আদিবার এখন কি হবে!
সাত বছরের ছোট্ট শিশু আদিবা। তিন বছর আগে বাবার নির্মম নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে হারিয়ে যান মা নারগিস আক্তার। কোলের শিশু রেখেই পালিয়ে জীবন রক্ষা করেন। বর্তমানে তিনি জীবিকার তাগিদে ঢাকার কোনো এক গার্মেন্টে আছেন বলে জানা গেছে। এজন্য বাবার প্রতি অনেক ক্ষোভ আদিবার। এরপর তার পৃথিবী আলোকিত করতে আসেন ছোট মা মালেকা আক্তার মালা। ছোট মাকে আপন করে নিতে সময় লাগেনি তার। চার বছর বয়সে মা হারা আদিবাকে মায়ের মমতা দিয়েই গড়ে তুলছিল ছোট মা মালা। তবে তার উপরও নিয়মিত অমানুসিক নির্যাতন করতো স্বামী ভ্যানচালক দুলাল (৩০)।
মায়ের মতো ছোট মায়ের উপরও বাবা আর দাদীর নির্যাতন চলতে থাকে। নিরবে প্রত্যক্ষ করতে থাকে নিরুপায় শিশু আদিবা। অবশেষে ছোট মাকেও হারালো আদিবা। বর্তমানে মালার কোলজুড়ে রয়েছে সাত মাসের পুত্র সন্তান মাসুদ রানা। তবে কোথাও চলে গিয়ে শিশু আদিবার মায়ের মতো জীবন রক্ষা করতে পারেনি শিশু মাসুদ রানার মা। এটাই আদিবার বড় কষ্ট! দুই শিশুই তাদের দুই মাকে হারালো বাবা আর দাদির নির্মম নির্যাতনে।
শুক্রবার দুপুরে গৃহবধূ মালেকা আক্তার মালাকে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধে হত্যা করে স্বামী দুলাল ও শাশুড়ি হাওয়া বেগম। নারী নির্যাতনের নির্মম ঘটনাটি ঘটে পঞ্চগড় সদর উপজেলার গোফাপাড়া গ্রামে। এ ঘটনায় আদিবার বাবা ও দাদিকে আটক করেছে পুলিশ।
তবে শনিবার বিকেল পর্যন্ত থানায় মামলা হয়নি। পঞ্চগড় সদর থানা পুলিশের ওসি (তদন্ত) মহসেনুল হক গনি বলেন, দুইজনকে আটক করা হয়েছে। মামলার প্রস্তুতি চলছে।
শনিবার সকালে সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রথমে আদিবাকে পাওয়া যাচ্ছিল না। তাকে তার ফুপু (বাবা দুলালের বড় বোন) সাজেদা বেগম চকলেট খাওয়ার কথা বলে অজ্ঞাত স্থানে লুকিয়ে রেখেছেন। ছোট্ট আদিবা সকলের সামনে মায়ের উপর বাবা ও দাদির নির্মম নির্যাতনের কথা বলছিল। অন্যদের মতো তার খালা রমিছা বেগমও আদিবার মুখে শুনেছেন নির্যাতনের কথা।
রমিছা বেগম জানালেন, দুলাল আর তার মা সব সময় মালাকে মারপিট করতো। আদিবা তার মাকে মারপিট করতে দেখেছে। তার কথামতো শনিবার দুপর থেকে স্বামী দুলাল ও শাশুড়ি হাওয়া বেগম মিলে মালেকা বেগম মালাকে মারপিট করতে থাকে। এসময় শাশুড়ি মালার মুখ ও গলা টিপে ধরেন এবং স্বামী বাঁশের লাঠি দিয়ে আঘাত করতে থাকেন। এক পর্যায়ে গৃহবধূ মালা শ্বাসরোধের ফলে নিস্তেজ হয়ে পড়েন।
এসময় প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে অচেতন মালার মুখে কিটনাশক ঢেলে দেওয়া হয়। পরে তাকে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতাল এবং পরে রংপুর নেওয়ার পথে সে মারা যায়।
