ফরিদপুরে একবছরে মহাসড়কে ২২৬ দুর্ঘটনা, হতাহত ছয় শতাধিক
ফরিদপুরে গত একবছরে বিভিন্ন মহাসড়কে প্রায় দুই শতাধিক দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সময়ে এসব দুর্ঘটনায় প্রয় তিন শতাধিক মানুষ নিহত ও তিন শতাধিক আহত হয়েছেন। ফরিদপুর-মাদারীপুর অঞ্চলের আওতাধীন মহাসড়কগুলোতে এসব দুর্ঘটনা ঘটে। এসব মহাসড়কে বেপরোয়া চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহন থেকে হাইওয়ে পুলিশ ও জেলা পুলিশ প্রায় ১৫ কোটি টাকা জরিমানা আদায় করেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদারীপুর রিজিয়নের আওতাধীন ৯৮৭ কিলোমিটার মহাসড়ক। এর মধ্যে ১৮টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি রয়েছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব মহাসড়কে ২২৬টি দুর্ঘটনা ঘটে। এতে নিহতের সংখ্যা ৩০৫ জন এবং আহত হয়েছেন ৩১৬ জন।
মাদারীপুর রিজিয়ন (হাইওয়ে পুলিশ) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব মহাসড়কে বেপরোয়া গতিতে ও ট্রাফিক নিয়ম না মেনে যানবাহন চালানোর অপরাধে হাইওয়ে ও জেলা পুলিশ ১৩ কোটি ১১ লাখ ৪৮ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। এছাড়া একই সময়ে বিভিন্ন যানবাহন থেকে ১ কোটি ৭২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৫০ টাকা জরিমানা আদায় করেছে ফরিদপুর জেলা পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ।

এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলা বাস মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গোলাম নাসির জাগো নিউজকে বলেন, ২২টি জাতীয় মহাসড়কে সব ধরনের অবৈধ থ্রি-হুইলার (নছিমন, করিমন, ভটভটি, মাহিন্দ্র, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক ও ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল) চলাচল বন্ধের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও এসব অবৈধ যান মহাসড়কে অবাধে চলাচল করছে। যা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দক্ষিণবঙ্গের আঞ্চলিক ও দূরপাল্লায় পরিবহন চলাচল বৃদ্ধি পেয়েছে। মহাসড়কে অবৈধ যানচলাচলের কারণে প্রতিনিয়ত নানা দুর্ঘটনা ঘটছে।
সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি কারণ হলো ত্রুটিপূর্ণ সড়কব্যবস্থা। মহাসড়কগুলোতে বাঁক থাকার কারণে সামনের দিক থেকে আসা গাড়ি দেখতে না পেয়ে অনেক চালক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে থাকেন। রাস্তার পাশে হাট-বাজার স্থাপন এবং ওভারব্রিজ না থাকাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

ফরিদপুর জেলা বাস মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক জোবায়ের জাকির জাগো নিউজকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালকরাই যে দায়ী তা নয়, যাত্রী, পথচারী, রাস্তার পাশের দোকান, স্কুল, অনেক সময় বৃদ্ধ-বাচ্চারাও দৌড়ে রাস্তা পার হয়। রাস্তায় অনেকসময় কম গতির নসিমন করিমন ভটভটি চলে। তাদের মাঝেও সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সরকার, চালক, মালিক, শ্রমিক ও যাত্রী সবাইকে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। সবার মনে রাখা উচিত সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি।
ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক প্রবীর কান্তি বালা জাগো নিউজকে বলেন,
নানা কারণে দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। বিশেষ করে চালকের অসাবধানতা-অদক্ষতা ও লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, রাস্তার স্বল্পতা-অপ্রশস্ততা, পাল্লা দিয়ে গাড়ি চালানো ও ওভারটেকিং, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা ও ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করা, রাস্তার মোড়ে প্রয়োজনীয় ডিভাইডার না থাকা, ওভারব্রিজের স্বল্পতা, সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে অসচেতনতা, ফুটপাত হকারদের দখলে থাকা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সড়কের ওপর অবৈধ হাটবাজার ও স্থাপনা, যত্রতত্র রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, অতিরিক্ত মাল ও যাত্রী বোঝাই প্রভৃতি কারণে যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এছাড়া পথচারীদের ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং, ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করার ফলেও অনেক সময়ে দুর্ঘটনা ঘটে।

