সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহার

ট্যারিফ কমিশন একপক্ষীয় সুপারিশ করেছে, দাবি রপ্তানিকারকদের

বিশেষ সংবাদদাতা
বিশেষ সংবাদদাতা বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৫:১৫ পিএম, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬
সংবাদ সম্মেলনে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকরা

তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা বন্ধে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন একপক্ষীয় সুপারিশ করেছে, যেখানে নিট পোশাক প্রস্তুতকারীদের প্রায়োজনীয়তা অস্বীকার করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন রপ্তানিকারকরা।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারী ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান এ দাবি করেন।

সেলিম রহমান বলেন, ট্যারিফ কমিশন স্পিনারদের সঙ্গে একটি বৈঠক করেছে, অথচ সে বিষয়ে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। পরে আমরা তাদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা বললেও তার আগেই ১০ ও ৩০ কাউন্ট সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ জমা দেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘১৩ জানুয়ারি সরকারের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকের কার্যবিবরণী আমরা পেয়েছি। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১২ তারিখ এনবিআরকে চিঠি দিয়ে ১০ ও ৩০ কাউন্ট সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা বন্ধের নির্দেশ দেয়।’

বিজিএমইএ’র ভারপ্রাপ্ত সভাপতির অভিযোগ, এ বিষয়ে সরকার ও ট্যারিফ কমিশন—কোনো পক্ষই আমাদের দাবিকে গুরুত্ব দেয়নি। আমাদের মতে, ট্যারিফ কমিশন পক্ষপাতদুষ্টভাবে স্পিনারদের স্বার্থ রক্ষায় এই সুপারিশ করেছে, যেখানে নিটওয়্যার খাতের স্বার্থ সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত হয়েছে।’

আরও পড়ুন
বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহারের আদেশ বাতিলের দাবি
‘দেশের পোশাক খাত এক বছর ধরে আইসিইউতে’
বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের আদেশ বাতিলের আহ্বান

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘সরকার ও ট্যারিফ কমিশন যা করেছে তা সম্পূর্ণভাবে স্পিনারদের পক্ষপাতমূলক। ফলে নিটওয়্যার উৎপাদনকারীরা মারাত্মক সংকটে পড়বে।’

তিনি আরও বলেন, ‘একচোখা দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নেওয়া ট্যারিফ কমিশনের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।’

বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, এই একতরফা পদক্ষেপ সরাসরি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘সেফগার্ড চুক্তি’র ৩ ও ৪ নম্বর অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। আন্তর্জাতিক নীতিমালা অনুযায়ী, আমদানির ওপর এ জাতীয় কোনো রক্ষণশীল শুল্ক আরোপের আগে অবশ্যই একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্থানীয় শিল্পে মারাত্মক ক্ষতির বিষয়টি অকাট্য প্রমাণ করতে হয়। কিন্তু এখানে এটা করা হযনি। এভাবে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা কেবল অনভিপ্রেতই নয়, বরং নীতিগতভাবেও চরম প্রশ্নবিদ্ধ।’

‘আমরা মনে করি, সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তটি শিল্প, তথা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য ‘মারাত্মক বিপর্যয়কর’। একটি বিশেষ খাতের পদ্ধতিগত অদক্ষতাকে আড়াল করতে গিয়ে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলোতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার সুতা অবিক্রীত পড়ে থাকার যে খতিয়ান দেওয়া হচ্ছে, তার কারণ অনুসন্ধানে খুব বেশি গভীরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং উত্তরটা বাজার অর্থনীতির অতি সাধারণ নিয়মেই নিহিত। আন্তর্জাতিক বাজারে যেখানে ‘৩০ কার্ডেড’ এক কেজি সুতার দর আড়াই থেকে ২ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার, সেখানে আমাদের দেশীয় মিলগুলো একই সুতা সরবরাহ করতে চাচ্ছে ৩ ডলারে। অর্থাৎ, প্রতি কেজিতে ব্যবধান প্রায় ৪০ সেন্ট বা ৪৬ টাকারও বেশি।

‘স্থানীয় স্পিনারদের জন্য এই সুরক্ষার প্রয়োজন। কিন্তু রূঢ় সত্য হলো, এই কৃত্রিম সুরক্ষার আড়ালে একচেটিয়া বাজার তৈরির সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের স্থানীয় মিলগুলো সব ধরনের কাউন্ট ও প্রিমিয়াম কোয়ালিটির সুতা, যেমন পিমা (Pima), সুপিমা (Supima), কিংবা সুভিন (Suvin), যা উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, তা পর্যাপ্ত পরিমাণে এবং সময়মতো সরবরাহ করতে সক্ষম নয়।’ বলেন সেলিম।

রপ্তানিকারকরা আরও বলেন, নিঃসন্দেহে সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপ রপ্তানির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ইতোমধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৬৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং শুধু ডিসেম্বর মাসে তা ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ কমেছে। এর ওপর উচ্চ দামে সুতা কিনতে হলে ক্রেতারা ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেবেন, যা প্রচ্ছন্ন রপ্তানিকারকদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

তারা সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে বলেন, সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করা হোক। বস্ত্রখাতকে সুরক্ষা দিতে হলে আমদানিতে শুল্ক না বসিয়ে তাদের সরাসরি নগদ সহায়তা বা বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা, জ্বালানির মূল্য যৌক্তিককরণ, রপ্তানিমুখী সুতা উৎপাদনকারীদের করপোরেট ট্যাক্সে রেয়াত এবং স্বল্প সুদে ঋণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদন খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

আইএইচও/এএসএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।