মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ

সার নিয়ে ‘শঙ্কা না থাকলেও’ জেলায় জেলায় ভিন্ন পরিস্থিতি

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১০:৪৩ এএম, ২৮ মার্চ ২০২৬
ফসলের মাঠে সার দিচ্ছেন এক কৃষক/ এআই দিয়ে বানানো ছবি

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সারের সরবরাহ নিয়ে গোটা বিশ্বের মতো চিন্তায় বাংলাদেশের কৃষকরাও। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে সার নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ নেই। তবে সরকারিভাবে সার মজুত ও সরবরাহের বিষয়ে আশ্বস্ত করা হলেও দেশের বিভিন্ন জেলায় মাঠ পর্যায়ে ভিন্ন পরিস্থিতিরও খবর পাওয়া গেছে। দেশের কোনো কোনো এলাকায় ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের বাড়তি দাম রাখছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, সারের মোট চাহিদার একটি বড় অংশ সৌদি আরব ও কাতার থেকে আমদানি করে বাংলাদেশ। এছাড়া দেশের কারখানাগুলোতে যে সার উৎপাদন হয় সেখানেও বড় ভরসা আমদানি করা গ্যাস। কিন্তু উপসাগরীয় এলাকায় চলমান যুদ্ধের কারণে এই সরবরাহ এখন পুরোটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

যদিও সরকারের দাবি, সার নিয়ে শঙ্কার কোনো কারণ নেই। এই মুহূর্তে দেশে যে পরিমাণ সার মজুত রয়েছে, তা দিয়ে অন্তত এক বছর পর্যন্ত চালিয়ে নেওয়া যাবে।

এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে যাতে কোনো সংকট তৈরি না হয়, সেজন্য বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি ও সার সংগ্রহের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।

তিনি বলছেন, আমদানির প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে চীন ও মিশরের মতো বিকল্প দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে সরকার।

এদিকে সরকারিভাবে সার মজুত ও সরবরাহের বিষয়ে আশ্বস্ত করা হলেও দেশের বিভিন্ন জেলায় মাঠ পর্যায়ে ভিন্ন পরিস্থিতিরও খবর পাওয়া গেছে। দেশের কোনো কোনো এলাকায় ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের বাড়তি দাম রাখছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলছেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি কিংবা সারের সংকট তৈরি হতে পারে।

কিন্তু ‘বাংলাদেশে কোনো একটা সংকট তৈরি হওয়ার আগেই একটা কৃত্রিম সংকট আমরা তৈরি করে ফেলি, এটা মূল সমস্যা,’।

বাধাগ্রস্ত সার উৎপাদন
যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটের আঁচ লেগেছে বাংলাদেশেও। ফিলিং স্টেশনের সামনে জ্বালানি তেলের জন্য যানবাহনের লম্বা লাইন সেই বাস্তবতায় তুলে ধরে।

সরকারের পক্ষ থেকেও জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের কথাও জানিয়েছেন জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন জ্বালানি স্থাপনায় হামলার ঘটনা।

যা সার উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ দেশের সার কারখানাগুলো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর বড় মাত্রায় নির্ভরশীল।

ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে গ্যাস সাশ্রয় করতে মার্চের শুরু থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ রেখেছে সরকার।

উৎপাদন বন্ধ বেসরকারি কাফকো সার কারখানায়ও। যা চিন্তার কারণ হয়ে দাড়িয়েছে দেশের কৃষিখাতের জন্য।

যদিও কারখানাগুলো শিগগির উৎপাদনে ফিরবে বলে দাবি কৃষিমন্ত্রীর। তিনি বলছেন, সারের মজুত পর্যাপ্ত থাকায় জ্বালানি রেশনিংয়ের অংশ হিসেবে সার কারখানাগুলো আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, তিনি বলেছেন এরই মধ্যে চালু করে দেবেন। অন্তত ঘোড়াশালও যদি চালু করে দেয় তাহলেও আমরা প্রতিদিন ২৮শ টনের ওপর পেয়ে যাব।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কেবল মজুত দিয়ে দীর্ঘ সময় সামাল দেওয়া কঠিন হবে বলেই মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।

তাই চীন, মিশর বা রাশিয়ার মতো বিকল্প বাজার থেকে দ্রুত সার আমদানি নিশ্চিত করা এবং বন্ধ থাকা দেশীয় কারখানাগুলো পুনরায় চালু করার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

