দুই স্কুলের প্রবেশপথে বছরজুড়ে হাঁটুপানি, ভোগান্তি চরমে
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় দুইটি স্কুলের প্রবেশপথে বছরজুড়েই ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত হাঁটুসমান পানি জমে থাকছে। এ পানি মাড়িয়েই প্রতিদিন কয়েক হাজার শিক্ষার্থীকে স্কুলে আসা-যাওয়া করতে হয়। এতে চুলকানিসহ নানা চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।
ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে পড়ে গিয়ে অনেক আহতও হচ্ছেন। তবে জলাবদ্ধতা নিরসনে কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্কুল দুটি হলো সেহারচর সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয় ও ফতুল্লা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। এর মধ্যে সেহারচর সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক হাজার ৪৩৮ জন এবং ফতুল্লা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই হাজার ৬০০ জন। সবমিলিয়ে প্রতিদিন চার হাজার ৩৮ জন শিক্ষার্থীকে ময়লাযুক্ত পানি মাড়িয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুটি স্কুলেরই প্রবেশপথ এক। কিন্তু গত দুই বছর ধরে বর্ষা মৌসুম থেকে শুরু করে সারা বছরজুড়েই পানিতে ডুবে থাকে এই প্রবেশপথ। ভোগান্তির কারণে দিন দিন স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে।
স্কুল কর্তৃপক্ষের হিসাবমতে, কয়েকবছর আগে সেহারচর সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল দুই হাজার ২০০ জন এবং ফতুল্লা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে তিন হাজার ২০০ জন। সেটা কমে এখন বর্তমান শিক্ষার্থীর সংখ্যা যথাক্রমে এক হাজার ৪৩৮ জন এবং দুই হাজার ৬০০ জন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী বছর থেকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও কমে যাবে।
ফতুল্লা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসলিমা আক্তার জাগো নিউজকে বলে, ‘প্রতিদিন ময়লা ও গন্ধযুক্ত পানি মাড়িয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করতে হয়। সামনে পরীক্ষা। স্কুলে না এলে পরীক্ষায় ফেল করতে হবে। যে কারণে ইচ্ছা না থাকলেও স্কুলে যেতে হয়।’

সেহারচর সরকারি প্রথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আতিকুল ইসলাম বলে, ‘প্রথম যখন স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম তখন কয়েকদিন পানি জমে থাকতো। কিন্তু এখন সারাবছরই পানি জমে থাকে। মনে করেছিলাম পঞ্চম শ্রেণি পরীক্ষা দিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পাশের স্কুলেই ভর্তি হবো। কিন্তু এখন যে অবস্থা এখানে আর পড়ালেখা সম্ভব না। স্কুলের ভেতরের পরিবেশ ভালো হলেও রাস্তার কথা মনে হলে স্কুলে আসতে আর মন চায় না। বাবা-মাকে বলেছি এখানে আর ভর্তি হবো না।’
অভিভাবক খাদিজা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা সামান্য আয়ের মানুষ। স্বামীর সামান্য আয় দিয়ে আমাদের কোনো রকম সংসার চলে যায়। এই স্কুলে (ফতুল্লা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়) মেয়েটা নবম শ্রেণিতে পড়ে। ছেলেটা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। তাদের যাতায়াতের জন্য প্রতিদিন ১০০ টাকা রিকশা ভাড়া দিতে হয়। যা আমাদের সংসারের জন্য অতিরিক্ত খরচ।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্কুল থেকে বাসা বেশি দূরে নয়। কিন্তু ময়লা পানির কারণে তাদের রিকশায় করে আসা যাওয়া করতে হয়। অন্যথায় তারা স্কুলে আসতে চায় না। ময়লা পানি দিয়ে আসার কারণে মেয়েটার পায়ে চুলকানি হয়েছে। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে আমাদের দিন পার হচ্ছে। অন্য স্কুলেও নিতে পারছি না খরচ বেড়ে যাবে যাওয়ার আশঙ্কায়।’

সেহাচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আব্দুল মান্নান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘মাঝে মধ্যে রাস্তার পানি এত বেশি থাকে যে আমাদের ভ্যানে যাতায়াত করা ছাড়া উপায় থাকে না। যাতায়াতের কারণে শিক্ষার্থীদেরও ব্যয় বেড়েছে।’
তিনি বলেন, যাতায়াত সমস্যার কারণে আমাদের শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তবে এ সমস্যা শুধু আমাদের না, পাশে একটি হাইস্কুল রয়েছে। তাদেরও একই অবস্থা চলছে। চারপাশের বাসিন্দারাও বন্দি অবস্থায় দিনযাপন করছে। এ বিষয়ে আমরা ও ফতুল্লা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে একাধিকবার কথা বলেছি। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি।
ফতুল্লা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আনোয়ার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সবমিলিয়ে বর্তমানে এই রাস্তাটি চলাচলের জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যদি এটা কর্তৃপক্ষের নজরে যায় তাহলে এ সমস্যার সমাধান হবে। অন্যথায় মনে করতে হবে এটা আমাদের জন্য অভিশাপ।’

এ বিষয়ে ফতুল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান স্বপন জাগো নিউজকে বলেন, এই রাস্তায় আগে পানি ছিল না। পাশে রেলওয়ের কাজ চলমান থাকায় আউটলোড বন্ধ হয়ে গেছে। পানি বের হওয়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পানি সরছে না।
তিনি বলেন, আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। আশা করছি খুব দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান হবে।
এসআর/এএসএম