কাতারে হামলা

এলএনজি নিয়ে আপাতত ‘চিন্তা নেই’, ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

ইকবাল হোসেন
ইকবাল হোসেন ইকবাল হোসেন , নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৫:০০ পিএম, ২০ মার্চ ২০২৬
আপাতত চিন্তা না থাকলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে আছে শঙ্কার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল-গ্যাস আমদানি করে বাংলাদেশ। দেশে ব্যবহৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ৭১ শতাংশ আসে দেশীয় উৎস থেকে। আমদানি করা হয় ২৯ শতাংশ। মজুত ও পাইপলাইনে যা আছে তাতে আপাতত চিন্তা না থাকলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে আছে শঙ্কা।

বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহের বড় অংশীদার মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতার। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে সংকট দীর্ঘায়িত হচ্ছে। গত দুদিনে ইরানের প্রধান গ্যাস উৎপাদন কেন্দ্র সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা করেছে ইসরায়েল। সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রটি থেকে ইরানের মোট গ্যাস উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশের জোগান আসে। ইরান অভ্যন্তরীণ চাহিদার ৯০ শতাংশ গ্যাস পায় সাউথ পার্স থেকে।

ইসরায়েলের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে মিসাইল হামলা চালায় ইরান। এতে রাস লাফান গ্যাস উৎপাদনক্ষেত্রেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। রাস লাফান হচ্ছে বিশ্বের বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদন কেন্দ্র। বিশ্ব চাহিদার ২০ শতাংশ গ্যাস সরবরাহ হয় এ গ্যাসক্ষেত্র থেকে।

এখন রাস লাফানে হামলার পর এলএনজি নিয়ে বাংলাদেশের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। কারণ কখন রাস লাফানে উৎপাদন শুরু করা যাবে সেটির কোনো নিশ্চয়তা নেই। এখন সরকারকে বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে।-ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মানজারে খোরশেদ আলম

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এমনিতেই জ্বালানিতে সংকট তৈরি হয়েছে সারা বিশ্বে। তরল জ্বালানি থেকে শুরু করে গ্যাস সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রগুলোতে হামলায় বাংলাদেশকে বেশি দুশ্চিন্তায় ফেলেছে।

বাংলাদেশ যে ২৯ শতাংশ এলএনজি আমদানি করে তার ৬৫-৭০ শতাংশ আমদানি হয় কাতার থেকে। পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, দেশে বর্তমান মজুত, পাইপলাইন ও স্পট মার্কেট থেকে যে গ্যাস কেনা হচ্ছে তাতে আগামী এক মাস এলএনজি নিয়ে বিশেষ কোনো চিন্তা নেই। এর মধ্যে বিকল্প উৎসও খুঁজছে তারা।

জ্বালানি খাতের বৈশ্বিক তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’এর মতে, বাংলাদেশ এলএনজি আমদানির ৭০ শতাংশ পায় কাতার থেকে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় রাস লাফান থেকে বোঝাই করা ৬২ হাজার টন এলএনজিবাহী ট্যাংকার ‘লিব্রেথা’ পারস্য সাগরে আটকা পড়েছে।

এলএনজি সংকট

এদিকে কাতারের রাস লাফান গ্যাসক্ষেত্রে হামলার পর দেশে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে এলএনজি নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানার উৎপাদন নিয়ে তৈরি হয়েছে শঙ্কা। এসব শঙ্কা কাটাতে এবং গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এলএনজি আমদানিতে বিকল্প উৎসের খোঁজ করছে সরকার।

আইইবি চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান ও ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মানজারে খোরশেদ আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘কাতারের রাস লাফান বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র। সারাবিশ্বে চাহিদার ২০ শতাংশ সরবরাহ হয় রাস লাফান থেকে। বাংলাদেশে এলএনজি আমদানির বড় দেশ কাতার। এখন রাস লাফানে হামলার পর এলএনজি নিয়ে বাংলাদেশের দুশ্চিন্তা বেড়েছে। কারণ কখন রাস লাফানে উৎপাদন শুরু করা যাবে সেটির কোনো নিশ্চয়তা নেই। এখন সরকারকে বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে।’

