ঝালকাঠিতে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই বিক্রি হচ্ছে ওষুধ


প্রকাশিত: ০৩:০৭ এএম, ২৯ মার্চ ২০১৬

ওষুধ নিয়ন্ত্রণ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ঝালকাঠি জেলায় যত্রতত্র ফার্মেসি খুলে চলছে ওষুধ কেনা-বেচার ব্যবসা। জেলা সদরসহ ৪টি উপজেলা ও আশপাশের এলাকাগুলোতে ৪ সহস্রাধিক ফার্মেসি গড়ে উঠেছে। এসব ফার্মেসির বেশির ভাগেরই নেই ফার্মাসিস্ট সনদ। অনেকের ড্রাগ লাইসেন্সটি পর্যন্ত নেই। ওষুধ প্রশাসনের নজরদারির অভাবে এসব ফার্মেসিতে যেমন মিলছে অবৈধ ওষুধ, তেমনি সেলফ প্রেসক্রিপশনে নিম্নমানের ও ভুল ওষুধ বিক্রি করছে বিক্রেতারা। ফলে একদিকে যেমন ওষুধ ব্যবসায়ীরা হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা, সেই সঙ্গে সাধারণ ক্রেতারা প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনাও।

ওষুধ নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৪০ অনুসারে ওষুধের দোকান বা ফার্মেসি দেয়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই ওই ব্যক্তিকে কমপক্ষে ছয় মাসের ফার্মাসিস্ট কোর্স করে সনদ সংগ্রহ করতে হবে। পরে সংশ্লিষ্ট ড্রাগ সুপারের কার্যালয়ে ফার্মাসিস্ট সনদ জমা দিয়ে ড্রাগ লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে। ড্রাগ সুপার আবেদন যাচাইয়ের পর ড্রাগ লাইসেন্স দিলেই কেবল ওষুধের ব্যবসা বা ফার্মেসি দেয়া যাবে।

এদিকে, জেলায় কী পরিমাণ ফার্মেসি রয়েছে এর কোনো পরিসংখ্যান নেই জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় এবং কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতিতেও। তবে ঝালকাঠি জেলায় ৪ সহস্রাধিক ফার্মেসির মধ্যে ড্রাগ লাইসেন্স রয়েছে মোট ৫০৭টির।

সরেজমিনে বেশ কিছু ফার্মেসিতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, হাতে গোনা মাত্র ১০-১২ জন ওষুধ ব্যবসায়ীর কেবল ফার্মাসিস্ট সনদ রয়েছে। অন্যদের কারোরই মূলত ওই সনদ নেই। তবে প্রায় প্রত্যেকেরই ড্রাগ লাইসেন্স রয়েছে। আর এসব ড্রাগ লাইসেন্সে উল্লিখিত ফার্মাসিস্টের নাম কেবল কাগজেই আছে, বাস্তবে অনেকেই ড্রাগ লাইসেন্সে উল্লিখিত ফার্মাসিস্টকে দেখাতে পারেনি। স্বাধীন মেডিকেল হলের ড্রাগ ও ফার্মাসিস্ট উভয় সনদ মালিকের নামে। অথচ দোকান পরিচালনা করছেন কর্মচারীরা।

কর্মচারী পলাশ বলেন, `মালিক কোয়েল আমার বন্ধু, সে ক্যাশে বসে এবং আমিই এ দোকান পরিচালনা করছি।` একই ধরনের চিত্র অন্যান্য ফার্মেসিগুলোর। আবার অনেকে ড্রাগ লাইসেন্স কিনে আদালতের মাধ্যমে নাম পরিবর্তন করে। এমন সংখ্যাও শতাধিক। কিছু ফার্মেসিতে ফার্মাসিস্ট সনদ তো দূরের কথা, ড্রাগ লাইসেন্সটি পর্যন্ত নেই।

