার বিষয়টিকেও তারা ভালোভাবে নেননি।

এলাকাবাসী আরও জানান, করোনা মহামারির মধ্যে সালথায় লকডাউনকে কেন্দ্র করে সরকারি অফিস আদালতে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের মামলায় এখানকার সাধারণ জনগণের পাশাপাশি অনেক জনপ্রতিনিধিও আসামি। এলাকার বিবাদপূর্ণ পরিস্থিতি এড়াতে কার্যকর নেতৃত্ব দিতে আওয়ামী লীগের মতো বড় একটি রাজনৈতিক দলের হেভিওয়েট নেত্রী সাজেদা চৌধুরীর অবর্তমানে তার ছেলেদের ব্যর্থতাকে চিহ্নিত করছেন স্থানীয় জনগণ। এসব কারণে এখানে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের আলোচনাকে ছাড়িয়ে নেতৃত্বের সমালোচনাই বেশি আলোচিত বলে মনে করছেন অনেকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ফরিদপুর-২ আসনের উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা ফরিদপুর জেলা মৎসজীবী লীগের আহ্বায়ক কাজী আব্দুস সোবহান জাগো নিউজকে বলেন, আমি জনগণের মঙ্গলের জন্য কর্মীবান্ধব রাজনীতি করি। আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি করি। দীর্ঘদিন মানুষের পাশে থেকে সুখে-দুঃখে কাজ করে যাচ্ছি। আশা করি, দল ও সরকার আমাকে মূল্যায়ন করবে।

তিনি আরও বলেন, ফরিদপুর-২ আসনের মানুষ শান্তিতে ছিল না। করোনাকালীন লকডাউন নিয়ে সালথাকাণ্ডের ঘটনায় অনেক নিরীহ, অসহায় মানুষকে আসামি হয়ে ঘরবাড়ি ফেলে দিনের পর দিন পালিয়ে থাকতে হয়েছে। এখানে যেমন উন্নয়নমূলক কাজ হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি, অভিযোগ রয়েছে কাজগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। আমি কারও বদনাম করা পছন্দ করি না, এক কথায় যারা দায়িত্বে ছিলেন, তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করে নানা অভিযোগে অভিযুক্ত।

আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা অ্যাডভোকেট জামাল হোসেন মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, আমি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকে বুকে ধারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বার্তা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে কাজ করে যাচ্ছি। নগরকান্দা, সালথা ও কৃষ্ণপুরের অবহেলিত জনগণের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য নিজেকে সর্বোচ্চ নিয়োজিত রেখে কাজ করে যাচ্ছি। আসলে আমি নগরকান্দা-সালথার জনগণের ইচ্ছায়ই রাজনীতি করি। তাদের ভালবাসা ও সমর্থন আমাকে এই পর্যন্ত এনেছে। আমি শতভাগ আশাবাদী দল আমাকে মূল্যায়ন করবেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর কনিষ্ঠ ছেলে শাহদাব আকবর লাবু চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, আমি দীর্ঘদিন এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছি। মানুষের কল্যাণে কাজ করেছি। চেষ্টা করেছি ভালো কাজ করতে। কাজ করলেই অভিযোগ ও আলোচনা-সমালোচনা হবে। জনগণ কাজের মূল্যায়ন করবেন। সর্বোপরি দলের যে কোনো সিদ্ধান্ত মেনে নিবো।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর বড় ছেলে আয়মন আকবর বাবলু চৌধুরীর মোবাইলফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি। তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য বিপুল ঘোষ জাগো নিউজকে বলেন, সাজেদা চৌধুরীর নির্বাচনী এলাকার মানুষ মোটেও ভালো নেই। তার ছোট ছেলে লাবু চৌধুরী সব শেষ করে দিয়েছেন। তিনি ফরিদপুরে এসে আওয়ামী বিরোধী লোকজনের সঙ্গে চলাফেরা করেন। পরিবারে ঐক্য নেই। আমি তাদের সতর্ক করার জন্য মনোনয়ন কিনে জমা দিয়েছি। মনোনয়ন কেনা ও জমা দেওয়ার মধ্যে দিয়ে তাদের সতর্ক করতে চাই, তারা যেন ভালো হয়ে যান।

এন কে বি নয়ন/এমআরআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।