নওগাঁয় কাজে আসছে না প্রাথমিক শিক্ষকদের ডিজিটাল হাজিরা মেশিন

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নওগাঁ
প্রকাশিত: ০৫:৫৯ পিএম, ০২ নভেম্বর ২০২২

সারাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের শতভাগ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বায়োমেট্রিক হাজিরা সিস্টেম (ডিজিটাল হাজিরা মেশিন) চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরই ধারাবাহিকতায় নওগাঁর ছয়টি উপজেলায় ৭৪৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন কেনা হয়। তবে মেশিনটি কেনার চার বছর পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ স্কুলে চালুই হয়নি। এরইমধ্যে বেশকিছু নষ্ট হয়ে গেছে। এতে মেশিনটি যে উদ্দেশে কেনা হয়েছে তা পূরণ হচ্ছে না। নষ্ট হতে চলেছে কোটি টাকার সরঞ্জাম।

নওগাঁ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলার ১১টি উপজেলায় এক হাজার ৩৭৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ছয় উপজেলার ৭৪৫টি বিদ্যালয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে স্লিপের ফান্ড থেকে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন কেনা হয়। যার বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ১৫-২০ হাজার টাকা। কেনা মেশিনগুলোর মধ্যে সচল রয়েছে ৫৫৪টি এবং অচল ১৯১টি।

বাকি পাঁচ উপজেলার ৬২৯টি বিদ্যালয়ে মেশিনটি কেনা হয়নি। এর মধ্যে মান্দা উপজেলায় ১৮০টি, নিয়ামতপুরে ১২৮টি, পোরশায় ৮৭টি, রানীনগরে ১০০টি এবং আত্রাইয়ে ১৩০টি বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে মেশিনটি না কেনায় টাকা ফেরত চলে যায়।

এদিকে, যেসব স্কুলে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন কেনা হয়েছে তার মধ্যে কোথাও স্থাপন করা হয়েছে আবার কোথায় বাক্সবন্দি করে রাখা হয়েছে। আবার কোথাও উদ্বোধনের অপেক্ষায় আজও চালুই করা হয়নি। মেশিন কেনার পর দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ থাকায় অধিকাংশ অচল হয়ে পড়েছে। মেশিনটি কেনার পর নওগাঁ সদর উপজেলায় প্রায় এক বছর শিক্ষকরা নিজেদের মতো করে হাজিরা দিলেও করোনাভাইরাসের কারণে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আজও চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আবার বদলগাছী ও মহাদেবপুর উপজেলায় মেশিনটি স্থাপন করা হলেও উদ্বোধনের অপেক্ষায় আজও চালু হয়নি। আবার কোনো কোনো বিদ্যালয়ে মেশিনটি বাক্সবন্দি করে রাখা হয়েছে।

এ ডিজিটাল হাজিরা মেশিনের সঙ্গে ইন্টারনেট বা ডাটা সংযোগ থাকবে। ফলে অফিসে বসে উপজেলা বা জেলার কর্মকর্তারা শিক্ষকদের নির্দিষ্ট সময়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া যেকোনো সময় পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। কিন্তু যে উদ্দেশে মেশিন কেনা হয়েছিল চালু না হওয়ায় তা ব্যাহত হচ্ছে।

jagonews24

বদলগাছী উপজেলার চক-আলম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর আলম ও চাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসমা আক্তার বানু জানান, স্লিপ বরাদ্দের ২০ হাজার টাকা দিয়ে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন কেনা হয়েছিল। এরপর কোম্পানির পক্ষ থেকে বিদ্যালয়ে লাগিয়ে দেওয়া হলেও চালু করা হয়নি। মেশিনটি উদ্বোধনের পর চালু হওয়ার কথা ছিল কিন্তু আজও উদ্বোধন হয়নি।

মহাদেবপুর উপজেলার বাগাচারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোতাহার হোসেন বলেন, মেশিনটি কেনার পর কিছুদিন দেওয়ালে লাগানো ছিল। হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে পরে খুলে সেটি আলমারিতে রাখা হয়েছে। তবে কেনার পর থেকে চালু করা হয়নি।

বদলগাছী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ফজলুর রহমান বলেন, আমি এ উপজেলায় যোগদানের আগে মেশিনগুলো কেনা হয়েছে। তবে চালু করা হয়নি। নতুন করে বরাদ্দ এলে মেশিনগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

শহরের চকএনায়েত মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামিমা নাসরিন বলেন, করোনার আগ পর্যন্ত ডিজিটাল হাজিরা মেশিনটি চালু ছিল। করোনার পর থেকে এখন পর্যন্ত মেশিনটি বন্ধ আছে। ভালো আছে নাকি নষ্ট হয়েছে পরবর্তীতে আর চালু করে দেখা হয়নি। তবে মাসিক সভায় শিক্ষা অফিসাররা মেশিনটি চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

সদর উপজেলার দুর্গাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামীমা পারভীন বলেন, সেসময় ১৭ হাজার টাকা দিয়ে মেশিনটি কেনা হয়েছিল। ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত চালু ছিল। এরপর দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ ছিল। পরে স্কুল চালু হলেও মেশিনটি চালু করা হয়নি। ওয়ারেন্টিও শেষ হয়ে গেছে। শতভাগ হাজিরার জন্য চালু হয়েছিল। তবে কোনো কাজে আসেনি।

বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি নওগাঁ সদর শাখার সভাপতি ও চাকলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাসুদ করিম বলেন, প্রাথমিক শিক্ষাকে বেগবান করতে ডিজিটাল হাজিরা মেশিনটি চালু করা হয়েছিল। কোম্পানির সঙ্গে দুই বছরের চুক্তি ছিল। করোনার কারণে বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে হাতেগোনা কিছু চালু আছে। তবে মেশিনটিতে কারও ফিঙ্গার নিচ্ছে আবার কারও নিচ্ছে না, এমন অবস্থা হয়ে আছে। যন্ত্রটাও অনেকটা অকেজো হয়ে গেছে। আগামীতে কোনো নির্দেশনা পেলে ফের চালু করা হবে।

নওগাঁ সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোছা. ইতিয়ারা পারভীন বলেন, কয়েকটি স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায় ডিজিটাল হাজিরা মেশিন কিছু সচল আছে এবং কিছু অচল। মেশিনটি চালু করার জন্য এরইমধ্যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

নওগাঁ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সিদ্দীক মোহাম্মদ ইউসুফ রেজা বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ডিজিটাল হাজিরা মেশিন কেনার নির্দেশনা ছিল। সে মোতাবেক জেলার ছয়টি উপজেলার ৭৪৫টি বিদ্যালয়ে কেনা হয়। বর্তমানে সচল রয়েছে ৫৫৪টি এবং অচল ১৯১টি। অচল মেশিনগুলো সচল করতে বিদ্যালয়ে আনুষঙ্গিক যে বরাদ্দ থাকে তা থেকে মেরামতের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, একজন শিক্ষক যথা সময়ে বিদ্যালয়ে গেলেন কী না তা মেশিনের ফিঙ্গার প্রিন্ট থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যাবে। তবে মেশিনগুলো বিদ্যালয়ে স্থাপন করা হলেও সেন্ট্রালের সঙ্গে কোনো সংযোগ ছিল না। এমনকী উপজেলা, জেলা বা বিভাগের সঙ্গে কোনো সংযোগ ছিল না। যদি মেশিনটির কার্যক্রম সেন্ট্রালের সঙ্গে সংযোগ করা যেত তাহলে আরও ফলপ্রসূ হতো।

আব্বাস আলী/এমআরআর/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।