সম্ভাবনার ছৈলার চর ও ভাসমান পেয়ারার হাট

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ঝালকাঠি
প্রকাশিত: ০৯:৫৮ পিএম, ০৫ অক্টোবর ২০২২
ঝালকাঠির ভাসমান পেয়ারার হাট ও ছৈলার চর

জেলা হিসেবে ঝালকাঠি ইতিহাস-ঐতিহ্যে বেশ সমৃদ্ধ। ব্রিটিশ আমল থেকেই এর সুনাম-সুখ্যাতি রয়েছে। এ জেলায় দর্শনীয় স্থান বেশ কয়েকটি থাকলেও প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা ছৈলারচর এবং কয়েকশো বছরের ঐতিহ্যবাহী ভাসমান পেয়ারার হাট বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

এছাড়া রয়েছে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের জন্মস্থান রাজাপুরের সাতুরিয়া মিয়া বাড়ি, গালুয়া পাকা মসজিদ, আঙ্গারিয়া খান বাড়ি জামে মসজিদ, ডহরশংকর ছুরিচোরা মসজিদ, জীবনানন্দ দাশের ধানসিঁড়ি নদী, সদর উপজেলার গাবখান সেতু, পাঁচ নদীর মোহনায় প্রস্তাবিত ইকোপার্ক, নেছারাবাদ কমপ্লেক্স, কবি কামিনী রায়ের জন্মভিটা, কির্ত্তিপাশা জমিদার বাড়ি, গাভারামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের ভারুকাঠি গ্রামে মিয়া বাড়ি জামে মসজিদ, পোনাবালিয়ায় শিব মন্দির, নলছিটির মগড় ইউনিয়নের আমিরাবাদ গ্রামে সুজাবাদের কেল্লা, কুলকাঠি গ্রামে ঐতিহাসিক শহীদ স্মৃতিস্তম্ভসহ বেশ কিছু ধর্মীয় এবং ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি।

ছৈলার চর
প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ছৈলাগাছের নাম থেকেই জেগে ওঠা এ চরের নামকরণ করা হয়েছে ‘ছৈলার চর’। নদীবেষ্টিত এ চরকে দ্বীপের মতো মনে হয়। ছৈলা ছাড়াও এই চর কেয়া, হোগলা, রানা, এলি, মাদার, আরগুজিসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছে ঘেরা। আর সেখানে লাখো ছৈলাগাছে বাসা বাঁধে শালিক, ডাহুক আর বকের ঝাঁক। বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কিচিরমিচির ডাকে মুখর থাকে চরের অরণ্য। বেলাশেষে পশ্চিম আকাশে সূর্য হেলে পড়ার দৃশ্য উপভোগ করা যায় এ চরে। ২০১৫ সালে ছৈলার চরকে পর্যটন স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ছৈলার চর ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার হেতালবুনিয়ায় বিষখালী নদীতে জেগে ওঠা এক বিশাল চর। বঙ্গোপসাগর থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে এক যুগ আগে গড়ে ওঠা ছৈলার চরের আয়তন ৬১ একর।

কাঁঠালিয়া উপজেলা প্রশাসন ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এখানে এডিবির অর্থায়নে তৈরি হয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দুটি রেস্টহাউস, একাধিক গোলঘর, সুদৃশ্য ডিসি লেক ও ইকোপার্ক। বিষখালী নদীর পাশ দিয়ে পর্যটকদের ঘুরে বেড়ানোর জন্য রয়েছে একাধিক লাল রঙের নৌকা। পুকুর ও লেকে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। পর্যটকদের জন্য রয়েছে নিরাপদ পানির নলকূপ ও মানসম্মত শৌচাগারের সুব্যবস্থা। দর্শনার্থীদের জন্য নির্মিত হয়েছে একটি কাঠের সেতু। যেটি ব্যবহার করে খুব সহজেই হেঁটে যাওয়া যাবে ছৈলার চরে। শিশুদের নিয়ে সপরিবারে সময় কাটানোর জন্য রয়েছে গাছের ছায়ায় বেঞ্চ, একাধিক দোলনা ও শিশু কর্নার। চরের একদিকে ২০ একর জায়গাজুড়ে নির্মাণ করা হয়েছে ডিসি ইকোপার্ক।

