আঙুল অপারেশন করতে গিয়ে শিশুর পেট কাটলেন চিকিৎসক

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত: ০৪:০৫ পিএম, ০৩ ডিসেম্বর ২০২২

আঙুল অপারেশন করতে গিয়ে পেট কাটায় শিশুর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে ডা. মো. আহসান হাবীব নামের এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। তিনি রাজধানী ঢাকার মিরপুরে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের চিকিৎসক।

নিহত শিশুর নাম মাইশার (৫)। সে কুড়িগ্রাম পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ভেলাকোপা ব্যাপারীপাড়ার মোজাফফর আলীর মেয়ে।

গত বুধবার (৩০ নভেম্বর) সকালে ঢাকার রূপনগরে আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালে অপারেশন হয় মাইশার। কিন্তু ঘণ্টা দেড়েক পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায় শিশুটির অবস্থা খারাপ। তাকে আইসিইউ সাপোর্ট দেওয়ার জন্য গ্লোবাল স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিতে হবে। হতবিহ্বল বাবা-মা মেয়েকে নিয়ে ছোটেন মিরপুরের মাজার রোডের সেই হাসপাতালে। সেখানে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে আলম মেমোরিয়াল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের অপারেশনের টাকা ফেরত দিয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করে দেন।

বাড়িতে নিয়ে মাইশাকে গোলস করানো সময় তার পেট কাটা দেখা যায়। খবরটি ছড়িয়ে পড়লে স্বজনরা পুলিশে খবর দেন। ঘটনাস্থল ঢাকা হওয়ায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলার পরামর্শ দিয়ে পুলিশ চলে যায়। স্বজনরা মাইশাকে বাড়ির আঙিনার দাফন করেন।

শুক্রবার সকালে মাইশার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে শোকের মাতম চলছে। মেয়ের এমন ‘অস্বাভাবিক’ মৃত্যু কোনোভাবেই মানতে পারছেন না স্বজনরা। মাইশার মৃত্যুর সঠিক কারণ তদন্তের দাবি জানান।

মাইশার দিনমজুর বাবা মোজাফফর বলেন, মেয়ের হাতের আঙুল ঠিক করার জন্য ঢাকায় ডা. আহসান হাবীবের কাছে যাই। তিনি সবকিছু দেখে ৩০ নভেম্বর সকালে অপারেশন করা হবে বলে জানান। রূপনগরে আলম মেমোরিয়াল মেডিকেলে তার শেয়ার আছে জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে অপারেশন করালে খরচ কম লাগবে। সেখানে হাতের অপারেশন করার সময় মেয়ে মারা যায়। পরে তারা আমাদের টাকা ফেরত দিয়ে ধমক দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়।

তিনি আরও বলেন, আমরা গরিব মানুষ। অত কিছু বুঝি না। হাত অপারেশন করাতে গিয়ে তারা কেন আমার মেয়ের পেট কাটলো জানি না। আমাদের কোনো কাগজপত্রও দেওয়া হয়নি।

শোকে কাতর মাইশার মা বেলি বলেন, ওরা ডাক্তার না, কসাই। আমার মেয়ের পেট কাটলো কেন? ওরা আমার মেয়েকে মেরে ফেলছে। আমি এর বিচার চাই। আমি মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এর বিচার চাই।

ভুক্তভোগী পরিবার ডা. আহসান হাবীবের একটি ভিজিটিং কার্ড দেন। ওই কার্ডের নম্বরে কল দিলে অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে ডা. আহসান হাবীব বলে দাবি করেন। মাইশার অপারেশন ও মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে এ ‘চিকিৎসক’ বলেন, আমি অপারেশন করিনি। আমার শেয়ার থাকা আলম মেমোরিয়াল হাসপাতালে অপারেশন অ্যারেঞ্জ করে দেই। সেখানে ঢাকা মেডিকেলের প্লাস্টিক সার্জারির চিকিৎসক (সহকারী অধ্যাপক) ডা. শরিফুল ইসলাম অপারেশন করেন। কিন্তু দুর্ঘটনাবশত শিশুটি মারা যায়। আমি নিজেও এ ঘটনায় শক্ড।

আঙুল অপারেশন করার সময় পেট কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. আহসান হাবীব বলেন, এটা শিশুর পরিবারকে জানিয়ে করা হয়েছে। হাতের আঙুল অপারেশন করে ওই স্থানে সংযুক্ত করার জন্য পেট থেকে চামড়া নেওয়া হয়েছিল।

পরিণত বয়সের মানুষের ক্ষেত্রে পায়ের থাই থেকে চামড়া নেওয়া হয়। কিন্তু শিশুটির থাই সরু থাকায় তার পেট থেকে চামড়া নিয়ে সেলাই করে দেওয়া হয়েছিল।’ যোগ করেন তিনি।

তাহলে হাতের অপারেশন করতে গিয়ে মাইশার মৃত্যুর কারণ কী, এমন প্রশ্নে এই ‘চিকিৎসক’ বলেন, আমি নিজেও অপারেশন থিয়েটারে প্রায় আধা ঘণ্টা ছিলাম। সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। পরে আমি বাসায় চলে যাই। পরে শিশুটির মৃত্যুর কারণ জানতে ওই সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানিয়েছেন, সম্ভবত অ্যানেস্থিসিয়ার কারণে শিশুটির মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। আসলে বেশিক্ষণ এনেস্থেটিক অবস্থায় থাকায় হয়তো সহ্য করতে পারেনি। এখানে অন্য আর কোনো কারণ নেই। তবে পুরো ঘটনায় আমি নিজেও মর্মাহত।

নিজেকে কুড়িগ্রামের (নাজিম খাঁ) সন্তান দাবি করে ডা. মো. আহসান হাবীব বলেন, রোগীটা আমার এলাকার। কুড়িগ্রামের যে কোনো লোক আসলে আমি সাহায্য করি। আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। এটা আসলে দুর্ঘটনা। তারপরও মেনে নেওয়া কঠিন। আমি নিজেও সেদিন স্তব্ধ হয়ে গেছি।

ফজলু ফরায়েজী/আরএইচ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।