পরিবহন চালক মো. লিয়াকত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, অনেক দুর্ঘটনা ঘটে রাস্তার কারণে। বাধ্য হয়ে দীর্ঘক্ষণ গাড়ি চালানোর কারণেও দুর্ঘটনা হয়। ছোট যানবাহনগুলো আইন না মেনে রাস্তায় এলোমেলো চলাচল করে। তাদের বেপরোয়া চলাচলে দুর্ঘটনা ঘটে। রাস্তার ওপর হাটবাজার, রাস্তায় গাড়ি আছে কী না, তা না দেখেই পারাপারের প্রবণতার কারণেও দুর্ঘটনা হয়। অথচ দুর্ঘটনা হলে সব দায় চাপানো হয় চালকের ওপর।
ফরিদপুর আদালতের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রুকু সেলিম জাগো নিউজকে বলেন, চালকরা অনেক সময় ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত অবস্থায় গাড়ি চালান, যার ফলে একসময় নিজের অজান্তেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেন। তাই চালকদের এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। কোনোভাবেই অসুস্থ বা ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো যাবে না। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ ওভারটেকিং প্রবণতা। সাধারণত রাস্তায় ধীরগতির গাড়িগুলোকে ওভারটেকিংয়ের প্রয়োজন পড়ে। এসময় হর্ন বাজিয়ে সামনের গাড়িকে সংকেত দিতে হয়। কিন্তু অনেক সময় সংকেত না দিয়ে একজন আরেকজনকে ওভারটেক করার চেষ্টা করে, যার ফলে সামনের দিক থেকে আসা গাড়ি বের হতে না পেরে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। তাই সঠিক নিয়ম মেনে সতর্কতার সঙ্গে ওভারটেক করা উচিত।

ফরিদপুর জেলা পুলিশের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (প্রশাসন) তুহিন লস্কর জাগো নিউজকে বলেন, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ফরিদপুরের আওতাধীন সড়ক-মহাসড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহনে ৫ হাজার ৫৯৩টি মামলা করা হয়। এর থেকে ১ কোটি ৭২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৫০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এছাড়া প্রায় ১০ হাজার রেজিস্ট্রেশনবিহীন মোটরসাইকেল জব্দ ও রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে প্রায় ১০ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশের মাদারীপুর রিজিয়নের ফরিদপুর কার্যালয়ের পুলিশ সুপার মো. মাহবুবুল আলম বলেন, মহাসড়কগুলোতে চলাচলকারী বিভিন্ন ধরনের যানবাহনগুলো হাইওয়ে পুলিশ নজরদারিতে রাখে। এসময় বেপরোয়া চলাচলকারী যানবাহনগুলোকে মামলা ও জরিমানা করা হয়। মাদারীপুর রিজিয়নের আওতাধীন ৯৮৭ কিলোমিটার মহাসড়কের মধ্যে ১৮টি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে ৩৮টি টহল টিম রয়েছে। এসব টিমের সদস্যরা শিফট ভাগ করে রাতদিন ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করে থাকেন। মহাসড়কগুলোতে চলাচলকারী সাধারণ মানুষের যাতে কোনো সমস্যা না হয়, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মহাসড়কগুলোয় পুলিশ সদস্যরা কাজ করে থাকেন। সড়ক দুর্ঘটনা রোধেও পুলিশ চালকদের সচেতনতার পাশাপাশি নিয়ম অনুযায়ী সব ধরনের কাজ করছেন।
এন কে বি নয়ন/এমআরআর/জিকেএস