বিয়ের প্রতিশ্রুতিতে গর্ভপাতের পর লাপাত্তা প্রেমিক
ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলায় প্রেমের সম্পর্কের জেরে শারীরিক সম্পর্কের ফলে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন এক তরুণী। তবে বিয়ের প্রলোভনে গর্ভপাত করানোর পর প্রেমিক লাপাত্তা হয়ে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় মঙ্গলবার (১১ এপ্রিল) রাতে ওই তরুণী প্রেমিকসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাসিন্দা গৌরাঙ্গ বিশ্বাসের ছেলে হৃদয় বিশ্বাস দুই বছর আগে এইচএসসি অধ্যয়নরত এক ছাত্রীকে প্রেমের প্রস্তাব দেন। প্রথমে রাজি না হলেও একপর্যায়ে তিনি হৃদয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ান। এর কিছুদিন পর হৃদয় ওই তরুণীকে তার এক বন্ধুর বাড়িতে নিয়ে শারীরিক সম্পর্ক করেন। এসময় ওই মেলামেশার নগ্ন ছবি ধারণ করে রাখেন।
এরপর ওই নগ্ন ছবি দিয়ে ছাত্রীকে ব্ল্যাকমেইল করে একাধিকবার জোর করে শারীরিক সম্পর্ক করেন। একপর্যায়ে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে ওই ছাত্রী। বিষয়টি হৃদয়ের পরিবারকে জানায় ওই ছাত্রী। তখন হৃদয়ের মা-বাবা হৃদয়ের সঙ্গে ওই ছাত্রীর বিয়ে দেবে এমন কথা দিয়ে তাকে গর্ভপাত করান। আর এই গর্ভপাতে সহযোগিতা করেন হৃদয়ের মা করবী দস্তীদার বিশ্বাস ও তার বোন ডা. সুরঞ্জনা বিশ্বাস।
এরপরই লাপাত্তা হয়ে যান হৃদয়। পরিবারের সদস্যরাও সব কিছু অস্বীকার করেন। উপায়ন্তর না পেয়ে চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা কবির ত্রপার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন সদ্য এইচএসসি পাস করা ওই ছাত্রী। ইউএনও এক সপ্তাহের মধ্যে আপোষ মীমাংসা করে দেবে বলে গত ৯ এপ্রিল বদলি হয়ে যান তিনি। এরপর ১১ এপ্রিল চরভদ্রাসন থানায় গিয়ে ওই ছাত্রী হৃদয় বিশ্বাস (২০), হৃদয়ের মা করবী দস্তীদার বিশ্বাস (৫০), তার বোন ডা. সুরঞ্জনা বিশ্বাস (৩০) ও কাকা বিমল বিশ্বাসের (৩৮) বিরুদ্ধে মামলা করেন।
ভুক্তভোগী কলেজছাত্রী জাগো নিউজকে বলেন, হৃদয় আমার সবকিছু শেষ করে দিয়েছে। প্রেমের অভিনয় করে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে শারীরিক সম্পর্ক করে। একপর্যায়ে আমি ওর থেকে দূরে সরে আসতে চাই, কিন্তু হৃদয় তখন আমার নগ্ন ছবি ফেসবুকে দিয়ে দেবে বলে ভয় দেখায়। তখন লোকলজ্জার ভয়ে মনের বিরুদ্ধে গিয়ে আমি পুনরায় ওর কথায় রাজি হয়ে একাধিকবার শারীরিক মেলামেশা করি। আমি একপর্যায়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ি। তখন হৃদয়, ওর মা, বাবা ও বোন আমাকে বলে পেটে বাচ্চা থাকলে বিয়ে কীভাবে হবে। সমাজের মানুষ কী বলবে। তুমি গর্ভপাত করে ফেলো, তারপর বিয়ের ব্যবস্থা করছি। তাদের ছলনায় পড়ে আমি রাজি হয়ে যাই।
