কমার্স ব্যাংকে ‘অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক’, নিরাপত্তাহীনতায় জিডি

ইয়াসির আরাফাত রিপন
ইয়াসির আরাফাত রিপন ইয়াসির আরাফাত রিপন
প্রকাশিত: ০৬:২৭ পিএম, ২১ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের (বিসিবি) লোগো/ফাইল ছবি

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের (বিসিবি) ৫১ শতাংশ শেয়ারের মালিক সরকার। কিন্তু ব্যাংকটিতে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কার্যত ‘অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক’ হিসেবে কাজ করছে—এমন অভিযোগ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে পাওয়া গেছে। ব্যাংকের এক গাড়ি চালককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই চক্রের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, ভয়ভীতি, কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা উপেক্ষা করার অভিযোগ তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। 

অভিযোগের তীব্রতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিরাপত্তাহীনতায় ব্যাংকের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে বাধ্য হয়েছেন। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ব্যাংকের শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও আর্থিক স্বচ্ছতা সংকটে পড়বে—এমন আশঙ্কা কর্মকর্তাদের। বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ভেতরে সিন্ডিকেটের দাপট এবং ক্ষমতার অব্যবস্থাপনা শুধু ব্যাংকের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে না, একই সঙ্গে সরকারি তহবিল ও সাধারণ মানুষের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে জানান তারা।

চাকরি-পদোন্নতি বাণিজ্য সংকটকে পুঁজি করে সিন্ডিকেটের উত্থান

ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, গত বছরের আগস্টের পর ব্যাংকটি সংকটকাল অতিক্রমের পথে ছিল। সেই সময় থেকেই একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। চাকরি বাণিজ্য, পদোন্নতি বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য এবং বেতন-ভাতা বাড়ানোর নামে প্রভাব খাটানো ও আর্থিক লেনদেন শুরু হয়—এমন অভিযোগ উঠেছে।

ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা সূত্রে জানা যায়, এই চক্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ড্রাইভার আইয়ুব। তার সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন—এইচআর প্রধান রেজাউল, ট্রেজারার রফিক, সুইফট বিভাগের হান্নান, প্রদান শাখার জাহানারা, অডিট বিভাগের তাপস, ক্রেডিট বিভাগের আরিফ, মঈন, সঞ্জয় ও তানিয়া।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তি উপেক্ষা করে পদোন্নতি
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাডভাইজরি ও অডিট বিভাগের লিখিত আপত্তি থাকা সত্ত্বেও চাপ প্রয়োগ করে ৩১৮ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।

ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করে বলেন, বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে ঘেরাও করে এসব সিদ্ধান্ত আদায় করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে অনেকেই শিক্ষাগত ও পেশাগতভাবে অযোগ্য। কেউ শুধু ইন্টারমিডিয়েট পাস, আবার কেউ আগে শাস্তিপ্রাপ্তও ছিলেন।

আর্থিক সংকটের মধ্যেও কোটি টাকার বেতন-এগ্রিমেন্ট প্রফিট
ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা দুর্বল থাকা সত্ত্বেও গত ডিসেম্বর মাসে বেতন ও এগ্রিমেন্ট প্রফিট বাবদ প্রায় ৬ কোটি টাকা অতিরিক্ত পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে অভিযোগ আছে, এসব অর্থ ছাড়ের পেছনে ঘুষ ও সুবিধা লেনদেন রয়েছে।

ভয়ভীতি ও অবরুদ্ধতা: অফিস কার্যক্রম ব্যাহত
অভিযোগ অনুযায়ী, সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া, গালাগালি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। হেড অফিসে বহিরাগতদের নিয়ে প্রবেশ, গণ্ডগোল ও অবরুদ্ধ করার ঘটনা ঘটেছে।

এ পরিস্থিতির কারণে নিরাপত্তাহীনতায় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ব্যাংকের পক্ষে গতকাল মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে বাধ্য হয়েছেন। জিডির কপি জাগো নিউজের হাতে এসেছে।