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘এখন গ্যাস ছাড়া বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন হবে না। বিদ্যুৎ না হলে শিল্পের উৎপাদন ব্যাহত হবে। আবার সার না হলে কৃষিতে উৎপাদন ব্যাহত হবে। সবমিলিয়ে গ্যাসের সাপ্লাই চেইন স্বাভাবিক রাখা না গেলে পুরো অর্থনীতি সংকটের মুখে পড়বে।’

কাতার থেকে না পেলে আমরা স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ করবো। আমেরিকা বাদেও অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অ্যাঙ্গোলা, নাইজেরিয়া থেকে এলএনজি সংগ্রহের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।-পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইন) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬৯২ দশমিক ২ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন করেছে। পাশাপাশি আমদানি করা এলএনজি থেকে সরবরাহ দেওয়া হয়েছে ২৮১ দশমিক ৮ বিসিএফ এলএনজি।

আরপিজিসিএলের (রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এলএনজি আমদানি হয়েছে ৫৮ লাখ ৮ হাজার মেট্রিক টন। আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি হয়েছিল ৫১ লাখ ৩৭ হাজার মেট্রিক টন।

আরও পড়ুন

কাতারের রাস লাফান-ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্র কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
যুক্তরাজ্যে গ্যাসের দাম বেড়েছে ১৪০ শতাংশ
কাতারে হামলা, সবচেয়ে বেশি গ্যাস সংকটে পড়বে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান
বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলার ছাড়ালো

এর মধ্যে জিটুজি চুক্তিতে কাতার থেকে ২৪ লাখ ৬০ হাজার টন এবং ওমান থেকে ৮ লাখ ৬ হজাার টন এলএনজি আমদানি করা হয়। একই সময়ে ২৪ লাখ ৯০ হাজার টন এলএনজি আমদানি করা হয় স্পট মার্কেট থেকে।

চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে ২৫ লাখ ৮৬ হাজার টন এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু কাতার থেকে এসেছে ১৬ লাখ ৫২ হাজার টন। যা মোট আমদানির ৬৪ শতাংশ। পাশাপাশি স্পট মার্কেটে আমেরিকা থেকে ৪ লাখ ৩৬ হাজার টন এলএনজি আমদানি হয়।

এর মধ্যে শুধু কাতার থেকে এসেছে ১৬ লাখ ৫২ হাজার টন। যা মোট আমদানির ৬৪ শতাংশ। পাশাপাশি স্পট মার্কেটে আমেরিকা থেকে ৪ লাখ ৩৬ হাজার টন এলএনজি আমদানি হয়।

২০২৫ সালের জুন মাসের তথ্য অনুযায়ী, মোট প্রাকৃতিক গ্যাসের মধ্যে ক্যাপটিভ পাওয়ারসহ বিদ্যুতে ৫৭ দশমিক ৯৯ শতাংশ, সার কারখানায় ৬ দশমিক ৩০ শতাংশ, শিল্পে ১৮ দশমিক ৯১ শতাংশ, বাণিজ্যিক গ্রাহকরা দশমিক ৬৩ শতাংশ, চা-বাগানে শূন্য দশমিক ১২ শতাংশ, সিএনজিতে ৫ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং গৃহস্থালি গ্রাহকরা ব্যবহার করেছে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ।

বর্তমানে কী পরিমাণ এলএনজি মজুত

বর্তমানে কী পরিমাণ এলএনজি মজুত আছে সে বিষয়ে পেট্রোবাংলার কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করা শর্তে রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির (আরপিজিসিএল) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের এলএনজি মজুত করে রাখতে পারি না। যে সব ট্যাংকার আসে সেগুলো থেকে এলএনজি মহেশখালীতে স্থাপিত দুটি এফএসআরইউতে (ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট) নেওয়ার পর প্রাকৃতিক গ্যাসে রূপান্তর করে গ্রিড লাইনে সরবরাহ করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে এফএসআরইউতে যা রয়েছে, সঙ্গে স্পট মার্কেট থেকে কেনা দুটি জাহাজের গ্যাস দিয়ে আগামী ২০ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে।’

