এক ভরি সোনার অলংকার ৩ লাখ ১৭ হাজার টাকা, কিনছে কারা?
ঢাকার ব্যস্ত স্বর্ণালংকারপট্টিতে এখন আর আগের মতো ভিড় নেই। যারা যাচ্ছেন গহনার কাছাকাছি ভিড়ছেন কম। কাচের শোকেসে সাজানো ঝকঝকে তকতকে হার, চুড়ি, আংটি দেখছেন অনেকে। শেষ পর্যন্ত কিনে বের হচ্ছেন হাতে গোনা দু-একজন। এক ভরি ওজনের কোনো সোনার অলংকারের দাম এখন সাধারণ মানুষের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে বলা চলে।
বর্তমানে ৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৬ শতাংশ মজুরি যোগ করে এক ভরি সোনার অলংকার কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ৩ লাখ ১৭ হাজার ৪৬১ টাকা। কোনো কোনো ব্যবসায়ী মজুরিতে ছাড় দিলেও ৩ লাখ টাকার নিচে এক ভরি সোনার অলংকার কেনা যাচ্ছে না। এত বেশি দামে সোনা কিনতে মানুষ একেবারে বাধ্য না হলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখন যারা সোনার অলংকার কিনছেন, তারা মূলত প্রয়োজনের তাগিদেই আসছেন। বিয়ে, সন্তানের মুখ দেখা কিংবা পারিবারিক বিশেষ অনুষ্ঠানের মতো সামাজিক বাধ্যবাধকতায় সীমিত পরিসরে অলংকার কেনা হচ্ছে। আগে যেখানে একটি বিয়েতে কয়েক ভরি সোনার অলংকার কেনা হতো, এখন সেখানে আধা ভরি কিংবা এক ভরিতেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।

একজন অলংকার ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, ‘আগে প্রতিদিনই ভালো বিক্রি হতো। এখন অনেক সময় পুরো দিন দোকান খোলা রাখলেও একটি অলংকার বিক্রি হয় না। মানুষ দাম শুনেই পিছিয়ে যাচ্ছে।’
‘বিক্রি কমেছে ৮০ শতাংশ’
করোনা মহামারির আগের সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে বর্তমানে সোনার অলংকারের বিক্রি প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। করোনার ধাক্কা কাটিয়ে বাজার কিছুটা ঘুরে দাঁড়াবে-এমন আশায় থাকলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম বৃদ্ধি, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভ্যাট ও মজুরি যোগ হয়ে দাম আরও চড়া হয়েছে।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভূমিকার কারণে ডলারের দরপতন হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বড় বিনিয়োগকারীরা এখন সোনা কিনে রাখছেন। তাছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশ রিজার্ভ হিসেবে ডলার না রেখে সোনা কিনে রাখছেন। সবকিছুর প্রভাব মিলেই সোনার এমন দাম বেড়ে গেছে।-বাজুসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বাদল চন্দ্র রায়
এই মন্দার প্রভাব পড়েছে সোনা শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের জীবনেও। কাজ না থাকায় অনেক কারিগর বসে সময় কাটাচ্ছেন। কাজের অভাবে অনেক কারিগর অন্য পেশায় চলে যেতেও বাধ্য হচ্ছেন।
বর্তমানে দেশে সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম নির্ধারিত রয়েছে ২ লাখ ৮৬ হাজার ১ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৭২ হাজার ৯৯৬ টাকা, ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৩৩ হাজার ৯৮০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির এক ভরি সোনার দাম ১ লাখ ৯৩ হাজার ৩৯ টাকা নির্ধারিত রয়েছে।

সোনার এই দামের সঙ্গে ৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৬ শতাংশ মজুরি যোগ করে সোনার অলংকার বিক্রির নিয়ম করেছে দেশে সোনার দাম নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। এতে এক ভরি সোনার অলংকারে ১৪ হাজার ৩শ টাকা ভ্যাট এবং ১৭ হাজার ১৬০ টাকা মজুরি দিতে হচ্ছে ক্রেতাদের। ফলে এক ভরি সোনার অলংকারের দাম পড়ছে ৩ লাখ ১৭ হাজার ৪৬১ টাকা।
অবশ্য দাম বেশি হওয়ার কারণে কোনো কোনো ব্যবসায়ী ক্রেতাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মজুরি বাদ দিয়ে অলংকার বিক্রি করছেন। এরপরও এক ভরি সোনার অলংকার কিনতে ক্রেতাদের ৩ লাখ টাকা গুনতে হচ্ছে।
দাম বাড়ার কারণে সোনার অলংকার বিক্রি এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। করোনার আগের সঙ্গে তুলনা করলে এখন বিক্রি ৮০ শতাংশ নেই হয়ে গেছে। মানুষ একেবারে বাধ্য না হলে এখন সোনার অলংকার কিনছে না। বিশেষ করে বিয়ে উপলক্ষে এখন সামান্য কিছু বিক্রি হচ্ছে।-বাজুসের সাবেক সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়া
