১০ মাস ধরে বন্ধ টেকনাফ স্থলবন্দর, আমদানি-রপ্তানি ব্যাহত

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:০২ পিএম, ৩০ মার্চ ২০২৬
টেকনাফ স্থলবন্দর/ফাইল ছবি

নিরাপত্তা শঙ্কাসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্ত বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার টেকনাফ স্থলবন্দর প্রায় ১০ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। যার ফলে দুই দেশের মধ্যকার আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে, এই রুটে বেড়েছে চোরাচালান। এমন অবস্থায় স্থলবন্দরটি পুরোদমে চালু করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) উদ্যোগ নিতে বলেছে, চট্টগ্রাম কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট।

কমিশনারেট থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দেওয়া এক চিঠিতে এভাবে সংকটের চিত্র তুলে ধরে বন্দরটি দ্রুত সচল করতে ৬টি সুপারিশ করেছে।

সোমবার (৩০ মার্চ) এনবিআর সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

চিঠিতে বলা হয়, ১৯৯৪ সালের বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় পরিচালিত এই বন্দর দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, চট্টগ্রামের অধীনে জারি করা বিভিন্ন আদেশ অনুযায়ী দীর্ঘদিন ধরে এখানে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চলমান ছিল।

বর্তমান আমদানি নীতি আদেশ (২০২১-২০২৪) অনুযায়ী, ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এলসি ছাড়াই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে চাল, ডাল, ভুট্টা, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন পণ্য মিয়ানমার থেকে আমদানি করা হতো। তবে মিয়ানমার অংশে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বাণিজ্য কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

এর ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে এবং বন্দরনির্ভর শ্রমজীবী মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে পড়ছেন। একই সঙ্গে বৈধ বাণিজ্য বন্ধ থাকায় সীমান্তে চোরাচালান বেড়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই বন্দর থেকে প্রায় ৬৪০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হলেও পরের বছর তা কমে ৪০৪ কোটিতে নেমে আসে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাণিজ্য স্থবিরতার কারণে রাজস্ব আরও কমে প্রায় ১১০ কোটিতে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই বন্দর দিয়ে ৬.৫ লাখ মার্কিন ডলার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২.২৫ লাখ মার্কিন ডলার ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বন্দর দিয়ে ১০ লাখ মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় করেছে। 

চিঠিতে বলা হয়, আমদানিকারকরা এই বন্দর থেকে একক চালানে অনধিক ৫০ হাজার মার্কিন ডলার ও অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রে একক চালানে ৩০ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যে পণ্য আমদানি করে থাকে।

নিবন্ধিত আমদানি-রপ্তানিকারকরা তাদের মনোনীত সিঅ্যান্ডএফ প্রতিনিধির মাধ্যমে বাণিজ্য চুক্তির অধীনে ব্যাংক ড্রাফট (বৈধ ব্যাংক ট্রানজেকশন) পদ্ধতিতে আমদানি-রপ্তানি আদেশ মোতাবেক পণ্য আমদানি করেন। এছাড়া প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি করে থাকেন।

চিঠিতে বলা হয়, এক্ষেত্রে বর্তমানে বাংলাদেশ অংশে কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু মিয়ানমার অংশে সরকারি ও বেসরকারি ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়েছে বিধায় নিরাপত্তার স্বার্থে আমদানি-রপ্তানির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। যার ফলে রাজস্ব বিভাগ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হতে বঞ্চিত হচ্ছে এবং বন্দর কোটি কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে মিয়ানমারের অংশের সমস্যা চিহ্নিত করে নিরাপত্তা জনিত সমস্যা নিরসন করে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। 

বৈধপথে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ হওয়ায় চোরাচালান বৃদ্ধি পেয়েছে জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়, বন্দরের ওপর নির্ভরশীল শ্রমজীবী লক্ষাধিক জনগণ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অনৈতিকভাবে চোরাচালানে জড়িয়ে যাচ্ছে, যা স্থানীয় বাজারে মিয়ানমারে পণ্য সরবরাহের উপস্থিতিতে পরিলক্ষিত হচ্ছে, যার দরুন রাজস্ব ক্ষতি দিন দিন বেড়েই চলছে। কোস্ট গার্ড, বিজিবি ও সমন্বিত টাস্কফোর্সের মাধ্যম চোরাচালান নিরোধের পাশাপাশি নিরাপত্তার নিশ্চিত করণের মধ্যদিয়ে ব্যবসায়ীদের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চলমান রাখা যেতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ছয়টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার করা, সীমান্তে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যৌথ টাস্কফোর্স গঠন, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা আয়োজন এবং অনুমোদিত পণ্যের তালিকা হালনাগাদ করা। এছাড়া পরীক্ষামূলকভাবে সীমিত পরিসরে বন্দর চালু করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রাথমিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা যায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গণমাধ্যমে ইতিবাচক বার্তা প্রচার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। একই সঙ্গে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করে চোরাচালান প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বন্দরের অনেক অবকাঠামো নষ্ট হয়ে গেছে। সেগুলো সংস্কার করা জরুরি। অতি দ্রুত বিগত বছরগুলোতে ইস্যু করা ব্যাংক ড্রাফটের বিপরীতে মিয়ানমারে আটকে থাকা পণ্যগুলো নিরাপদে দেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা দরকার।

এসএম/ইএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।