ছাগলনাইয়ার ৪ ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের তিনটিই পরিত্যক্ত!

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফেনী
প্রকাশিত: ০৭:০৩ পিএম, ১৯ ডিসেম্বর ২০২২

ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার চারটি ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের (এফডব্লিউসি) মধ্যে তিনটির ভবনই দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এসব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে জনবল সংকটের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

জরাজীর্ণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো হলো, উপজেলার মহামায়া ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, শুভপুর ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ও রাধানগর ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর ভবনসমূহ দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

জেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের মধ্যে চারটিতে পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র (এফডব্লিউসি) রয়েছে। এগুলোর মধ্যে কেবল ঘোপাল ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি ভালো অবস্থায় রয়েছে। আর পাঠাননগর ইউনিয়নে স্বাস্থ্য বিভাগের একটি স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র রয়েছে।

সূত্র জানায়, মহামায়া ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে চারটি পদের মধ্যে একজন উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (স্যাকমো) ও একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডব্লিউভি) রয়েছেন। ওই কেন্দ্রে একজন আয়া ও একজন নৈশপ্রহরীর পদ থাকলেও দীর্ঘদিন খালি রয়েছে।

এছাড়া, সম্প্রতি মহামায়া ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের বর্তমান স্যাকমো অন্যত্র বদলির আদেশ পেয়েছেন। তিনি চলে গেলে ওই কেন্দ্রটি কেবল পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা নির্ভর হয়ে পড়বে। স্যাকমো এবং পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকাদের বাসভবনগুলোও পরিত্যক্ত ও বসবাস অযোগ্য হওয়ায় তাদের অন্যত্র বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে হয়।

সম্প্রতি সরেজমিনে মহামায়া ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ৪৩ বছরের পুরোনো পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ভবনটির বিভিন্ন অংশে পলেস্তারা খসে পড়ছে। সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। বিদ্যুৎ লাইন জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। দরজা-জানালা ভাঙা। একটু বৃষ্টি হলেই ছাদ চুয়ে পানি পড়ে সবকিছু ভিজে নষ্ট হয়ে যায়। চিকিৎসাসেবা নিতে আসা রোগীরা আতঙ্কে থাকেন। অপারেশন থিয়েটার (ওটি) পুরোপুরি অচল। শয্যাগুলো জরাজীর্ণ, ধুলাবালি পড়ে রয়েছে। সব কক্ষই ব্যবহারের অনুপযোগী। ওইকেন্দ্রে দীর্ঘদিন থেকে স্বাভাবিক প্রসব সেবা বন্ধ।

মহামায়া ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ঢুকে স্যাকমো আবদুর রহিমকে পাওয়া যায়। তিনি তখন জ্বর-কাশি নিয়ে কেন্দ্রে আসা এক রোগীকে চিকিৎসা দিচ্ছিলেন।

আবদুর রহিম জানান, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা পাশের গ্রামে একটি কমিউনিটি ক্লিনিকে রোগী দেখতে গেছেন। তাই তিনি তখন একাই ওই কেন্দ্রে সাধারণ রোগী দেখছিলেন। আয়া ও নিরাপত্তাকর্মী নেই। বসার জন্য কক্ষ নিজেই পরিষ্কার করতে হয়। এক কাপ চা বা একটু নাশতা করার জন্য দরজায় তালা লাগিয়ে বাইরে যেতে হয়।

তিনি জানালেন, তারও অন্যত্র বদলির আদেশ হয়েছে। তিনি সহসাই চলে যাবেন। তখন ওই কেন্দ্রে কেবল একজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকাই থাকবেন। তখন কেন্দ্রটির চিকিৎসাসেবা আরও ভেঙে পড়বে।

কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়, মহামায়া ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি ১৯৭৯ সালে স্থাপিত হয়। ভবনটি সংস্কার ও মেরামতের জন্য কয়েকবার কিছু অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও উন্নয়নের তেমন ছোঁয়া লাগেনি। স্থানীয় অনেক রোগী চিকিৎসা নিতে মহামায়া ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে আসেন। ভুতুড়ে পরিবেশ দেখে কেউ কেউ অন্যত্র চলে যান। তারপরও প্রতিদিন গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ জন রোগী দেখতে হয়। জটিল রোগ হলে ওইসব রোগীকে ছাগলনাইয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কেন্দ্রটিতে জরুরি নথিপত্র ও ওষুধ সংরক্ষণের জন্য আলমারিও নেই।

স্থানীয় মহামায়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শাহজাহান মিনু বলেন, ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটির বাইরের পরিবেশ কিছুটা স্বাভাবিক বলে মনে হলেও ভেতরে ঢুকলে মনে হয় যেন ভূতের বাড়ি। ভীতিকর পরিবেশ। শুধু নেই আর নেই।

তিনি স্থানীয় জনগণের স্বাস্থ্যসেবার কথা বিবেচনা করে কেন্দ্রটি দ্রুত পুনর্নির্মাণের দাবি জানান।

এদিকে, খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, শুভপুর ও রাধানগর ইউনিয়ন পরিবার কেন্দ্র দুটিতেও একজন করে স্যাকমো ও একজন এফডব্লিউভি, একজন করে আয়া ও একজন নিরাপত্তা প্রহরীর পদ রয়েছে। তবে শুভপুরে স্যাকমোর পদটি বর্তমানে খালি রয়েছে। এছাড়া দুটি ইউনিয়নেই আয়া ও নিরাপত্তা প্রহরীর পদও শূন্য।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে শুভপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের স্যাকমো শহীদ উল্যাহ বলেন, জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত ভবনে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। সব সময় ভয় এবং আতঙ্ক কাজ করে। তবে বর্ষাকালে দুর্ভোগের অন্ত ছিল না। ছাদ চুয়ে পানি পড়ে অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

শুভপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মজনু বলেন, উপজেলা পরিষদের সমন্বয় সভায় এই পরিত্যক্ত ভবনের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রাধানগর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা নাসিমা আক্তার বলেন, উপ-সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার পদটি শূন্য থাকায় মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। একা সেবা দিতে গিয়ে আমাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

রাধানগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন মজুমদার বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে নতুন ভবন নির্মাণের প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। এরইমধ্যে প্রাক্কলনও তৈরি হয়েছে। এলজিইডি থেকে অনুমোদন এলে পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে যাবে।

ফেনী জেলা পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবু সালেহ মোহাম্মদ ফোরকান উদ্দিন বলেন, মহামায়া, শুভপুর ও রাধানগর ইউনিয়ন পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলো জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত। সেগুলোতে জনবল সমস্যাও প্রকট। তাই সেবাদানে সমস্যা হচ্ছে। খুব শিগগির ভবনগুলো ভেঙে নতুন ভবনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। দরপত্র প্রক্রিয়া শেষে নির্মাণ কাজ শুরু হবে।

তিনি আরও বলেন, ছাগলনাইয়া উপজেলা ছাড়াও জেলার সব কেন্দ্রেই জনবল সংকট রয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে সারাদেশে ৩০৩ জন পরিবার পরিদর্শিকা (এফডব্লিউভি) নিয়োগ ও পদায়ন করা হয়েছে। তবে ফেনী জেলায় একজনকেও পদায়ন করা হয়নি।

আবদুল্লাহ আল-মামুন/এমআরআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।