তিনি বলেন, হৃদয়ের মা গত ২৩ ফেব্রুয়ারি আমাদের বাড়িতে এসে বিয়ের কথা বলে আমাকে চারটি ট্যাবলেট দিয়ে খেতে বলে। ওই ওষুধ খাওয়ার পর আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। এই খবর হৃদয়ের মা পেয়ে আমাকে পাশের সদরপুর উপজেলার পদ্মা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায়। সেখানে হৃদয়ের বোন ডা. সুরঞ্জনার চেম্বার আছে। তিনি আমার পেটের বাচ্চা ফেলার যাবতীয় ব্যবস্থা করেন। এরপর সেখান থেকে আমাকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। কিছুদিন বাড়িতে থাকার পর আমি সুস্থ হই। কিন্তু তারা আর কোনো খবর নেয়নি। যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।
ওই ছাত্রী বলেন, আমরা খুবই গরিব মানুষ। আমার বাবা একটি অফিসে পিওনের কাজ করতেন। হঠাৎ অসুস্থ হয়ে প্যারালাইজড হয়ে ঘরে পড়ে আছেন। তার চাকরি এখন কোনোরকমে করছেন আমার অসুস্থ মা। এবছর আমি এইচএসসি পাস করেছি, কোথাও ভর্তি হতেও পারছি না।
ভুক্তভোগী আরও বলেন, কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা কবির ত্রপার কাছে অভিযোগ দিই। কিন্তু তিনি এক সপ্তাহে আপোষ মীমাংসা করে দেবে বলে আমাকে ঘোরায়। এরপর গত ৯ এপ্রিল বদলি হয়ে যান। পরে মঙ্গলবার চরভদ্রাসন থানায় মামলা করেছি।
ভুক্তভোগী ওই ছাত্রীর মা জাগো নিউজকে বলেন, আমরা গরিব মানুষ, তাই আমাদের পাশে কেউ দাঁড়াতে চায় না। হৃদয়ের পরিবার প্রভাবশালী, আমাদের বিভিন্নভাবে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। আমার মেয়ের সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।
এদিকে, ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছে হৃদয় বিশ্বাস। তার মোবাইলফোনে কল করে এবং বাড়িতে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। হৃদয় কোথায় আছে সে বিষয়েও পরিবারের সদস্যরা মুখ খুলতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে হৃদয় বিশ্বাসের কাকা বিমল বিশ্বাস বলেন, হৃদয় এখন বাড়িতে নেই। জমিজমা নিয়ে একটি পক্ষের সঙ্গে আমাদের বিরোধ আছে। সেই বিরোধী পক্ষের লোকজনই ওই মেয়েটিকে দিয়ে সমাজে আমাদের হেয় করতে এসব গুজব ছড়াচ্ছে। আমার ভাতিজা হৃদয় এসব কাজের সঙ্গে জড়িত নয়। মেয়েটির পরিবার লোভী, তাই আমাদের পরিবারকে জড়িয়ে কিছু অর্থ নিতে চাচ্ছে।
চরভদ্রাসন সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আজাদ খান জাগো নিউজকে বলেন, মেয়েটি যেদিন ইউএনওর কাছে অভিযোগ দেয় সেদিন আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। ইউএনও চেষ্টা করেছিলেন মীমাংসা করার জন্য, কিন্তু ছেলের পরিবার ঘোরানোর কারণে তা সম্ভব হয়নি। মেয়েটির সঙ্গে ওই ছেলে ও তার পরিবার যা করেছে তা খুবই ন্যাক্কারজনক ঘটনা।
এ বিষয়ে সদ্য বদলি হওয়া চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা কবির ত্রপার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
তবে চরভদ্রাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সেলিম রেজা বলেন, এক কলেজছাত্রী বাদী হয়ে মঙ্গলবার তার প্রেমিক হৃদয়সহ চারজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছে।
এন কে বি নয়ন/এমআরআর/এএসএম