গত বছরের তথ্য দিয়ে চলছে বরগুনার তথ্য বাতায়ন
সরকারের ডিজিটাল কার্যক্রমের অন্যতম একটি হলো জেলা তথ্য বাতায়ন। এক নজরে যেখানে মিলবে জেলার সকল তথ্য। এই তথ্য বাতায়ন থেকে বিভিন্ন তথ্য সুবিধা ভোগ করেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় তেমন কোনো তথ্যই সংযোজন করা হয় নি বরগুনা জেলা তথ্য বাতায়নে। আর যেটুকু তথ্য আছে এই বাতায়নে, তাতেও রয়েছে অসংখ্য ত্রুটি।
এছাড়াও নিয়মিত হালনাগাদ না করায় এই তথ্য বাতায়ন থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সাধারণ মানুষ পড়ছেন বিপাকে। এমন অবস্থার জন্য সংশ্লিষ্টদের উদাসহীনতাকে দায়ী করেছেন সুশিল সমাজ।
বরগুনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মহছেন আলী। কিন্তু জেলা তথ্য বাতায়ন ভিজিট করে পাওয়া গেছে জেলার সাবেক মৎস্য কর্মকর্তা বঙ্কিম চন্দ্র বিশ্বাসে নাম। অথচ এই কর্মকর্তা বদলি হয়ে গেছেন গত বছরের আগস্ট মাসে। জেলায় এক সময় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ছিলেন অশোক কুমার হালদার। গত বছরের আগস্ট মাসে বদলি হয়ে গেছেন তিনি। তার স্থলে গত বছরের ১৪ নভেম্বর যোগ দিয়েছেন মো. শাহিনুর আযম খাঁন। কিন্তু জেলা তথ্য বাতায়নের কল্যাণে অশোক কুমার হালদার এখনও রয়ে গেছেন বরগুনাতে।
এক সময়ের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মিহির কুমার দো বদলি হয়েছেন অনেক আগেই। বর্তমানে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন অজিত রুদ্র। কিন্তু জেলা তথ্য বাতায়ন নিয়মিত হালনাগাদ না করার কারণে বর্তমান বিভাগীয় বন কর্মকর্তা অজিত রুদ্র এর নাম স্থান পায়নি জেলা তথ্য বাতায়নে। তথ্য বাতায়ন নিয়মিত হালনাগাদ না করার কারণে জেলায় কর্মরত এরকম অনেক কর্মকর্তার নাম স্থান পায়নি জেলা তথ্য বাতায়নে। এর ফলশ্রুতিতে জেলার সাবেক অনেক কর্মকর্তার নাম রয়েছে জেলা তথ্য বাতায়নে।
এছাড়াও জেলায় চারটি পৌরসভার মধ্যে তিনাট পৌরসভায় গত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনের পর তিন মাস পেড়িয়ে গেলেও জেলা তথ্য বাতায়নে এখনো ওই তিনটি পৌরসভার মেয়র, কাউন্সিলর এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরদের নাম এবং মোবাইল নম্বর হালনাগাদ করা হয়নি।
আর হিসাবরক্ষণ অফিসারের কার্যালয়, মাকদদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, জেলা কারাগার ও হাসপাতালের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিভাগের কোনো তথ্যই স্থায় পায়নি জেলা তথ্য বাতায়নে।
সরকারের বিভিন্ন সেবা তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে জনগণের কাছে সহজে পৌঁছে দিতে ২০১৪ সালের জুন মাসে চালু হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন। জনগণের দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে সরকারি প্রচেষ্টার ২৫ হাজার ওয়েবসাইটের সমন্বয়ে তৈরি করা এই ওয়েব পোর্টালটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল ওয়েব পোর্টাল। আর এই পোর্টালেরই অংশ হচ্ছে বরগুনা জেলা তথ্য বাতায়ন।
এই তথ্য বাতায়নের মাধ্যমে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইন, পর্যটন ইত্যাদি তথ্য পাওয়ার জন্য মানুষ জেলা তথ্য বাতায়নকে ওয়ান স্টপ সার্ভিস হিসেবে ব্যবহার করবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞপ্তি, গেজেট, ই-সেবা, সরকারি ফর্মসমূহ, সিটিজেন চার্টার, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের তালিকা, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা, সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, জনপ্রতিনিধিদের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর ইত্যাদি সব তথ্যই পাওয়া যাবে এই বাতায়নে।