একটি পার্সেলে ৬শ থেকে ৭শ কোটি টাকা ব্যয় হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘স্পট মার্কেট থেকে একসঙ্গে অনেক এলএনজি কিনে রাখা যায় না। এখানে ডলারের একটি বিষয় থাকে। এখন মধ্যপ্রাচ্য সংকটে কাতার থেকে সরবরাহ না আসায় বিকল্প হিসেবে স্পট মার্কেট থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে।’

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইন) প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘কাতার থেকে না পেলে আমরা স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সংগ্রহ করবো। আমেরিকা বাদেও অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, অ্যাঙ্গোলা, নাইজেরিয়া থেকে এলএনজি সংগ্রহের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘কাতার পুরো বিশ্বে এলএনজি সরবরাহ করে। তাদের সরবরাহ বন্ধ থাকলে অন্য উৎসগুলোর দিকে সারাবিশ্ব ঝুঁকবে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম বাড়তে পারে। এতে এলএনজি আমদানি হয়ে উঠতে পারে ব্যয়বহুল।’

তবে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও গ্যাস সংকট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান তিনি।

১৯ দিনে মহেশখালী এসেছে এলএনজিবাহী ৫ জাহাজ

চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য বলছে, ১ মার্চ থেকে ১৯ মার্চ পর্যন্ত মহেশখালী এফএসআরইউতে এলএনজির পাঁচটি জাহাজ এসেছে। ২০ মার্চ আরও একটি আসার কথা শিডিউল রয়েছে।

এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া থেকে ৭৪ হাজার টন এলএনজি নিয়ে আসা ‘প্রাচি’ নামে ট্যাংকারটি থেকে বর্তমানে খালাস চলমান। এর আগে কাতার থেকে আসা অন্য চারটি জাহাজ ইতোমধ্যে খালাস হয়েছে। তাছাড়া অ্যাঙ্গোলা থেকে ৭০ হাজার টন এলএনজি নিয়ে আসা ‘সোনাগুল ব্যাঙ্গোলা’ নামে আরেকটি ট্যাংকার জাহাজ আজ (২০ মার্চ) মহেশখালী এফএসআরইউতে বার্থিং করার কথা রয়েছে।

বাড়ছে লোডশেডিং

বর্তমানে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ৯০টির বেশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। দেশে চাহিদার প্রায় ৫৩ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন গ্যাসনির্ভর। বর্তমানে গ্যাস সংকটে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় সারাদেশে গড়ে দৈনিক দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এলএনজি আমদানি ব্যাহত হলে এ লোডশেডিং তীব্রতর হওয়া আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পেট্রোবাংলার ১৬ মার্চ তারিখের তথ্য বলছে, বিদ্যুতে দৈনিক ২৫২৫ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ৮০৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হয়েছে।

ছয় সার কারখানার মধ্যে বন্ধ পাঁচটি

ইউরিয়া সার উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার করা হয়। ইউরিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশে ছয়টি সার কারখানা রয়েছে। ঘোড়াশাল-পলাশ ফার্টিলাইজার, শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি, যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার (সিইউএফএল), আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি এবং বহুজাতিক কোম্পানি কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি (কাফকো)। বর্তমানে শুধু সিলেটের শাহজালাল ফার্টিলাইজার চালু রয়েছে। এতে সামনের বোরো মৌসুমে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সার আমদানিতেও জোর দিতে হচ্ছে সরকারকে। পেট্রোবাংলার ১৬ মার্চ তারিখের তথ্য বলছে, দেশের ছয় সার কারখানায় ৩২৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ৫৬ দশমিক ৯ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস।

এমডিআইএইচ/এএসএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।