চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাণিজ্যিক জাত বারি বেল-১ উদ্ভাবন


প্রকাশিত: ১২:৫৭ পিএম, ২৭ এপ্রিল ২০১৬

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র চাঁপাইনবাবগঞ্জে দীর্ঘদিন ধরে বেলের উপর গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে নাতুন জাতের বারি বেল-১ উদ্ভাবন করেছে।

সারাবছর ফলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে অপ্রচলিত ফলের উপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করে দীর্ঘ নয় বছর গবেষণা চালিয়ে নতুন জাতের এই বেল উদ্ভাবন করে। অসময়ে বেলের এই জাতটি চাষাবাদ করলে দেশীয় ফলের ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হবে এবং চাষিরা আর্থিকভাবে লাভবানও হবেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শরফ উদ্দিন জানান, তার তত্ত্বাবধানে ২০০৭ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিভিন্নস্থান থেকে ২২টি জার্মপ্লাজম সনাক্তকরণ করা হয় ও পরে রসায়ন সংগ্রহ করে ওই কেন্দ্রে জন্মানো রুটস্টকের উপর কলম করা হয় এবং গবেষণা মাঠে স্থানান্তর করা হয়।

দীর্ঘ নয় বছরের গবেষণায় সেখান থেকেই পাওয়া যায় উৎকৃষ্টমানের জাত বারি বেল-১। গত জানুয়ারি মাসে জাতীয় বীজ বোর্ড হতে বারি বেল-১ হিসেবে জাতটি মুক্তায়ন করা হয়। এটিই বাংলাদেশের প্রথম মুক্তায়িত বেলের জাত।

Bare-Bel

তিনি জানান, অতীতে বীজের গাছ থেকে জন্মানো চারাগাছ হতে ফলন পেতে ৮-১২ বছর পর্যন্ত সময় লাগতো। ফলে মানুষ বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতো না। এই জাতটি কলমের মাধ্যমে জন্মানো যাবে, যার ফলে মাতৃগাছের গুণাগুণ হুবুহু অক্ষুণ্ন থাকবে এবং ফল আসতে সময় লাগবে মাত্র ৫ (পাঁচ) বছর।

ফল মাঝারি আকারের, নিয়মিত ফলদানকারী, প্রতিটি ফলের গড় ওজন ৯০০ গ্রাম, কাঁচা বেলের রং সবুজ। তবে পাকা ফল দেখতে হালকা সবুজ হতে হালকা হলুদ বর্ণের এবং টিএসএস (মিষ্টতা) ৩৫ ভাগ। ফলের খাদ্যোপযোগী অংশ ৭৮ ভাগ। সাত বছর বয়সী প্রতিটি গাছে বছরে গড়ে ফল ধরবে ৩৮টি এবং গড় ফলন ৩৪ কেজি। অর্থাৎ হেক্টর প্রতি ফলন প্রায় ১৪ টনের মতো। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফলনও বাড়বে। এটি বেলের মধ্যম সময়ের জাত। এই জাতটির সংগ্রহের সময় মার্চ মাসের শেষ হতে এপ্রিল মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত। বাংলাদেশের সকল জেলাতেই এই জাতটি চাষাবাদ করা যাবে। ফলে অন্যান্য ফলের মতো চাষিরা বাণিজ্যিকভাবে বেল চাষ করে আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।

বেলের ব্যবহার ও পুষ্টিগুণ :  কাঁচা ও পাকা বেলের রয়েছে বহুবিধ ব্যবহার। পাকা বেলের শাঁস গাছ থেকে পেড়ে সরাসরি খাওয়া যায়। এছাড়াও পাকা বেলের শাঁস সরবত, জ্যাম, জেলি, চাটনি, স্কোয়াস, বেভারেজ ও বিভিন্ন ধরনের আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। পৃথিবীর অন্যান্য দেশ বেলের পাতা ও ডগা সালাদ হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। বেল পুষ্টিগুণে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা বেলের শাঁসে থাকে আর্দ্রতা ৬৬.৮৯ ভাগ, কার্বোহাইড্রেট ৩০.৮৬ ভাগ, প্রোটিন ১.৭৬ ভাগ, ভিটামিন সি ৮.৬৪ মিলিগ্রাম, ভিটমিন এ (বেটাকেরোটিন) ৫২৮৭ মাইক্রোগ্রাম, শর্করা ৩০.৮৬ ভাগ, ফসফরাস ২০.৯৮ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ১২.৪৩ মিলিগ্রাম এবং লৌহ ০.৩২ মিলিগ্রাম। এমনকি বেল গাছের কাণ্ড হতে যে আঠা পাওয়া যায় তা গাম তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া বেলের রয়েছে বহুবিধ ওষুধি গুণ। পাকা বেলের সরবত কোষ্ঠকাঠিন্য দুর করে থাকে। অন্য একটি গবেষণার ফলাফল হতে দেখা গেছে, বেল হতে প্রাপ্ত তৈল ২১ প্রজাতির ব্যাকটেরিযার বিরুদ্ধে রোগ প্রতিরোধী হিসেবে কাজ করে।

Bare-Bel

চাষাবাদ পদ্ধতি : কলমের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করতে হবে। লাইন থেকে লাইন এবং গাছ থেকে গাছের দূরুত্ব ৫ মিটার। জুন-জুলাই মাসে নির্ধারিত গর্তে কলমের চারাটি রোপন করতে হবে। লাগানোর পর অন্যান্য পরিচর্যাসমূহ করতে হবে। রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ তেমন লক্ষ্য করা যায় না। তবে একটি লেপিডোপটেরা পরিবারের পোকা বেলের পাতা খায়। নতুন পাতাবের হলে সাইপারমেথ্রিন, কার্বারিল, ইমিডাক্লোপ্রিড গ্রুপের কিটনাশক নির্দেশিত মাত্রায় মাত্র একবার ব্যবহার করলে পোকাটির আক্রমণ থেকে বেলের পাতাকে রক্ষা করা যাবে।

অসময়ে বেলের এই জাতটি চাষাবাদ করলে দেশীয় ফলের ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হবে এবং চাষিরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।

আব্দুল্লাহ/এমএএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।