কয়েক বছর আগে শ্রাবণী মেডিকেল হল অবৈধ ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি করার দায়ে জেল-জরিমানা একাধিকবার ভোগ করেছেন মালিক মানিক গোস্বামী। বর্তমানে ফায়ার সার্ভিস মোড়স্থ একটি ফার্মেসির বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ করেছেন এলাকাবাসী।

গোরস্থান রোডস্থ জনৈক হুমায়ুন কবীর বাদল অভিযোগ করে বলেন, প্রেসক্রিপশন ছাড়াই ওষুধ বিক্রি হচ্ছে দেদারছে। এছাড়াও নেশা জাতীয় দ্রব্য প্যাথেডিন মরফিন বিক্রি করছে অহরহ। ৭০/৮০ টাকা দামের একটি ইনজেকশন বিক্রি করছে ২৫০ থেকে ৩শ টাকায়। যাতে করে আঙুল ফুলে কলা গাছ নয় তাল গাছ হয়ে যাচ্ছে ওষুধ বিক্রেতারা।

এভাবে শহরের আনাচে-কানাচে অনেক ফার্মেসিতেই অবৈধ ও নেশা জাতীয় দ্রব্য বিক্রি করছে। উঠতি বয়সী কিশোররাই এসব নেশা জাতীয় দ্রব্যের বেশির ভাগ ক্রেতা। বেশ কয়েকটি ফার্মেসিতে প্যাথেডিন, ডায়াজিপাম, ক্লোবাজমসহ ড্রাগ নেয়ার জন্য বিক্রয় নিষিদ্ধ দেশি-বিদেশি নানা ওষুধ পাওয়া যায়। তবে একটু বেশি দামে এসব ওষুধ কিনতে হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঝালকাঠির অনেকেই সাত-আট বছর আগে ঢাকা ও বরিশাল ড্রাগ সুপারের কার্যালয় থেকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ড্রাগ লাইসেন্স সংগ্রহ করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহরের একজন ওষুধ ব্যবসায়ী বলেন, বর্তমানে বরিশাল ড্রাগ সুপারের কার্যালয় থেকে এক-দেড় লাখ টাকায় ফার্মাসিস্ট সনদ ছাড়াই ড্রাগ লাইসেন্স সংগ্রহ করা যায়।
 
সচেতন অভিভাবকরা বলেন, একজন ফার্মাসিস্ট ছাড়া কোনো মতেই ওষুধের ব্যবসা চলা উচিত নয়। ড্রাগ সুপার ভুল করেও কোনোদিন ওষুধ ব্যবসার খোঁজ খবর রাখেন না। ফলে যা ঘটা উচিত, তা-ই ঘটছে।

জেলা কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকট মুন্সি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ওষুধ ব্যবসায় আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এটা বরিশাল ড্রাগ সুপার বিভাগ এবং ওষুধ প্রশাসন দেখভাল করবেন। আমাদের সংগঠনে যারা আছে তাদের সবারই কাগজপত্র আছে। যখন সরকার কোন নীতিমালা করে যেটা সাধারণ ওষুধ ব্যবসায়ীদের সমস্যার কারণ হয় তখন আমাদের কাছে আসে উত্তরণের জন্য।

সিভিল সার্জন ডা. আব্দুর রহিম বলেন, মূলত ওষুধ নিয়ন্ত্রণ আইনের বাস্তবায়নে সরকারের ওষুধ প্রশাসন বিভাগ কাজ করে থাকে। একজন ওষুধ পরিদর্শক ওষুধ ব্যবসা দেখাশোনা করার দায়িত্বে রয়েছেন। ঝালকাঠিতে ওষুধ ব্যবসার এমন পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি ওষুধ প্রশাসনকে জানানোর আশ্বাস দেন। এছাড়াও ফার্মেসি মালিকদের নিয়ে সচেতনতামূলক সেমিনার করা জন্য পরবর্তীতে যিনি দায়িত্ব পালন করবেন তাকে পরামর্শ দেয়ার কথাও বলেন।

এসএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।