কিন্তু সময় মতো হালনাগাদ না করা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংযোজন না করায় আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বরগুনার নাগরিকরা।
জেলা প্রশাসন বিভাগের কর্মকর্তাদের তথ্য হালনাগাদ থাকলেও আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা, খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক, প্রকৌশল, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা ও সংস্কৃতি এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক সরকারি অফিস সমূহের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাম ও তাদের মোবাইল নম্বর হালনাগাদ করা হয়না বরগুনা জেলা তথ্য বাতায়নে।
খোদ জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিতব্য গুরুত্বপূর্ণ সভাসমূহের সময়সূচিই হালনাগাদ করা হয় না। তথ্য বাতায়নে মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা নামে একটি বিভাগ থাকলেও এতে মুক্তিযোদ্ধাদের নামের তালিকা দেয়া হয়নি। জেলায় কর্মরত সাংবাদিকদের নাম ও তাদের মোবাইল নম্বরও সংযোজন করা হয়নি জেলা তথ্য বাতায়নে।
জেলায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামও সংযোজন করা হয়নি এই বাতায়নে। এবং অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী সংখ্যা নেই জেলা তথ্য বাতায়নে।
জেলা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক মনোরঞ্জন সরকার গত বছরের জুন মাসে বদলি হয়েছেন জয়পুরহাটে। কিন্তু বাতায়নে এখনও রয়ে গেছে তার নাম ও মোবাইল নম্বর।
এমন নানা অসঙ্গতি বরগুনা জেলা তথ্য বাতায়নের প্রতিটি বিভাগেই রয়েছে। এই তথ্য বাতায়ন থেকে সঠিক তথ্য না পাওয়ায় বিভ্রান্তিতে পড়তে হয় সেবা গ্রহীতাদের। ফলে সম্ভব হচ্ছে না সরকারের কাঙ্খিত উদ্দেশ্য।
এ বিষয়ে কমিউনিটি রেডিও লোক বেতার এফএম ৯৯.২ বরগুনা এর স্টেশন ম্যানেজার মো. মনির হোসেন কামাল জাগো নিউজকে বলেন, অনেক সময় তথ্য বাতায়নের নম্বর দেখে কর্মকর্তাদের কল করলে তারা বলেন, আমি তো ভাই বদলি হয়ে এসেছি। আপনি অফিসে যোগাযোগ করেন। এভাবে প্রায়ই বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। আমার মতো অনেকেই এমন বিড়ম্বনার মুখোমুখি হয়েছেন। জেলা তথ্য বাতায়নে সরকারি বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য থাকা বাঞ্ছনীয়। সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা একটু মনোযোগী হলে এই তথ্য বাতায়ন নিয়মতি হালনাগাদ করা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বরগুনার সিনিয়র সাংবাদিক সোহেল হাফিজ জাগো নিউজকে বলেন, গুরুত্বপূর্ণ ও নাগরিক সেবার জন্য অনন্য হতে পারতো যে পোর্টালটি, সেটি এখন অযত্ন আর অবহেলার কারণে কোনো উপকারেই আসছেনা সাধারণ মানুষের। শুধু তথ্যের সঠিকতাই নয়, তথ্যের মান ও তথ্যবিন্যাস নিয়েও হয়তো ভাবেননি এই ওয়েবসাইট নির্মাণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা।
এ ব্যাপারে বরগুনার জেলা প্রশাসক ড. মহাঃ বশিরুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, এখন থেকে নিয়মিত তথ্য বাতায়নের সব তথ্য হালনাগাদ করা হবে। এরপর আর কোনো ভুল বা অসঙ্গতি থাকবে না বলেও জানান তিনি।
এমএএস/এবিএস