ঋণ পেতে বেগ, শুরুতেই ঝরে যান অনেক নারী উদ্যোক্তা

ইয়াসির আরাফাত রিপন
ইয়াসির আরাফাত রিপন ইয়াসির আরাফাত রিপন
প্রকাশিত: ০৮:৪৬ পিএম, ০৮ মার্চ ২০২৬
একটু আনুকূল্য পেলে নারীরাও দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারেন। গড়তে পারেন সুন্দর জীবন/ফাইল ছবি
  • নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রযাত্রায় বড় বাধা ব্যাংকঋণ
  • সম্ভাবনা থাকলেও ঝরে পড়ছেন অনেকে
  • অনেকে নিজ পুঁজির সঙ্গে ব্যাংকঋণে দেখছেন সফলতা

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ঘিরে যখন সাফল্যের গল্প সামনে আসে, তখনই উন্মোচিত হয় আরেক বাস্তবতা। সেটি হলো- ব্যাংকিংসহায়তা পেতে গিয়ে বহু নারী উদ্যোক্তার কঠিন বাধার মুখে পড়া। নীতিগতভাবে নানান প্রণোদনা ও স্বল্পসুদে ঋণের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে তার সুফল পাচ্ছেন না অনেকেই। ফলে সম্ভাবনাময় উদ্যোগ শুরুতেই থেমে যাচ্ছে।

তবে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা নির্দেশনা ও সহায়তা কাঠামো রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সংস্থাটির মতে, নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তায় প্রতিটি ব্যাংক শাখায় একজন করে ডেডিকেটেড কর্মকর্তা রাখার পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক সার্কুলারও জারি রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু করেছে, যেখানে সুদের হার ৫ শতাংশ থেকে শুরু। অথচ সাধারণ বাণিজ্যিক ঋণের হার প্রায় ৯ শতাংশ। করোনা মহামারির সময় ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিলে সুদের হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ।

jagonews24

তবে বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। জাতীয় শিল্পনীতি-২০১৬ অনুযায়ী, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে মোট ঋণের অন্তত ১৫ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এ হার গড়ে মাত্র ৬ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

ব্যাংক বলছে- ঋণ বিনা শর্তে, কিন্তু শাখায় গেলে নানান শর্ত আর কাগজপত্রের বেড়াজালের কারণে ঋণ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি প্রকৃত অর্থেই ‘বিনা শর্ত’ নীতিটি বাস্তবায়ন করে, তাহলে ছোট উদ্যোক্তারা আরও শক্তভাবে দাঁড়াতে পারবে।—ড চিং চিং

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৩ অর্থবছর পর্যন্ত এসএমই খাতে মোট ৬ লাখ ৩৫ হাজার ২৩০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ উদ্যোক্তারা পেয়েছেন ৯৪ থেকে ৯৬ শতাংশ, নারী উদ্যোক্তাদের প্রাপ্তি ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে। ২০২০-২১ অর্থবছরে মোট ১ লাখ ৮৫ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে নারী উদ্যোক্তারা পেয়েছেন মাত্র ৪ শতাংশ বা ৬ হাজার ৮০২ কোটি টাকা।

আরও পড়ুন
নারী উদ্যোক্তা হওয়ার অনুকূল পরিবেশ অনুপস্থিত
স্বল্প সুদে ও সহজে ঋণ পেতে সরকারের সহযোগিতা চান নারী উদ্যোক্তারা
ব্যাংক ঋণ পেতে নারী উদ্যোক্তারা এখনো অবহেলিত

পরবর্তী দুই বছরে এ অঙ্ক কিছুটা বাড়লেও ২০২১-২২ অর্থবছরে তা দাঁড়ায় ১০ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১০ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের মাত্র ৬ শতাংশের কাছাকাছি।

মাঠের অভিজ্ঞতা ও শর্তের বেড়াজালে স্বপ্ন
ফিনারী মানে সূক্ষ্ম কারুকার্য। ফিনারীর উদ্যোক্তা ড চিং চিং বুটিক্স ও শৌখিন পণ্য তৈরি করেন। তার ব্যবসা শুরুতে বেশ ভালো সাড়া পেয়েছিল। তবে বৈশ্বিক মহামারি করোনার পর ব্যবসায় বড় ধাক্কা লাগে।

ড চিং চিং বলেন, করোনার প্রভাবে ব্যবসা ব্যাহত হয়েছে। এরপর রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিক্রি আরও কমে গেছে। ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছি না। ব্যাংক বলছে- ঋণ বিনা শর্তে, কিন্তু শাখায় গেলে নানান শর্ত আর কাগজপত্রের বেড়াজালের কারণে ঋণ নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি প্রকৃত অর্থেই ‘বিনা শর্ত’ নীতিটি বাস্তবায়ন করে, তাহলে ছোট উদ্যোক্তারা আরও শক্তভাবে দাঁড়াতে পারবে।

jagonews24

হাসিনা বানু রাজধানীর উত্তরার একজন নারী উদ্যোক্তা। তিনি বুটিক্স ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং নিজের দোকানের পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও গড়ে তুলেছেন শক্ত অবস্থান। বিক্রি সন্তোষজনক হলেও পর্যাপ্ত মূলধনের অভাবে ব্যবসার পরিধি সম্প্রসারণ করতে পারছেন না।

