বিপিসির মোংলা জেটিতে ভেড়ে না জাহাজ, ফাঁকা তেলের ট্যাংক

ইকবাল হোসেন
ইকবাল হোসেন ইকবাল হোসেন , নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম মোংলা থেকে ফিরে
প্রকাশিত: ০৯:৩১ এএম, ১৫ মার্চ ২০২৬
নির্মাণের ৬ বছরেও কোনো জাহাজ ভেড়েনি বিপিসির জেটিতে/জাগো নিউজ গ্রাফিক্স

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় জ্বালানি সরবরাহ সহজ করতে মোংলা অয়েল ইনস্টলেশন নির্মাণ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আমদানি করা তেলের জাহাজ সরাসরি খালাসের জন্য ২০৫ কোটি টাকার এ স্থাপনায় নির্মাণ করা হয় জেটি। তবে জাহাজ ভেড়েনি একদিনও। ফাঁকা থাকে অধিকাংশ তেলের ট্যাংক।

২০১৯ সালে ইনস্টলেশন পয়েন্টটি থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ শুরু করা হলেও আমদানি করা তেলের একটি জাহাজও অপারেশন করা সম্ভব হয়নি। ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হচ্ছে জেটি সুবিধা ও সংযোজিত যন্ত্রপাতি।

অভিযোগ রয়েছে, পশুর নদীতে নাব্য সংকট অনেক পুরোনো। সেই পুরোনো সংকটের মধ্যে আমদানি করা তেলের জাহাজ অপারেশন সুবিধার জেটি নির্মাণের আগে সঠিকভাবে ফিজিবিলিটি স্টাডি করা হয়নি।

আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আগে থেকে পেট্রোলিয়াম মজুত বাড়ানো উচিত ছিল। কিন্তু সেক্ষেত্রে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। উল্টো মোংলায় যে ডিপো স্থাপনা করা হয়েছে, তাও সঠিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।-জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম

সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে মোংলা অয়েল ইনস্টলেশন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ হাতে নেয় বিপিসি। ২০১৯ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। ২০১৯ সালের মে মাসে জ্বালানির অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু হয়। ডিপোতে আমদানি করা তেলের জাহাজ সরবরাহ খালাসের সুবিধা রাখা হয়। চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীরে পতেঙ্গায় মেইন পয়েন্ট ইনস্টলেশনের পরে একমাত্র খুলনায় আমদানি করা তেলের জাহাজ অপারেশনের এ সুবিধা তৈরি করা হয়। পুরো প্রকল্পে ব্যয় করা হয় ২০৫ কোটি ৪৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকা।

বিপিসির মোংলা ডিপো

বিপিসির মোংলা ডিপো

স্থাপনাটিতে এক লাখ টন জ্বালানি মজুত করার সুবিধা রয়েছে। সমন্বিত ডিপোটিতে ১৪টি ট্যাংক (তৈলাধার) রয়েছে। এর মধ্যে একটি ফার্নেস অয়েলের জন্য। ১৩টির মধ্যে পদ্মা অয়েল পাঁচটি এবং মেঘনা-যমুনা চারটি করে ট্যাংক ব্যবহার করে। অধিকাংশ ট্যাংকার বছরের বেশিরভাগ সময় খালি পড়ে থাকে। ২০-২৫ শতাংশের বেশি ব্যবহার হয় না বললেই চলে।

আরও পড়ুন

সংকটের মধ্যে ডিজেল-অকটেন বিক্রি বেড়েছে ১২-১৮ শতাংশ
জ্বালানি সংকটের চাপ পণ্য সরবরাহে
‘ইন্ডাস্ট্রিকে অবশ্যই চাহিদামতো ফুয়েল সাপ্লাই দিতে হবে

