জ্বালানি সংকটে সাইকেলের বিক্রিতে ইতিবাচক হাওয়া
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে দেশে সৃষ্ট হওয়া জ্বালানি সংকটের প্রভাবে সাইকেলের বাজারে ইতিবাচক হাওয়া বইছে। বিক্রেতারা বলছেন, সাইকেলের বিক্রি ৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। রমজান ও ঈদুল ফিতরের সময় থেকেই সাইকেল বিক্রি কিছুটা বাড়তির দিকে। এখনও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
তবে কোনো কোনো বিক্রেতা বলছেন, ক্রেতা নেই। এখনও অলস সময় পার করছেন। জ্বালানি সংকটের কারণে বিক্রি যেভাবে বাড়ার প্রত্যাশা করা হয়েছিলো, সে তুলনায় বিক্রি বাড়েনি।
সাইকেলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে
সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ধারণা করা থাকে, দেশে প্রায় আড়াই কোটি সাইকেল বা বাইসাইকেল চলে। গবেষণা ও নগর পরিকল্পনাবিদদের তথ্য অনুসারে, ঢাকা শহরে প্রায় দুই লাখ সাইকেল রয়েছে। মোট যানবাহনের তুলনায় এ সংখ্যা নগণ্য হলেও বর্তমানে ঢাকা শহরে পরিবেশবান্ধব দ্বিচক্রযানের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এখন বাসা থেকে অফিসে নিয়মিত যাতায়াত করেন হাজারো সাইক্লিস্ট। পার্সেল পরিবহনেও সাইকেল এখন জনপ্রিয়। শহরের রাস্তায় প্রতিনিয়তই চোখে পড়ে বাইসাইকেল।
সাইকেলের দাম কেমন
দেশে সাইকেলের সর্বনিম্ন দাম সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা। মাঝারি মানের সাইকেলের দাম ৮ থেকে ১৫ হাজার টাকা। ভালো মানের (গিয়ার) সাইকেলের দাম ১৫ থেকে ৩০ হাজার ও হাই ব্র্যান্ডের সাইকেলের দাম ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার বেশিও হয়ে থাকে।
পুরান ঢাকার বংশালে শিশু সন্তানের জন্য বাইসাইকেল কিনছে একটি পরিবার, ছবি: জাগো নিউজ
বুধবার (৮ এপ্রিল) বিকেলে পুরান ঢাকার বংশালের কাজী আলাউদ্দিন রোডে সরেজমিনে ঘুরে পাইকারি ও খুচরা সাইকেল বিক্রেতা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।
কোনো কোনো দোকানে ক্রেতা না থাকায় কর্মচারীদের অলস সময় পার করতেও দেখা গেছে। আবার কোনো কোনো দোকানে ভালো বিক্রি হতেও দেখা গেছে।
বংশালে সাইকেল বিক্রির সবচেয়ে বড় দোকান হৃদয় ট্রেডার্স। প্রতিষ্ঠানটি পাইকারি ও খুচরায় বাইসাইকেল বিক্রি করে থাকে। জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক রিয়াদুল ইসলাম আকাশ জাগো নিউজকে বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের কারণে বাইসাইকেলের বিক্রি যে খুব বেড়েছে বিষয়টি তেমন নয়। বিক্রি আগে যেমন ছিলো তেমনই রয়েছে। আগের মতোই বিক্রি হচ্ছে।’

বংশালে বাইসাইকেল ক্রেতার অপেক্ষায় বিক্রেতা, ছবি: জাগো নিউজ
রিয়াদুল ইসলাম বলেন, ‘রোজা থেকে শুরু হয়ে কোরবানির ঈদ পর্যন্ত বাইসাইকেলের বাজার সব সময় ভালো থাকে। এখনও বাজার ভালো রয়েছে।’
যুদ্ধের প্রভাবে আমদানিকৃত বাইসাইকেলের দাম বেড়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমদানিকারকরা সাইকেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। মডেল ভেদে ১ কার্টন (চারটি) সাইকেলের দাম বেড়েছে ৬ হাজার টাকা। সাইকেল প্রতি ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। ফলে পাইকারিতে সাইকেল বিক্রি কমে গেছে। তবে খুচরা বিক্রি কিছুটা বেড়েছে।’

বংশালে বাইসাইকেল ক্রেতার অপেক্ষায় বিক্রেতা, ছবি: জাগো নিউজ
বংশালের বড় সাইকেলের দোকানগুলোর মধ্যে অন্যতম ফজলু সাইকেল। বাইসাইকেলের এই দোকানের মালিক ফজলুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘যা বেড়েছে সেটিকে বাড়তি বিক্রি বলে না। হালকা একটু বিক্রি বেড়েছে। শতাংশ হিসাবে এটি হয়তো ১ শতাংশ।’
ফজলুর রহমান বলেন, ‘বছরের প্রথম দিকে অনেকেই মাদরাসার ছাত্র কিংবা গরিব ছাত্রদের সাইকেল উপহার দিয়ে থাকেন। আবার এখন অনেক নেতাও বিভিন্ন মাদরাসায় সাইকেল উপহার দিচ্ছেন। এ কারণে রোজা থেকে সাইকেলের বিক্রি অন্য সময়ের চেয়ে কিছুটা বেশি রয়েছে। তবে ঈদের আগে যেমন বিক্রি হয়েছে, এখনও বিক্রি তেমনই হচ্ছে।’
আরও পড়ুন
বেড়েছে বাইসাইকেলের দাম, দুশ্চিন্তায় অভিভাবকরা
জামাতে নামাজ আদায় করে বাইসাইকেল উপহার পেলো ৫৬ শিশু-কিশোর
সাইকেল কেনার সময় যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন
এখনো গ্রামীণ জীবনে অনেকের ভরসা সাইকেল
এক প্রশ্নের উত্তরে ফজলুর রহমান বলেন, ‘যিনি মোটরসাইকেল চালান, তিনি তো আর বাইসাইকেল চালাবেন না। জ্বালানি সংকটের কারণে বিক্রি খুব বেড়ে গেছে, বিষয়টি তেমন নয়। কিন্তু যুদ্ধের কারণে কাঁচামালের দাম বেড়েছে। ফলে পাইকারিতে বাইসাইকেলের দাম কিছুটা বেড়ে গেছে।’

