লাখো পর্যটকে মুখরিত কক্সবাজার
তিনদিনের ছুটিতে ফের সরব হয়ে উঠেছে কক্সবাজার। সমুদ্র সৈকতসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকা পর্যটকে ছেয়ে গেছে। সাগর তীরে আনন্দে মেতেছেন ভ্রমণ পিয়াসুরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে সকাল থেকে পর্যটকরা ভিড় করছেন। ভিড় রয়েছে হোটেল-মোটেলের অলিগলিতেও। পর্যটকবাহী সাধারণ পরিবহন, ইজিবাইক, সিএনজি অটোরিকশায় বাস টার্মিনাল বাইপাস সড়ক, কলাতলী ডলফিন মোড়, হোটেল-মোটেল জোন, লাবণী, শৈবাল সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।
করোনাকালীন সময়ে হোটেল-মোটেলসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ভুতুড়ে পরিবেশ তৈরি হয় কক্সবাজার সৈকত ও আশপাশের এলাকায়। গত বছরের শেষ সময়ে খুলেছে হোটেল-মোটেলসহ পর্যটন স্পট। এরপর বিভিন্ন দিবসে কিছু পর্যটক এসেছিল সৈকত নগরী কক্সবাজারে। এরপর বর্ষা, ঘূর্ণিঝড়সহ সব মিলিয়ে আবারও ভাটা পড়ে পর্যটনে। নাইক্যংছড়ি-উখিয়া-টেকনাফে মিয়ানমার সীমান্তের ওপারে সাম্প্রতিক সংঘাত ও নাফ নদীর নাব্যতা সংকটে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌ-পথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ। স্বল্প ব্যয় ও সহজ পথে সেন্টমার্টিন ভ্রমণ বন্ধ থাকায় কক্সবাজারে মধ্য ও নিম্নবিত্ত পর্যটক উপস্থিতি নেই বললে চলে। ফলে, গেস্ট হাউজ, কটেজ ও ননস্টার হোটেলগুলো ফাঁকা যাচ্ছে মৌসুমের এ সময়ে। এবারে বিজয় দিবসের ছুটি সাপ্তাহিক বন্ধের দিন পড়ায় তেমন পর্যটক উপস্থিতি হয়নি।
কিন্তু সেই হতাশায় আলো দেখাচ্ছে বড় দিনের ছুটি। সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে বড়দিনের ছুটি এক হওয়ায় টানা তিনদিনের ছুটির সুযোগকে কাজে লাগাতে ভ্রমণ প্রেমীরা কক্সবাজার আসছেন। এ তিনদিনের জন্য আগাম বুকিং নিয়েছেন হোটেল-মোটেল ও কটেজ কক্ষ। ব্যয়বহুল জেনেও অনেকে আগাম টিকেট কেটেছেন কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌ-রুটে চলা কর্ণফুলী ও বার আউলিয়া জাহাজের টিকেট। সেন্টমার্টিনেও এবারে আগাম কিছু বুকিং পেয়েছে সেখানকার হোটেল ব্যবসায়ীরা।

এ তিনদিনের ছুটিতে কক্সবাজারে ৪-৫ লাখ পর্যটকের উপস্থিতির আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এসময়ে ভালো ব্যবসা হতে পারে বলে আশা করছেন তারা।
অতিরিক্ত পর্যটক আগমন মাথায় রেখে সেভাবে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশ। নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রাথমিক চিকিৎসা, তথ্য সেবা, পানীয় জলের ব্যবস্থাসহ নানা সেবামূলক কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্যুরিস্ট পুলিশের সিনিয়র এএসপি মিজানুজ্জামান চৌধুরী।
হোটেল মালিকদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, ছুটিকে টার্গেট করে এক সপ্তাহ আগে থেকে আগাম বুকিং হয়ে আছে সাড়ে চার শতাধিক হোটেল-মোটেল-রিসোর্ট। এতে টইটম্বুর পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সর্তক অবস্থায় রয়েছে পুলিশ। যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে পর্যটন স্পটগুলো। ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা ও খাবার পানির ব্যবস্থা রয়েছে সৈকতে।
ট্যুর অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক) সভাপতি মো. রেজাউল করিম বলেন, তিন দিনের ছুটিতে কক্সবাজারের সিংহভাগ হোটেল আগাম বুকিং হয়েছে। পর্যটকরা অনলাইনে রুম চাইলেও দেওয়া যাচ্ছে না। ছুটির দিনগুলোতে ঝিমিয়ে পড়া কক্সবাজার লাখো পর্যটকে আবারও সরব হয়ে উঠেছে।
কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে আসা পর্যটক দম্পতি আতিকুর রহমান সম্রাট ও আনিকা আমিন জানান, দীর্ঘদিন কোথাও যাওয়া হয়নি- তাই বড়দিনের ছুটিসহ টানা বন্ধ পেয়ে বাড়ির সবাইকে নিয়ে কক্সবাজার এসেছি। আমাদের মতো আরও অনেকে এসেছেন বেড়াতে। হোটেলের প্রায় রুমে মানুষের উপস্থিতি রয়েছে।

তারকা হোটেল হোয়াইট অর্কিডের মহাব্যবস্থাপক রিয়াদ ইফতেখার বলেন, পর্যটন মৌসুমে প্রায় প্রতিদিন কমবেশি পর্যটক কক্সবাজারে অবস্থান করেন। সরকারি দিবসের সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি মিলে টানা ছুটি পেলে পর্যটক সমাগম বাড়ে। আর সাপ্তাহিক ছুটিতে যদি বিশেষ দিবসগুলো পড়ে তখন আবার পর্যটক সমাগম হয় না বললেই চলে। খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব বড়দিনের সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি মিলে টানা বন্ধ পেয়ে অনেক লোক বেড়াতে আসছেন। আমাদের হোটেল শুক্র ও শনিবার সম্পূর্ণ বুকড।
কলাতলীর সি-নাইট গেস্ট হাউজের ব্যবস্থাপক শফিক ফরাজী বলেন, হোটেল-মোটেলে যে পরিমাণ ধারণ ক্ষমতা তার চেয়েও লোকসমাগম বেশি। রুম বুকিং করে যারা এসেছেন তারা ছাড়া বাকিরা ভোগান্তিতে পড়তে পারেন। দেড় লক্ষাধিক লোক থাকার আয়োজন রয়েছে কক্সবাজারে। কিন্তু এ তিনদিনে ৪-৫ লাখের বেশি পর্যটক আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
সি সেইফ লাইফ গার্ডের সুপারভাইজার মোহাম্মদ ওসমান বলেন, বিপুল সংখ্যক নারী-পুরুষ সৈকতে নিয়মিত থাকেন। বন্ধের দিনে এ সংখ্যা বাড়ে। ঢেউয়ের তালে দাপিয়ে বেড়ান সব বয়সী পর্যটক। তাদের নিরাপদ রাখতে সতর্কতায় থাকি আমরা।
তারকা হোটেল ওশান প্যারাডাইস লিমিটেডের পরিচালক আবদুল কাদের মিশু বলেন, করোনা আমাদের ঋণগ্রস্ত করেছে। বিজয় দিবসে পর্যটক উপস্থিতি বাড়বে ভেবেছিলাম। কিন্তু মৌসুম শেষ হতে চললেও এবারের পর্যটন মৌসুম আমাদের হতাশ করেছে। তবে, শুক্রবার থেকে রোববার পর্যটকের উপস্থিতি আমাদের আশান্বিত করছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার জোনের এসপি মো. জিল্লুর রহমান বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় সৈকত ও আশপাশে পোশাকধারী পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। সৈকতে বিচ বাইক নিয়েও রয়েছে টহল। তিনটি বেসরকারি লাইফ গার্ড সংস্থার অর্ধশতাধিক প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড কর্মী। কন্ট্রোল রুম, পর্যবেক্ষণ টাওয়ারসহ পুরো সৈকত পুলিশের নজরদারির আওতায় রয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, পর্যটকদের অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানি রোধে, পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোষাকে এবং পর্যটক বেশেও পুলিশের নারী সদস্য সৈকতে ঘুরছেন। সব মিলিয়ে পর্যটক নিরাপত্তায় সবসময় সতর্ক রয়েছি।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শাহীন ইমরান বলেন, পর্যটকদের সুবিধার্থে সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলীসহ প্রতিটি পয়েন্টে তথ্য কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। পর্যটক হয়রানি বন্ধে মাঠে থাকছে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত। কোথাও পর্যটক হয়রানির অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে
সায়ীদ আলমগীর/আরএইচ/এএসএম