জিডির ভাষ্য অনুযায়ী, বদলি আদেশ জারির পর দিন ১৯ জানুয়ারি বিকেল আনুমানিক ৪টার দিকে বদলি আদেশপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে জড়ো হন। এ সময় তারা উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল আলম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের নাম ধরে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান করেন।

অভিযোগে আরও বলা হয়, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক উপস্থিত না থাকায় ওই কর্মকর্তারা চাপ সৃষ্টি করে জোরপূর্বক বদলি আদেশ বাতিল করাতে বাধ্য করেন। এতে ব্যাংকের স্বাভাবিক অফিসিয়াল কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপনা, নিরীহ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

‘বিসিবি কর্মচারী ইউনিয়ন’ নামের সংগঠন, অবৈধ জায়গা দখল

অভিযোগ রয়েছে, ড্রাইভার আইয়ুব ও তার সহযোগীরা ‘বিসিবি কর্মচারী ইউনিয়ন’ নামের একটি সংগঠন গড়ে ব্যাংকের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ছাড়া ব্যাংকের তরঙ্গ কমপ্লেক্সে অবৈধভাবে জায়গা দখল করে আর্থিক লেনদেনভিত্তিক ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে।

শাস্তির নথি গোপন রাখার অভিযোগ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক কিছু ইজেড (EZ) প্রতিষ্ঠানে অর্থ প্রদানের ঘটনায় শাস্তির সুপারিশ থাকলেও নথি গোপন রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে অভিযুক্তদের একজন ব্যাংকের গাড়ি চালক আইয়ুবের সঙ্গে কথা হলে তিনি এসব জানেন না বলে জানান। তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে তেমন কিছু জানি না, আমি গেছি এতোটুকু। সেখানে আমার মাথা ঘামানোর কিছু নেই। এটা বড় ম্যানেজমেন্টের বিষয়। আমি এ বিষয়ে তেমন কিছু জানি না।

কমার্স ব্যাংকের ইসি কমিটির চেয়ারম্যান মো. মহসিন মিয়া বলেন, বদলির আদেশ কোনো অনিয়ম নয়। এটি যেকোনো ব্যাংক বা শাখাবিশিষ্ট প্রতিষ্ঠানের একটি স্বাভাবিক ও নিয়মিত প্রক্রিয়া। সব ব্যাংকেই স্বার্থ রক্ষায় এ ধরনের বদলি হয়ে থাকে। গত ১৮ তারিখে ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) ও ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) যৌথভাবে মোট ১০ জন কর্মকর্তাকে বদলি করেন। এই বদলিগুলোর মধ্যে হেড অফিস থেকে শাখায় এবং শাখা থেকে হেড অফিসে—এভাবে পাঁচটি ট্রান্সফার অন্তর্ভুক্ত ছিল।

তবে বদলির আদেশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। ওই সময় এমডি অফিসে উপস্থিত ছিলেন না। পরে তারা ডিএমডিকে অবরুদ্ধ করে চাপ প্রয়োগ করেন এবং হুমকির মুখে ডিএমডির কাছ থেকে বদলির আদেশ ‘ক্যান্সেল’ বা প্রত্যাহার সংক্রান্ত একটি কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নেন।

মো. মহসিন মিয়া বলেন, মূল বিষয় হলো—বদলির আদেশটি এমডি ও ডিএমডি দু’জনের যৌথ স্বাক্ষরে জারি হয়েছিল, অথচ সেই আদেশ প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে কেবল একজনের স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে, তাও চাপ ও হুমকির মাধ্যমে। বিষয়টি সম্পূর্ণ বেআইনি। ডিএমডি ইতিমধ্যে মতিঝিল থানায় একটি জিডি করেছেন এবং বিষয়টি নিয়ে আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ডিএমডির নাম জহিরুল আলম। তার জিডির কপিও সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছেছে।

চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের বেশি একজন কর্মকর্তাকে একই জায়গায় রাখা যায় না। ব্যাংকের স্বার্থেই এসব নিয়ম মানা হয়। এখানে কোনো অবৈধ কাজ করা হয়নি।

ইএআর/এমএমকে 

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।