দুই শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া শেয়ারের দাম ২২২, টাকা উঠতে লাগবে ২২২০ বছর!
শেয়ারবাজারে অস্বাভাবিক উত্থান নতুন কিছু নয়। তবে যখন কোনো দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কোম্পানির শেয়ার অল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, তখন তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যেমন আগ্রহ তৈরি করে, তেমনি উদ্বেগও বাড়ায়। সাম্প্রতিক সময়ে বিডি অটোকারের শেয়ারদরের ঊর্ধ্বগতি ঠিক এমনই এক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মাত্র এক মাসে প্রায় ৭৬ শতাংশ দাম বেড়েছে কোম্পানিটির শেয়ারের। বিস্ময়কর বিষয় হলো কোম্পানিটির সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে মাত্র ৫ পয়সা। এমন আয়ের বিপরীতে বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী মূল্য আয় অনুপাত (পিই) দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২০, যা বাস্তবতার বিচারে অত্যন্ত অস্বাভাবিক।
সহজভাবে বলতে গেলে, বর্তমান আয়ের ধারা অপরিবর্তিত থাকলে একজন বিনিয়োগকারীর তার বিনিয়োগের মূলধন ফেরত পেতে সময় লাগবে প্রায় ২ হাজার ২২০ বছর। এই হিসাবই বাজারে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্টদের চোখে এটি কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এমন অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ‘বিশেষ চক্র’ বা সংগঠিত গোষ্ঠীর ভূমিকা থাকতে পারে। বিশেষ করে কোম্পানিটির মোট শেয়ার সংখ্যা মাত্র ৪৩ লাখের কিছু বেশি হওয়ায় অল্প পুঁজিতেই শেয়ারের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব।
তারা বলছেন, বিডি অটোকারের আর্থিক ভিত্তি খুব বেশি শক্তিশালী নয়। কোম্পানিটি মুনাফায় থাকলেও তার পরিমাণ খুবই সামান্য। আবার লভ্যাংশের ইতিহাসও খুব একটা ভালো না। এমন একটি কোম্পানির শেয়ার দাম এক মাসের মধ্যে ১০০ শতাংশ বেড়ে যাওয়া কিছুতেই স্বাভাবিক ঘটনা না। এই দাম বাড়ার পিছনে কোনো বিশেষ চক্রের হাত থাকতে পারে।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ৮ মার্চ বিডি অটোকারের প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ১২৬ টাকা ১০ পয়সা। সেখান থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে ৯ এপ্রিল লেনদেন শেষে প্রতিটি শেয়ারের দাম দাঁড়িয়েছে ২২২ টাকা। অর্থাৎ এক মাসে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ৯৫ টাকা ৯০ পয়সা বা ৭৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ।
শুধু গত এক মাস নয়, গত ১১ নভেম্বরের পর থেকেই কোম্পানির শেয়ার দাম বাড়ছে। ১১ নভেম্বর কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ছিল ৯৯ টাকা ৪০ পয়সা। অর্থাৎ পাঁচ মাসের ব্যবধানে প্রতিটি শেয়ারের দাম বেড়েছে ১২২ টাকা ৬০ পয়সা বা ১২৩ দশমিক ৩৪ শতাংশ।
অন্যভাবে বলা যায়, যদি কোনো বিনিয়োগকারী গত ৮ মার্চ বিডি অটোকারের ১০ লাখ টাকার শেয়ার কেনেন, তাহলে এখন তার বাজার মূল্য ১৭ লাখ ৬০ হাজার ৫০৭ টাকা। এ হিসাবে ১০ লাখ টাকা খাটিয়ে এক মাসেই মুনাফা পাওয়া গেছে ৭ লাখ ৬০ হাজার টাকার বেশি।
শেয়ার এমন দাম এভাবে বাড়া কোম্পানিটির সর্বশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসের ব্যবসায় শেয়ারপ্রতি মুনাফা হয়েছে মাত্র ৫ পয়সা।
এদিকে ২০২৫ সালের ৩০ জুন সমাপ্ত বছরে কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের ২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে। তার আগে ২০২৪ ও ২০২৩ সালেও ২ শতাংশ করে লভ্যাংশ দেয় কোম্পানি। তবে ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালে ৪ শতাংশ করে নগদ লভ্যাংশ দিয়েছিলো কোম্পানিটি।
ডিএসইর এক সদস্য বলেন, বর্তমানে কোম্পানিটির মূল্য আয় অনুপাত ২ হাজার ২২০। অর্থাৎ কোম্পানির আয়ের ধারা যদি বর্তমান অবস্থার মতো থাকে তাহলে বিনিয়োগকারীদের শেয়ারে বিনিয়োগ করা টাকা উঠতে ২ হাজার ২২০ বছর লাগবে। তবে আর্থিক অবস্থার উন্নতি হলে অবস্থার পরিবর্তন হবে।
তিনি বলেন, শেয়ারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পিই রেশিও একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তবে একমাত্র পিই রেশিও দিয়ে পুরোপুরি ঝুঁকি নির্ণয় করা যায় না। কোম্পানি হঠাৎ আয় ভালো করলে পিই রেশিও কমে আসে। সুতরাং বিডি অটোকারের এখন শেয়ার দাম বাড়ার পেছনে অপ্রকাশিত কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য আছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা উচিত।
তিনি আরও বলেন, আমাদের শেয়ারবাজারে সব সময় যথাযথ তথ্য পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ পক্ষ আগাম তথ্য পেয়ে যায়, তখন তারা সেই শেয়ারে শক্ত অবস্থান নিয়ে দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখে। বিডি অটোকারের ক্ষেত্রে এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না তা খতিয়ে দেখা উচিত।
ডিএসইর আর এক সদস্য বলেন, বিডি অটোকারের শেয়ার সংখ্যা খুবই কম। অল্প কিছু টাকা দিয়েই কোম্পানিটির শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যায়। শেয়ার সংখ্যা কম হওয়ায় আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী না হওয়ার পরও শেয়ারের এমন অস্বাভাবিক দাম হয়েছে। এই দাম বাড়ার পেছনে কোনো বিশেষ গ্রুপ থাকতে পারে। তা না হলে দুই শতাংশ লভ্যাংশ দেওয়া একটি কোম্পানির শেয়ার দাম দুই’শ টাকার ওপরে হয় কীভাবে?
এদিকে কোম্পানিটির শেয়ার দাম অস্বাভাবিক বাড়ার প্রেক্ষিতে সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) থেকে কোম্পানিটিকে নোটিশ পাঠানো হয়। তার জবাবে কোম্পানিটির কর্তৃপক্ষ জানায়, এই দাম বাড়ার পেছনে অপ্রকাশিত কোনো মূল্য সংবেদনশীল তথ্য নেই।
১৯৮৮ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন মাত্র ৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। আর শেয়ার সংখ্যা ৪৩ লাখ ২৬ হাজার ১৩টি। এর মধ্যে ৩০ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ শেয়ার আছে উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের কাছে। বাকি শেয়ারের মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে ৪৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের কাছে ২১ দশমিক ৯৮ শতাংশ শেয়ার আছে।
এমএএস/এমআইএইচএস