এদিকে প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে পুলিশসহ প্রতিবেশিদের কাছে কিটনাশক পানে মালা আত্মহত্যা করেছে বলে প্রচারণা চালানো হয়। তবে রাতেই ফাঁস হয়ে যায় আসল ঘটনা। নিহত গৃহবধূ মালার মা সুফিয়া বেগম বলেন, তিন দিন আগেও সে মালাকে বেদম মারপিট করেছে। অসুস্থাবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। দুলাল প্রতিদিন তাকে মারপিট করতো। আজকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে এবং গলা টিপে মালাকে হত্যা করেছে দুলাল ও তার মা।
এদিকে হত্যার অভিযোগ নিয়ে শুক্রবার রাত ১১টায় নিহত গৃহবধূ মালার চাচা মো. ইব্রাহিমসহ তার পরিবারের সদস্যরা থানায় যান। এরপর ঘটনা ধামাচাপাদিতে ঘটনাস্থল ও থানায় শুরু হয় দেনদরবার।
এসময় পুলিশ অন্য কাজে ব্যস্ততার কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা না নিয়ে কালক্ষেপণ করতে থাকে। অন্যদিকে স্থানীয় মোড়ল গোছের কয়েকজন মিমাংসার কথা বলে লাশ রাতেই লাশ দাফনের পরামর্শ দেন। বলেন, থানায় থেকে লাভ নেই। সে আত্মহত্যা করেছে। তবে নিহতের স্বজনরা মামলার দাবিতে রাতভর থানাতেই বসে ছিলেন।
নিহতের চাচা মো. ইব্রাহিম বলেন, আমরা সারারাত থানাতেই বসে ছিলাম। কোথায় সাইকেল নিয়ে কি ঝামেলা হয়েছে তা নিয়েই নাকি পুলিশ ব্যস্ত। রাত সাড়ে ৩ টায় এক পুলিশ এসে জানান আপনারা চলে যান, সকালে দেখা যাবে।
অবশেষে শনিবার (আজ) সকালে পুলিশ ঘটনাস্থলে যান। সুরহাল শেষে ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে পাঠানো হয়। সুরতহালে শ্বাসরোধ করে হত্যার আলামতসহ নিহতের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। এছাড়া নাক এবং মুখে রক্ত দেখা যায়। এসময় মারপিটে ব্যবহৃত একটি লাঠি জব্দ করা হয়।
সুরতহালকারী পুলিশ কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার বলেন, লাশের সুরতহালে মুখ এবং কানে রক্ত পাওয়া গেছে। এটা শ্বাসরোধ করে হত্যার আলামত। এছাড়া মারপিটে ব্যবহৃত একটি বাঁশের লাঠি জব্দ করা হয়েছে।
খবর পেয়ে দুপুরে ঘটনাস্থলে ছুটে যান পুলিশ সুপার মো. গিয়াস উদ্দিনসহ অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তারা। তবে উপস্থিত পুলিশ সুপারের সামনেই শিশু আদিবা লাঠি দেখিয়ে দিয়ে বলে বাবা আর দাদি মাকে এই লাঠি দিয়ে মেরেছে, গলা টিপে ধরেছে। কথা বলতেই কেঁদে ফেলেন আদিবা।
প্রতিবেশিরাও নির্মম এই নারী নির্যাতনের উপযুক্ত বিচারের দাবি জানান। এসময় শিশু আদিবাকে সকলের সামনেই যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপার।
পুলিশ সুপার গিয়াস উদ্দিন বলেন, মূল আসামি ও তার মাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তাও নিয়োগ হয়েছে। আইনি প্রক্রিয়ায় দ্রুতসম্ভব প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সফিকুল আলম/এমএএস/আরআইপি