jagonews24

প্রতিবছর শীত মৌসুমে ঝালকাঠি জেলা শহর, কাঁঠালিয়া উপজেলার পার্শ্ববর্তী রাজাপুর, বরগুনার বামনা, বেতাগী ও পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়াসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে শিক্ষার্থীরা বনভোজন করতে আসে এ ছৈলার চরে। এরই মধ্যেই ছৈলার চরকে কেন্দ্র করে এখানের মানুষের অর্থনীতির চাকা ঘুরতে শুরু করছে। অনেকেই কৃষিকাজের পাশাপাশি খাবারের দোকান দিয়ে ভাগ্যে পরিবর্তন আনছেন। ট্রলারের মাঝিদের ব্যস্ততাও কম নয়। প্রতিদিন শতাধিক ট্রলার ভাড়ার চুক্তিতে কাঁঠালিয়া লঞ্চঘাট থেকে ছৈলার চরে আসা-যাওয়া করছে। এতে মাঝিদের আয়ও বেড়েছে। ছৈলার চরে আগতরা ইচ্ছে করলে কাঁঠালিয়ার পাশের উপজেলা পাথরঘাটায় গিয়ে সুন্দরবনের কিছু অংশ দেখে আসতে পারেন। সেখানে রয়েছে হরিণঘাটার ফরেস্টের অপরূপ সৌন্দর্য। ভ্রমণপিপাসুরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। পাশাপাশি ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলে স্মৃতিকে ধরে রাখছেন। আবার কেউ কেউ সেলফি তুলছেন অথবা প্রিয়জনের ছবি মুঠোফোনে ক্যামেরাবন্দি করছেন।

বেতাগী উপজেলার বাসিন্দা আনিচুর রহমান বলেন, ছৈলার চর অসাধারণ একটি পিকনিক স্পট। বিগত দিনে এ চরে তেমন কিছুই ছিল না। বর্তমানে অনেক স্থাপনা ও দোকানপাট গড়ে উঠেছে যা পর্যটকদের আরও বেশি আকর্ষণ করছে।

ছৈলার চরের স্বেচ্ছাসেবক মো. সাগর আকন বলেন, এখানে শুকনা মৌসুমে প্রতিদিন ৩০০-৪০০ লোকজন বেড়াতে আসেন। তাদের নিরাপত্তা দেওয়াসহ সার্বক্ষণিক সেবা করার জন্য আমি এখানে থাকি। দর্শনার্থীরা খুশি হয়ে কিছু বকশিশ দেন।

জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী বলেন, ছৈলার চরের অবকাঠামোর উন্নয়ন ও সৌন্দর্য বাড়াতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটন করপোরেশন ও সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ভবিষ্যতে ছৈলার চর হবে দক্ষিণ জনপদের অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র।

ভাসমান পেয়ারা বাজার
ঝালকাঠি, বরিশাল এবং পিরোজপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় ৫৫ গ্রাম নিয়ে গড়ে উঠেছে এশিয়া মহাদেশের বৃহত্তম ভাসমান পেয়ারা বাগান। ঝালকাঠি জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ভিমরুলিতে রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভাসমান পেয়ারা বাজার। তিন দিক থেকে আসা খালের মোহনায় বসে ভিমরুলির এই ভাসমান পেয়ারা বাজার। জুলাই, আগস্ট পেয়ারার মৌসুম হলেও মাঝে মাঝে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাজার চলে। ভাসমান পেয়ারা বাজার দেখতে আগস্ট মাস সবচেয়ে উপযোগী সময়। সকাল থেকেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের হাঁকডাক শুরু হয়। ১১ টার পর পেয়ারা বাজারের ভিড় কমতে থাকে।