সরেজমিনে দেখা যায়, পশুর নদীর মোংলা অংশে পাশাপাশি রয়েছে মোংলা বন্দর এবং বিপিসির এমআই। নিয়মিত ড্রেজিং না হওয়ায় বড় তেলবাহী জাহাজ পশুর নদীতে ঢুকতে পারে না। এতে আধুনিক সুবিধা বিদ্যমান থাকার পরেও তা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। নির্মিত ট্যাংকগুলোও জ্বালানি মজুত কাজে নিয়মিত ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।

মোংলা এমআইতে যে জেটি রয়েছে, সেটি ব্যবহার হচ্ছে না। ওখানে পশুর নদীর গভীরতার সমস্যা রয়েছে। এটি প্রধানতম সমস্যা। গভীরতার অভাবে আমদানি করা তেলের জাহাজ ওই জেটিতে ভেড়ানো সম্ভব নয়।-বিপিসির সদ্য সাবেক পরিচালক (অপারেশন্স) ড. এ কে এম আজাদুর রহমান

বিষয়টি নিয়ে কথা হয় মোংলা অয়েল ইনস্টলেশন পয়েন্টের ম্যানেজার প্রবীর হিরার সঙ্গে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘খুলনাসহ আশপাশের এলাকায় জ্বালানি সরবরাহ নির্বিঘ্ন করতে মোংলায় এই ইনস্টলেশন পয়েন্টটি করা হয়। এটিতে ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটর ও পেট্রোলপাম্পগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ দেওয়া হয়।’

জাহাজ ভেড়ার জেটি

জাহাজ ভেড়ার জেটি

এখানে ফায়ার ফাইটিং থেকে শুরু করে আধুনিক যাবতীয় সুবিধা রয়েছে। এখান থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। চট্টগ্রাম এমআই থেকে এখানে লাইটারেজে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল আসে। তবে পশুর নদীর নাব্য সংকটের কারণে বড় জাহাজ অপারেশন করা যায়নি।

প্রকল্পটির বিষয়ে কথা হলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, ‘জ্বালানি সেক্টরে যে প্রকল্পগুলো হয়েছে, এর মধ্যে অনেকগুলো অপরিকল্পিত। আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আগে থেকে পেট্রোলিয়াম মজুত বাড়ানো উচিত ছিল। কিন্তু সেক্ষেত্রে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। উল্টো মোংলায় যে ডিপো স্থাপনা করা হয়েছে, তাও সঠিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না।’

নাব্য কমছে নদীর

নাব্য কমছে নদীর

ফিজিবিলিটি স্টাডি সঠিকভাবে না হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি সঠিকভাবে হলে তো স্থাপনা অব্যবহৃত থাকার কথা নয়। কিন্তু ছয় বছরে একদিনের জন্যও জেটিটি ব্যবহার করা হয়নি। তাহলে ফিজিবিলিটি স্টাডি সঠিক হয়েছে কিংবা ফিজিবিলিটি স্টাডি আদৌ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে তো প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশে অভিযোগ হয়, তদন্ত হয়। কিন্তু তদন্তের ফল কেউ জানতে পারেন না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিপিসির সদ্য সাবেক পরিচালক (অপারেশন্স) ড. এ কে এম আজাদুর রহমান বদলি হওয়ার আগে জাগো নিউজকে বলেন, ‘মোংলা এমআইতে যে জেটি রয়েছে, সেটি ব্যবহার হচ্ছে না। ওখানে পশুর নদীর গভীরতার সমস্যা রয়েছে। এটি প্রধানতম সমস্যা। গভীরতার অভাবে আমদানি করা তেলের জাহাজ ওই জেটিতে ভেড়ানো সম্ভব নয়।’

তবে প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ফিজিবিলিটি স্টাডি না হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মোংলা এমআই নির্মাণের কার্যক্রমগুলো সঠিকভাবে করা হয়েছিল কি না কিংবা কোনো গাফিলতি রয়েছে কি না, সেটা না জেনে মন্তব্য করা যাবে না।’

এমডিআইএইচ/এএসএ/এমএফএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।