গ্রাম-গঞ্জে সেবা দিয়ে জনপ্রিয় হচ্ছে ‘এজেন্ট ব্যাংকিং’
ইয়াসির আরাফাত রিপন ইয়াসির আরাফাত রিপন
প্রকাশিত: ০২:১২ পিএম, ২৭ মার্চ ২০২৬
গ্রাহকের লেনদেন সেবা সহজ করে তুলেছে এজেন্ট ব্যাংকিং। টাকা জমা কিংবা তোলার জন্য এখন সাধারণ মানুষকে জেলা-উপজেলা শহরে যেতে হয় না। হাতের নাগালে এজেন্ট ব্যাংকিংয়েই পাচ্ছেন সমাধান। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংকের এজেন্ট ও আউটলেট থেকে ঋণ সুবিধাও মিলছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ প্রতিবেদন বলছে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত ও ঋণ বিতরণ সবই বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সেবায় দেশের ব্যাংকখাতে মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৪১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে আমানত বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ হাজার ৩৫৬ কোটি টাকায়।
গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানতের পরিমাণ ছিল ৪৭ হাজার ৭০০ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ৭ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা বা ১৮ শতাংশের বেশি। আর তিন মাসে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত বেড়েছে দুই হাজার ১৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা।
সংগৃহীত আমানত গ্রাম থেকে সংগ্রহ করে নানা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়। নতুন শাখা খোলার চেয়ে কম খরচে শহর ও গ্রামে নতুন গ্রাহক ধরে রাখা যায় এ সেবায়। আর এসব কারণে দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম।-ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং কর্মকর্তা আক্তারুজ্জামান
তবে আমানত বাড়লেও এজেন্ট ও আউটলেটের সংখ্যা কমেছে এ সময়ের মধ্যে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে ব্যাংকগুলোর এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ২৪৮টি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৫০১টিতে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে এজেন্ট আউটলেট সংখ্যা কমেছে ৭৪৭টি। যদিও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকের তুলনায় ডিসেম্বর প্রান্তিকে আউটলেট সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে।
গত ২০২৪ সাল শেষ প্রান্তিকে দেশে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা দেওয়া ব্যাংকগুলোর এজেন্টের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ১৯টি। বিদায়ী বছরের শেষ প্রান্তিকে কমে হয়েছে ১৫ হাজার ৩২৮টি। এক বছরের ব্যবধানে এজেন্টের সংখ্যা কমেছে ৬৯১টি।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে মোট হিসাবধারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ৫৮ লাখ ৩২ হাজার ৯৮১টি। তার আগের প্রান্তিক সেপ্টেম্বর শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে মোট হিসাবধারীর সংখ্যা ছিল দুই কোটি ৫১ লাখ ৩৯ হাজার ১৬৪টি। অর্থাৎ তিন মাসে হিসাব বেড়েছে ছয় লাখ ৯৩ হাজার ৮১৭টি। ২০২৪ সাল শেষে ঋণ হিসাবের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ১৫৮টি। যার মধ্যে নারীদের হিসাব রয়েছে এক কোটি ২৮ লাখ সাত হাজার ৩৩১টি।
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে ব্যাংকিং সেবা। এতে তারা ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন সহজ করতে পারছেন। মূলত প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে এজেন্ট ব্যাংকিং সহজ করেছে। দেশে অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এ মাধ্যমটি।-বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান
এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত বাড়লেও এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার আওতায় লেনদেন কমেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর প্রান্তিকে লেনদেনের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৭০ লাখ। যা ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ কোটি ৬২ লাখে। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে লেনদেনের সংখ্যা কমেছে ৩ শতাংশ।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ঋণ বিতরণের স্থিতি ছিল ৩১ হাজার ৯১০ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। পরের প্রান্তিক অর্থাৎ, ডিসেম্বর শেষে ঋণ বিতরণের স্থিতি দাঁড়ায় ৩৫ হাজার ১৩ কোটি ১৮ লাখ টাকায়। তিন মাসে ঋণ বিতরণের স্থিতি বেড়েছে ৩ হাজার ১১২ কোটি ৯ লাখ টাকা।
আরও পড়ুন
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে বেড়েছে আমানত-ঋণ বিতরণ
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে নতুন রেকর্ড, এক বছরে গ্রাহক বেড়েছে ১৪ লাখ
এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানত বেড়েছে, কমেছে এজেন্ট ও আউটলেট
এজেন্ট ব্যাংকিং গ্রাহকের বড় অংশই প্রান্তিক পর্যায়ের। প্রায় ১১ বছর ধরে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু রয়েছে। ২০১৪ সালে ব্যাংক এশিয়ার মাধ্যমে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু হয়। বর্তমানে প্রায় ৩০টি ব্যাংক এই সেবা দিচ্ছে। এ সেবার মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাংকিং কার্যক্রম।
গ্রাম পর্যায়ের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ১৮ লাখ ৫৮ হাজার ৫৩৫ জন। দেশে এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট সংখ্যা ২০ হাজার ৫০১টি এবং এজেন্ট রয়েছে ১৫ হাজার ৩২৭টি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবশেষ প্রতিবেদন বলছে, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ডিসেম্বর প্রান্তিক শেষে সবচেয়ে বেশি আমানত পেয়েছে ইসলামী ব্যাংক। বেসরকারি খাতের এ ব্যাংকটির আমানত ডিসেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকায়। দ্বিতীয় অবস্থানে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকায়। এছাড়া ব্যাংক এশিয়ার এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে আমানতের পরিমাণ ৬ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের ৩ হাজার ৮৬৯ কোটি টাকা, ব্র্যাক ব্যাংকের ২ হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা এবং ইউসিবির ১ হাজার ৫৫২ কোটি টাকা।
ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং কর্মকর্তা আক্তারুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘যে সব এলাকায় ব্যাংকিং অন্তর্ভুক্তি কম সে সব এলাকায় এজেন্ট ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে ব্যাংকিং সুবিধা বাড়ানো যায়। তাছাড়া এখন অনেক ব্যাংক প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আমানত সংগ্রহ করতে এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা বেছে নিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘সংগৃহীত আমানত গ্রাম থেকে সংগ্রহ করে নানা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়। নতুন শাখা খোলার চেয়ে কম খরচে শহর ও গ্রামে নতুন গ্রাহক ধরে রাখা যায় এ সেবায়। আর এসব কারণে দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ফলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে ব্যাংকিং সেবা। এতে তারা ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন সহজ করতে পারছেন। মূলত প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে এজেন্ট ব্যাংকিং সহজ করেছে। দেশে অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এ মাধ্যমটি। সাধারণ মানুষ হাতের কাছে ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেন করতে পারছেন। তাছাড়া এজেন্ট ব্যাংকিং থেকে ঋণও নিতে পারছেন।’
ইএআর/এএসএ