দেশের ফসলি মৌসুম অনুযায়ী এখন সারের চাহিদা কিছুটা কম থাকায় আপাতত তেমন সমস্যা হবে না বলেই মনে করেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম।

তিনি বলছেন, এই মৌসুমে ধান এখন শেষের দিকে আছে, সেখানে খুব একটা সারের প্রয়োজন নেই। কিছু জায়গায় লেইট প্লানটেশন হয়েছে সেখানে কিছু সার হয়তো লাগবে।

কিন্তু বিকল্প উৎস থেকে আমদানির সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করা ঠিক হবে না বলেই মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলেন, আমরা যেহেতু বিকল্প উৎসের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছি, সে ক্ষেত্রে দামও কিছুটা বেড়ে যেতে পারে।

এছাড়া অন্যান্য খাতে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ আমিরুল ইসলামের। কৃষি তো এককভাবে চলে না, একটা সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার, বলেন তিনি।

মজুত আছে কতটা?
কৃষি নির্ভর দেশ হয়েও সারের চাহিদার প্রায় সবটাই বিদেশ থেকে আমদানি করে বাংলাদেশ। দেশের সরকারি পাঁচটি ও বেসরকারি একটি কারখানায় কিছু সার উৎপাদিত হলেও বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে।

দেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট চাহিদার প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টনই লাগে ইউরিয়া সার। যার কেবল ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদন হয়। অর্থাৎ কৃষিতে প্রয়োজনীয় সারের বড় অংশই আমদানি করতে হয়। আর এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি সারের আমদানি এবং চাহিদা পূরণ নিয়ে বাংলাদেশকে শঙ্কায় ফেলেছে।

যদিও কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলছেন, পর্যাপ্ত সার মজুত থাকায় এই মুহূর্তে সংকটের কোনো শঙ্কা নেই।

আমদানি করা সার এখনও যতটা মজুত আমাদের কাছে আছে, তাতে আরও মোটামুটি এক বছর চালিয়ে নেওয়া যাবে, বলেন তিনি।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইউরিয়া চার লাখ ৯৩ হাজার টন, টিএসপি তিন লাখ ৮২ হাজার টন, ডিএপি পাঁচ লাখ নয় হাজার টন এবং এমওপি মজুত রয়েছে তিন লাখ ৪২ হাজার টন।

মন্ত্রী বলছেন, এখন বোরো মৌসুমের শেষ পর্যায়ে। ফলে আগামী কয়েক মাস নতুন করে বিপুল পরিমাণ সারের প্রয়োজন পড়বে না।

এছাড়া বর্ষা শেষে আমন মৌসুমেও ইউরিয়ার চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে। মূলত আগামী বছরের বোরো মৌসুমকে লক্ষ্য করেই এখন থেকে আমদানির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

কাতার, সৌদি আরব থেকে আমরা মূলত ইউরিয়া আমদানি করতাম। এই মুহূর্তে কোনো ক্রাইসিস নেই, তবে এটা যেহেতু চলমান প্রক্রিয়া তাই আমরা বিকল্প উৎস খুঁজছি, বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।

আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা
বৈশ্বিক জ্বালানির পাঁচ ভাগের এক ভাগ এবং সারের তিন ভাগের এক ভাগ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়েই সরবরাহ করা হয়। যে পথটি গত প্রায় এক মাস ধরে অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইরান। যার ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক সংস্থা সিআরইউ গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। টনপ্রতি যে সারের দাম ছিল ৪৯০ ডলার, তা এখন ৬২৫ ডলারে পৌঁছেছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম আরও বাড়তে পারে, যা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপ তৈরি করবে।

এরই মধ্যে সার সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় কৃষি উৎপাদন নিয়ে সংকটে পড়েছে ভারত, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশ।

যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ফার্মার্স ইউনিয়নের সভাপতি টম ব্র্যাডশ বলেছেন, বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতা কৃষি ব্যবসা গুলোকে ‘প্রচণ্ড চাপের’ মধ্যে ফেলছে।

তিনি বলেন, জ্বালানি ও সারের বর্ধিত ব্যয়ভার বহন করতে এরই মধ্যে বাড়তি চাপে পড়েছেন শস্য, পশুপালন এবং দুগ্ধ খামারিরা।

সোর্স: বিবিসি বাংলা

এমআইএইচএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।