ব্যবসায়ীদের মতামত

বাংলাদেশের উৎপাদন খাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তদন্ত অযৌক্তিক ও অসম্মানজনক

এমদাদুল হক তুহিন
এমদাদুল হক তুহিন এমদাদুল হক তুহিন , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:১৩ পিএম, ১২ মার্চ ২০২৬
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা/ফাইল ছবি

উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন করা হচ্ছে কি না—তা খতিয়ে দেখতে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৫টি দেশ ও একটি জোটের নাম এসেছে। বিষয়টি যৌক্তিক নয় বলে মনে করছেন দেশের ব্যবসায়ীরা। এটি অস্বস্তিকর ও অসম্মানজনক বলেও মন্তব্য কারও কারও। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগকে স্বাগতও জানিয়েছেন কোনো কোনো উদ্যোক্তা। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের যে ক্যাটাগরিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যায়, সেগুলো সেখানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় না, ফলে মার্কিন শিল্পভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগকে কেউ কেউ দেখছেন, দেশটির বাণিজ্যিক দরকষাকষির শক্তি বাড়ানোর একটি কৌশল হিসেবেও।

জানতে চাইলে দেশের পোশাক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার নামে একটা বিষয়ে তদন্ত হবে—আপনার বিষয়ে যদি এখন মনে করেন, থানা থেকে একটা বিষয়ে তদন্ত করতে আসবে, সেটা কি আপনার জন্য স্বস্তিদায়ক? সম্মানজনক?’

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত উৎপাদন করার কোনো কোটা ঠিক করে দেইনি। যুক্তরাষ্ট্র যে এত বেশি উৎপাদন করা যাবে না, তাই না? বিষয়টা হচ্ছে যে এমন কিছু উৎপাদন করে এক্সপোর্ট করছি, কি না যেটি তাদের লোকাল ইন্ডাস্ট্রি সাফার করবে। কিন্তু আমরা তো পোশাক বানাই। যুক্তরাষ্ট্রে তো আর পোশাকের ইন্ডাস্ট্রি নেই।’

মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘তাদের (যুক্তরাষ্ট্র) মেইন কনসার্ন হচ্ছে, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি, যেখানে হলো ওই যে কাউন্টারফিট গুডস তৈরি করা হয় কি না, যেটা আমার জানামতে সবচেয়ে বেশি হয় থাইল্যান্ডে। বাংলাদেশে কাউন্টারফিট গুডসের চাহিদাও খুব কম। তো এখানে হয় না। হলেও খুব নেগ্লিজিবল। এটার জন্য তো ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করে। লেবার ইস্যু নিয়ে কথা বলতে পারে, তো সেটা অলরেডি লেবার ল অ্যামেন্ডমেন্ট করা হয়ে গেছে। ইনসেন্টিভ নিয়ে কথা বলতে পারে, এমন কোনো ইনসেন্টিভ দিই কি না, যাতে করে ডাম্পিং প্রাইসে আমরা অফার করি—এরকম কিছু আমরা করি না। সুতরাং তদন্ত হওয়াটা, নাম আসাটা কমফর্টেবল না, স্বস্তিদায়ক না। বাট আমি মনে করি তদন্ত হলে আমাদের এখানে এ ধরনের কোনো কিছু পাবে না।’

আরও পুড়ন
বাংলাদেশসহ ১৬ দেশ-জোটের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের তদন্ত
এ বিষয়ে নীটওয়্যার মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা এটিকে ওয়েলকাম করছি। কারণ বাংলাদেশে এরকম কোনো কিছু হচ্ছে না, যেটি অনৈতিক বা অতিরিক্ত প্রোডাকশন। যেটি তারা বলতে চাচ্ছে, সেটি বাংলাদেশে নেই। বরঞ্চ বাংলাদেশ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে পরিমাণ রপ্তানি হচ্ছে তার চেয়ে বেশি আমাদের রপ্তানি কিন্তু ইইউ জোনে। তাছাড়া আমাদের এখানে যে উৎপাদন হচ্ছে, আমার যে ইন্ডাস্ট্রি সেই অনুযায়ী, বর্তমানে আমি বলবো রপ্তানি কম যাচ্ছে। তারা যে তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে সেটা ওয়েলকাম করবো। আমরা এ ব্যাপারে সব রকমের সহযোগিতা তাদের করবো, করতে প্রস্তুত আছি।’

মন্তব্য জানতে চাইলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আইনের ৩০১ ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশের উৎপাদন সক্ষমতা ও বাণিজ্যিক চর্চা নিয়ে যে তদন্ত শুরু হয়েছে, ডিসিসিআই তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। আমরা মনে করি, এই তদন্ত তালিকায় বাংলাদেশের নাম আসা মোটেও যৌক্তিক নয়। কারণ আমাদের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের যে ক্যাটাগরিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যায়, সেগুলো সেখানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয় না, ফলে মার্কিন শিল্পভিত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো অবকাশ নেই।