বংশালে বাইসাইকেল ক্রেতার অপেক্ষায় বিক্রেতা, ছবি: জাগো নিউজ
জোনাকী সাইকেল স্টোরের মালিক আশফাকুল ইসলাম জিশান জাগো নিউজকে বলেন, ‘টুকটাক বেচাকেনা হচ্ছে। যেভাবে প্রত্যাশা করেছিলাম সেভাবে বিক্রি বাড়েনি। হয়তো ২ থেকে ৩ শতাংশ, কিংবা সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বিক্রি বেড়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে বাজারে অল্প প্রভাব পড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এখন আমরা দৈনিক ৫ থেকে ৭টি সাইকেল বিক্রি করি, গত বছর এ সময় ৪ থেকে ৫টি সাইকেল বিক্রি করেছি।’
‘এখন বিক্রি একটু ভালো’ উল্লেখ করে সাদ সাইকেল স্টোরের তানজিল জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগের চেয়ে বিক্রি বেশি। এক দেড় মাস ধরে বাজার একটু ভালো। যার প্রয়োজন সে তো বাইক চালাচ্ছেই। আর বাইক তো কেউ আর বিক্রি করে দেয়নি।’
আরও পড়ুন
গাড়িতে না চড়ে সাইকেল চালাবেন যে কারণে
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সাইকেল, বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় বিকল্প পরিবহন
৪০ দিন জামাতে নামাজ পড়ে বাইসাইকেলসহ উপহার পেলো ৩০ শিশু-কিশোর
সাইকেল কমাতে পারে ঢাকার দূষণ, দরকার আলাদা লেন-পার্কিং
তবে সামু সাইকেল গ্যালারির বিক্রয় কর্মকর্তা সুমন বলেন, ‘আশায় আছি বিক্রি বাড়বে। কিন্তু বাড়েনি। লোক নেই। সকাল থেকে বসে আছি। এখনো আশায় আছি। দেখি কী হয়।’
ঢাকা সাইকেলের মালিক ইউসুফ আহমেদ রনি বলেন, ‘সারাদিনে একটি সাইকেল বিক্রি করেছি। তেমন বিক্রি নেই। বাচ্চাদের সাইকেল সাড়ে ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা। আর বড়দের গিয়ারের সাইকেলের দাম ১০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। গিয়ার ছাড়া সাইকেলের দাম ৯ থেকে সাড়ে ৯ হাজার টাকা।’
রয়েল সাইকেল স্টোরের মালিক জাহিদ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ব্যবসা আগেই ভালো ছিলো। বিক্রি বাড়েনি। তবে এখন বাজার একটু ভালো মনে হচ্ছে।’

বংশালে দুরন্ত স্পোর্টসের শোরুম, ছবি: জাগো নিউজ
বংশালের দুরন্ত স্পোর্টসের শোরুমের ব্যবস্থাপক সজল হোসেন বলেন, ‘বিক্রি আগের মতোই রয়েছে। ঈদের সময় যেমন বিক্রি হয়েছে, এখনো তেমন বিক্রি হচ্ছে। ঈদের সময় বাচ্চাদের সাইকেল ভালো বিক্রি হয়। বিক্রি এখনও আগের ধারায় রয়েছে।’
সাইকেলের বাজার প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার
বাংলাদেশের সাইকেলের বাজার বেশ বড়। শুধু দেশ নয়, দেশের বাইরেও রপ্তানি হয়ে থাকে বাংলাদেশি সাইকেল। বছরে স্থানীয়ভাবে এই বাজারের আকার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। রপ্তানিসহ এই বাজারের আকার প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
আরও পড়ুন
বিক্রি বেড়েছে বাইসাইকেলের
সাইকেল চালালে আয়ু বাড়ে, ঝুঁকি কমে নানা রোগের
জামাতে নামাজ আদায়ে উৎসাহিত করতে ৩১৭ শিশুকে সাইকেল উপহার
সাইকেল উপহার পেলো চরাঞ্চলের ৪১ শিক্ষার্থী
ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি
দেশের বাইসাইকেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এককভাবে সবচেয়ে বড় বাজার জার্মানি। এর বাইরে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, ইতালি, পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, স্পেন, ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাইসাইকেল রপ্তানি হয়ে থাকে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ১৭ কোটি ডলারের বাইসাইকেল রপ্তানি হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৪ কোটি ডলার, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮ কোটি ও সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১ কোটি ৬৪ লাখ ডলারের সাইকেল রপ্তানি হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। আর বাংলাদেশ থেকে বাইসাইকেল রপ্তানির শুরু হয় আলিটা (বিডি) লিমিটেডের হাত ধরে। বর্তমানে এ খাতে যুক্ত রয়েছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ড্রাস্ট্রিজ, প্রাণ-আরএফএল ও আকিজ গ্রুপের মতো বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
ইএইচটি/এমএমএআর