jagonews24

নৌপথে ঘুরে খালের সঙ্গে লাগোয়া ঘরবাড়ি, স্কুল, ব্রিজ এবং রাস্তার সম্মোহনী রূপ উপভোগ করা যায়। খালের মধ্য দিয়ে চলার সময় চাইলে হাত বাড়িয়ে আমড়া কিংবা পেয়ারা স্পর্শ করা যায়। আর যদি বৃষ্টি হয় তবে চারপাশটা আরও অপার্থিব সৌন্দর্যে মোহনীয় হয়ে ওঠে। এ মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত, ভারতীয় হাইকমিশনার, থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতসহ বিদেশি গুরুত্বপূর্ণ অনেক কর্মকর্তা, দেশের বিভিন্ন দপ্তরের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাসহ দেশি-বিদেশি কয়েকলাখ পর্যটক প্রতি মৌসুমে ভাসমান পেয়ারার হাট পরিদর্শন করেন। পদ্মা সেতু উন্মুক্ত হওয়ার ফলে প্রতি বছরের চেয়ে এবছর পর্যটকদের আগমন ছিল তূলনামূলক অনেক বেশি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঝালকাঠি সদর উপজেলা, বরিশালের বানরিপাড়া, পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার ৫৫ গ্রাম জুড়ে রয়েছে পেয়ারা রাজ্য। তিন শতাধিক বছরের ঐতিহ্যবাহী এ পেয়ারা অঞ্চলে প্রতিবছরের চেয়ে এবছর পর্যটকদের আগমন অনেক বেশি। পেয়ারার সবচেয়ে বড় মেকাম সদর উপজেলার ভীমরুলীর ভাসমান হাটে পর্যটকদের নিরাপত্তার সুবিধা দিতে ঝালকাঠি থানা পুলিশের পাশাপাশি রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশেরও অবস্থান। পর্যটকরা ড্রোন ও ক্যামেরা দিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি স্মৃতি হিসেবে চিত্র ধারণ করেন।

প্রতি বছর আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র এই তিন মাস পেয়ারার মৌসুম। পাকা পেয়ারার মৌ মৌ গন্ধ নিতে আসা দেশ ও বিদেশের অনেক পর্যটকে মুখরিত হয় পেয়ারার রাজ্য। দেশের সিংহভাগ পেয়ারা উৎপাদন হয় তিন জেলার ৫৫ গ্রামে। আর এ অঞ্চলের চাষিরা খালের পানিতে ভাসমান অবস্থায় ডিঙিতে বসে বিকিকিনি করেন এই পেয়ারা। প্রতিদিন সকালে চাষিরা ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় সরাসরি বাগান থেকে পেয়ারা নিয়ে আসেন পাইকারদের কাছে। তা কিনে নিয়ে সরবরাহ করা হয় ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় সড়ক পথে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি সরবরাহ হয়ে থাকে।

ঝালকাঠির কাঁচাবালিয়া গ্রামের পেয়ারা চাষি আল আমিন মিয়া জানান, এবার মৌসুমের শুরুতেই ২০ টাকা কেজি দরে প্রতি মণ পেয়ারা ৮০০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। পর্যটকদের কাছে খুচরা বিক্রি করলে তার প্রতিমণ এক হাজার টাকারও বেশি বিক্রি হয়। পেয়ারা বাগানে এসে দেখে মুগ্ধ হয়ে পর্যটকরা এখান থেকে পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনদের জন্য পেয়ারা কিনে নেন। এই মৌসুমে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ডিঙি নৌকা, ট্রলার ব্যবসা ও খাল পাড়ে গড়ে উঠেছে শতশত খাবার হোটেল।

jagonews24

স্থানীয় বয়োবৃদ্ধ চাষিদের মতে, প্রায় ৩০০ বছর আগে ব্রাহ্মণকাঠি গ্রামের পূর্ণচন্দ্র মণ্ডল ও কালাচাঁদ মণ্ডলের হাত ধরে ভারতের গয়া থেকে এখানে পেয়ারার আগমন। সেখান থেকেই পেয়ারা চাষ শুরু হয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে গোটা আটঘর কুড়িয়ানা ইউনিয়নে ছড়িয়ে পড়ে পেয়ারার চাষ। কুড়িয়ানার নাম অনুসারে কুড়িয়ানার পেয়ারা বলে সবার কাছে পরিচিত হলেও পেয়ারার চাষ এখন আর কুড়িয়ানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। পেয়ারার চাষ এখন পাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় বিস্তৃতি ঘটেছে। পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি ঝালকাঠি সদর ও বরিশালের বানারীপাড়ার মোট ৫৫টি গ্রামের কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে পেয়ারার চাষাবাদ হয়।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. জোহর আলী বলেন, ঝালকাঠির ব্র্যান্ড পণ্য পেয়ারা ও শীতলপাটি চাষিদের এতদিনের স্বপ্ন পূরণের দ্বার উন্মোচন হয়েছে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে। কারণ বিশ্বের সব পর্যটকরা এখন সরাসরি ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে ঝালকাঠি এসে পেয়ারা রাজ্যের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন।

আতিকুর রহমান/এমআরআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।