নারীর ক্ষমতায়ন শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি। নারী উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা ও বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে বাস্তবমুখী নীতিসহায়তা এবং কার্যকর ব্যাংকিং সহযোগিতা অপরিহার্য—এম হেলাল আহমেদ জনি

এ উদ্যোক্তাও একটি ব্যাংকে সহজ শর্তে ঋণের জন্য আবেদন করেছিলেন। তবে ঋণ প্রক্রিয়ায় গিয়ে কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত শর্ত ও নানান কাগজপত্রের জটিলতার কারণে শেষ পর্যন্ত আর ব্যাংকঋণ পাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে বাধ্য হন তিনি।

একই ধরনের অভিযোগ করেন কলেজছাত্রী লাবনী। রাজধানীর মিরপুরের বাসা থেকে এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তিনি বিদেশি প্রসাধনীর ব্যবসা পরিচালনা করেন। লাগেজভিত্তিক পণ্য এনে বিক্রি করায় ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে নানান জটিলতার মুখে পড়ছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঋণ নিতে গেলে বিভিন্ন কাগজপত্র জমা দিতে হয় এবং নিরাপত্তা (সিকিউরিটি) সংক্রান্ত শর্ত পূরণ করাও বাধ্যতামূলক। এসব জটিলতার মধ্যে বারবার ব্যাংকে যোগাযোগ করে এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ঋণ সুবিধা পাননি লাবনী।

আছে ব্যতিক্রমও 
তবে সব চিত্রই হতাশার নয়। ব্যতিক্রমও আছে। যারা নিজস্ব পুঁজির সঙ্গে ব্যাংকঋণ যুক্ত করে প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন তাদেরই একজন আলফি ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী সুরভী। নিজের উৎপাদন ছাড়াও সাব-কন্ডাক্টে নামিদামি প্রতিষ্ঠানেরও অর্ডার নেন তিনি।

সুরভী মনে করেন, নারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে ব্যাংকগুলোকে আরও সহায়ক ও আন্তরিক ভূমিকা রাখতে হবে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদেরও প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় আগ্রহ। উভয় পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগেই তৈরি হতে পারে আরও সফল নারী উদ্যোক্তার গল্প।

বিশেষজ্ঞদের মত
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ও অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদ জনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়ন শুধু সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি। নারী উদ্যোক্তাদের টিকে থাকা ও বিকাশ নিশ্চিত করতে হলে বাস্তবমুখী নীতিসহায়তা এবং কার্যকর ব্যাংকিং সহযোগিতা অপরিহার্য।’

আরও পড়ুন
নারী উদ্যোক্তা তৈরির ‘উদ্যোক্তা’ ফাহমিদা নিজাম
নারীদের পণ্যে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার সংগ্রামী গল্প

তিনি বলেন, ‘ব্যাংকগুলো যদি ঋণসহায়তার পরিধি সম্প্রসারণ করে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করে, তাহলে দেশে আরও বহু সফল নারী উদ্যোক্তা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’

দেশের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি নারী। তাদের অর্থনীতির মূলধারায় পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি- কোনোটিই বাস্তবসম্মত নয়—আরিফ হোসেন খান

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তায় প্রতিটি ব্যাংক শাখায় একজন করে ডেডিকেটেড কর্মকর্তা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক সার্কুলারও জারি রয়েছে। সম্ভাবনাময় নারী উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাঁচ-ছয়জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর অন্তত একজনকে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’

jagonews24

তিনি বলেন, ‘দেশের মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি নারী। তাদের অর্থনীতির মূলধারায় পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন ও মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি- কোনোটিই বাস্তবসম্মত নয়। এরই মধ্যে বহু নারী উদ্যোক্তা নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ রেখেছেন। এখন প্রয়োজন নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন ও ব্যাংকিং সহযোগিতার বাস্তব নিশ্চয়তা।’

জানতে চাইলে এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও ড. মো. তৌহিদুল আলম খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এনআরবিসি ব্যাংকের মূল ফোকাসের জায়গা হচ্ছে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের উন্নয়ন। এজন্য আমরা কুটির, অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্রখাতে অর্থায়ন করছি। এসব খাতে নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে ঋণ দেওয়া হচ্ছে।’

‘এনআরবিসি ব্যাংকের ঋণসহায়তা নিয়ে ঘরে বসেই হস্তশিল্প, কৃষিভিত্তিক শিল্প, পশুপালন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ইত্যাদি খাতে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠছেন। সিএমএসএমই খাতে প্রায় আড়াই হাজার নারী উদ্যোক্তাকে ৫০০ কোটি টাকা ঋণসহায়তা দেওয়া হয়েছে। আগামীতে নারীদের স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন সহায়ক কর্মসূচি নেবে এনআরবিসি ব্যাংক’—বলেন তিনি। 

ইএআর/এমকেআর/এমএফএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।