বায়তুল মোকাররম জুয়েলারি মার্কেটের একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মী মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘কয়েক বছর ধরেই সোনার অলংকার ব্যবসায় মন্দা চলছে। এখন তো প্রতিদিন দাম বাড়ছে। দফায় দফায় দাম বেড়ে এক ভরি সোনার অলংকারের দাম ৩ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এত দাম দিয়ে মানুষ এখন আর সোনা কিনছে না। আমরা দোকান খুলছি, কিন্তু বিক্রি নেই। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অলস সময় পার করছি।’
তিনি বলেন, দোকানে যারা আসছেন ঘুরে দাম শুনে বেশিরভাগ চলে যাচ্ছেন। দু-একজন অলংকার কিনলেও মজুরি ও ভ্যাটের টাকা দিতে চাচ্ছে না। ক্রেতাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা মাঝে মধ্যে মজুরি বাদ দিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু ভ্যাট তো বাদ দেওয়ার উপায় নেই। মজুরি বাদ দেওয়ার পরও এখন এক ভরি সোনার অলংকার কিনতে ৩ লাখ টাকা লাগছে। এত দামে আমাদের দেশে অলংকার কেনার মানুষ আসলেই খুব কম।
যোগাযোগ করা হলে বাজুসের সাবেক সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘দাম বাড়ার কারণে সোনার অলংকার বিক্রি এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়। করোনার আগের সঙ্গে তুলনা করলে এখন বিক্রি ৮০ শতাংশ নেই হয়ে গেছে। মানুষ একেবারে বাধ্য না হলে এখন সোনার অলংকার কিনছে না। বিশেষ করে বিয়ে উপলক্ষে এখন সামান্য কিছু বিক্রি হচ্ছে। আগে মানুষ শখের বশে সোনার অলংকার কিনতো, এখন সেটা বন্ধ হয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত দাম হওয়ার কারণে জুয়েলারি ব্যবসায় এখন চরম মন্দা বিরাজ করছে। ব্যবসায়ীরা দোকান খুলে বসে থাকছেন কিন্তু ক্রেতা আসছে না। দু-একজন এলেও তারা মজুরির টাকা দিতে চাচ্ছে না। ব্যবসার কথা চিন্তা করে আমরাও অনেক সময় মজুরির টাকা নিচ্ছি না। কিন্তু ভ্যাট তো ক্রেতাদের দিতেই হচ্ছে। কারণ ভ্যাটের টাকা ছাড়ার উপায় নেই। ব্যবসায়ীরা ভ্যাট সংগ্রহ করে সরকারের কোষাগারে জমা দেয়।’
বাজুসের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান জড়োয়া হাউজ (প্রা.) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বাদল চন্দ্র রায় জাগো নিউজকে বলেন, ‘সোনার অলংকার বিক্রি এখন নেই বললেই চলে। বিয়ে, সন্তানের মুখ দেখা এমন অতিপ্রয়োজনীয় কাজে ছাড়া মানুষ এখন সোনার অলংকার কিনছে না। শখের সোনা এখন আর নেই।’
তিনি বলেন, ‘বিক্রি না থাকায় জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা এখন খুব খারাপ সময় পার করছেন। করোনা মহামারির পর থেকেই ব্যবসায় মন্দা চলছে। এখন অস্বাভাবিক দাম হওয়ার কারণে বিক্রি প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এতে অনেকের পক্ষে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কাজ না থাকায় অনেক কারিগর পেশা ছেড়ে দিয়েছেন।’
সোনার অস্বাভাবিক দাম বাড়ার কারণ কী? এমন প্রশ্ন করা হলে এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভূমিকার কারণে ডলারের দরপতন হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বড় বিনিয়োগকারীরা এখন সোনা কিনে রাখছেন। তাছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশ রিজার্ভ হিসেবে ডলার না রেখে সোনা কিনে রাখছেন। সবকিছুর প্রভাব মিলেই সোনার এমন দাম বেড়ে গেছে।’
দেশে সোনার দামের যত রেকর্ড
বাজুসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে ভালো মানের এক ভরি সোনার দাম ছিল ৬ হাজার ৯০০ টাকা। এরপর কয়েক দফা বেড়ে ২০১০ সালে ৪২ হাজার ১৬৫ টাকায় ওঠে। এক ভরি সোনার দাম প্রথম ৫০ হাজার টাকা হয় ২০১৮ সালে। আর ২০২৩ সালের জুলাই মাসে সোনার ভরি প্রথম এক লাখ টাকা হয়।
এরপর কয়েক দফায় উত্থান-পতন দিয়ে ২০২৫ ফেব্রুয়ারিতে এক ভরি সোনার দাম প্রথমবার ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা হয়। এর আট মাস পর অক্টোবরে এক ভরি সোনার দাম ২ লাখ টাকার মাইলফলক স্পর্শ করে। আর চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সোনার ভরি ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা হয়ে যায়। বর্তমানে ভালো মানের এক ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা।
এমএএস/এএসএ