তিনি আরও বলেন, তাছাড়া শ্রম অধিকার রক্ষা, মেধাস্বত্ব সংরক্ষণ এবং রপ্তানি প্রণোদনার মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশ গত কয়েক বছরে অভাবনীয় উন্নতি করেছে এবং কোনো অন্যায্য বাণিজ্যিক কৌশল অবলম্বন করছে না। যেহেতু আগামী ১৭ মার্চ থেকে এই প্রক্রিয়ায় মতামত দেওয়ার সুযোগ রয়েছে, তাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের এখনই সমন্বিত ও শক্তিশালী তথ্য-উপাত্ত নিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। ঢাকা চেম্বার বিশ্বাস করে, সঠিক বাণিজ্যিক কূটনীতি এবং প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার মাধ্যমে আমরা প্রমাণ করতে পারবো যে, বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি মার্কিন বাণিজ্যের জন্য কোনো হুমকি নয়, বরং পরিপূরক।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের উৎপাদনব্যবস্থা ও বাণিজ্যচর্চা নিয়ে তদন্তের যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে, তা মূলত তাদের বাণিজ্যিক দরকষাকষির শক্তি বাড়ানোর একটি কৌশল হতে পারে।

জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘এটা তো নতুন কিছু না। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে অন্য একটা সেকশনে এই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগে তারা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত একটা ট্যারিফ বসানোর কথা বলেছিল, যার মেয়াদ ছিল সীমিত—প্রায় পাঁচ মাস। এরপর যদি সেই ব্যবস্থা ধরে রাখতে হয়, তাহলে তাদের আনফেয়ার ট্রেড প্র্যাকটিস দেখিয়ে দেশগুলোর একটি তালিকা করতে হবে।’

অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যখন প্রথম ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়, তখনই বলা হয়েছিল যে, পরবর্তীতে কোন কোন দেশকে অন্যায্য বাণিজ্যচর্চার তালিকায় রাখা হবে, সেটির কাজ শুরু হবে।

তার ভাষায়, ‘এখন তারা মূলত সেই কাজটাই শুরু করছে। আমাদের তো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ট্রেড এগ্রিমেন্ট আছে। সেই চুক্তির বাইরে গিয়ে ট্যারিফ বসানো সহজ না। কিন্তু যদি তারা প্রমাণ করতে পারে যে, কোনো দেশে আনফেয়ার ট্রেড প্র্যাকটিস আছে, তখন তারা অতিরিক্ত শুল্ক ধরে রাখার যুক্তি দাঁড় করাতে পারে।’

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে তাদের দরকষাকষির ক্ষমতা কিছুটা কমেছে। তাই আবার সেই বার্গেনিং পাওয়ার ফিরে পাওয়ার একটা চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।

সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যদি কোনো দেশকে সেই আনফেয়ার ট্রেড প্র্যাকটিসের তালিকায় না রাখা হয়, তাহলে অতিরিক্ত ট্যারিফ রাখার যৌক্তিকতা থাকে না। কারণ এমএফএন ট্যারিফ তো আছেই। তার ওপর আবার আলাদা করে শুল্ক বসানোর কারণ কী?

তদন্ত প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পক্ষ মতামত দেওয়ার সুযোগ পায় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ওই ধরনের প্ল্যাটফর্মে যে কেউ মতামত দিতে পারে। সেখানে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো বা যারা বাংলাদেশের ভালো চায় না, তারা গিয়ে নানা অভিযোগ তুলতে পারে—যেমন শ্রমিকদের বেতন দিতে দেরি হয়, দীর্ঘ সময় কাজ করানো হয়, কারখানার নিরাপত্তা নেই, শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়, নারীদের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধা নেই ইত্যাদি। এগুলো যদি কেউ অজুহাত হিসেবে তুলতে চায়, তাহলে একটা না একটা কারণ বের করতেই পারবে।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের তদন্তে ‘এক্সেস ক্যাপাসিটি’ বা অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার মতো বিষয়ও উত্থাপন করা হতে পারে। জাহিদ হোসেন বলেন, ফেয়ার ট্রেড প্র্যাকটিসের ব্যাখ্যা অনেক সময় খেয়ালখুশি মতো ব্যবহার করা হয়। তাই এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিকভাবে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ও বিষয়গুলো দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রসঙ্গত, উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৬টি দেশের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বুধবার (১১ মার্চ) এ তদন্ত শুরুর ঘোষণা দেন। বুধবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর এ তথ্য জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১ নম্বর ধারা অনুযায়ী এ তদন্ত করা হবে।

তদন্তে যে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে তা হলো—সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নীতি, পদক্ষেপ বা উৎপাদনকাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যের জন্য অযৌক্তিক বা বৈষম্যমূলক কি না এবং সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না।

বাংলাদেশসহ আরও যে ১৫ দেশ ও একটি জোটের বিরুদ্ধে এ তদন্ত করা হবে সেগুলো হলো—চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, মেক্সিকো, জাপান ও ভারত।

ইএইচটি/এমএমকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।