আরও পাঁচ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিতে চায় পাট মন্ত্রণালয়

মেসবাহুল হক
মেসবাহুল হক মেসবাহুল হক , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৫০ পিএম, ২৮ নভেম্বর ২০১৭

অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত মিল-কারখানাগুলোর লোকসান ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। শুধু গত অর্থবছরেই ৪৩৩ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশন (বিজেএমসি)। এরপরও বাংলাদশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন দুইটি ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন ৩টিসহ মোট ৫টি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উৎপাদনে যেতে চায় মন্ত্রণালয়টি।

আজ (বুধবার) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিতব্য অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদনের জন্য এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। তবে সরকারের এ ধরনের সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

তারা বলছেন, সরকারি কলকারখানাগুলোতে দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে ক্রমান্বয়ে লোকসান বাড়ছে। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিজেএমসি’র যে কয়টা মিল রয়েছে সেগুলোকে জনগণের করের টাকা দিয়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। আবার নতুন করে এ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারিকরণ না করে পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে আসলে সরকারের ক্ষতি আরও বেড়ে যাবে। এতে করে সরকারের বাজেটের ওপর চাপও বেড়ে যাবে।

বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফয়জুর রহমান চৌধুরী স্বাক্ষরিত প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, গত ২০০৭ সালের ১৭ এপ্রিল অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সভায় বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণাধীন দুইটি প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রতিষ্ঠান দু’টি হচ্ছে রাজশাহী রেশম কারখানা ও ঠাকুরগাঁও রেশম কারখানা।

এছাড়া ২০১২ সালের ২৫ মার্চ অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন ৩টি প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রতিষ্ঠান তিনটি হচ্ছে সিলেট টেক্সটাইল মিলস, কুড়িগ্রাম টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড ও চট্টগ্রামের ভালিকা উলেন মিলস লিমিটেড।

এতে আরও বলা হয়, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গত ২০১৪ সালের ২৩ জুলাই অনুষ্ঠিত সভায় ভবিষ্যতে কোনো মিল বিক্রয় বা হস্তান্তরের বিষয়ে প্রাইভেটাইজেশন কমিশনকে (বর্তামানে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) দায়িত্ব না দিয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় স্বাধীনভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এ সিদ্ধান্ত প্রাইভেটাইজেশন কমিশনকে জানিয়ে দেয়া হয়।

অপরদিকে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির গত ২০১৪ সালের ২১ আগস্ট অনুষ্ঠিত সভায় প্রাইভেটাইজেশনে কমিশনে ইতোপূর্বে ন্যস্ত মিলকারখানা এবং বস্ত্র ও পাট সেক্টরের সমুদয় সম্পত্তি মন্ত্রণালয়ে অধীনে ফিরিয়ে আনার জন্য আশুপদক্ষেপ নেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তাই উল্লিখিত ৫টি প্রতিষ্ঠানকে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের ফেরত প্রদানের জন্য বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (সাবেক প্রাইভেটাইজেশন কমিশন) অনুরোধ করা হলে কর্তৃপক্ষ জানায়, অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সিদ্ধান্ত ব্যতীত বর্তমানে বেসরকারিকরণের জন্য তালিকাভুক্ত ৫টি প্রতিষ্ঠান ফেরত প্রদানের কোনো সুযোগ নেই। তাই ৫টি প্রতিষ্ঠানকে মন্ত্রণালয়ের অধীনে ফিরিয়ে দেয়ার অনুমতির জন্য অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে উপস্থাপন করা হলো।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বস্ত্র ও পাট সচিব মো. ফয়জুর রহমান চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকদিন থেকে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এজন্য আমরা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উৎপাদনে যেতে চাই। তাই অনুমতির জন্য অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন অর্থনীতিবিদরা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, এটা হলে হবে মরুভূমিতে পানি ঢালা। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনে যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে তার কয়টা লাভ করছে এবং কীভাবে চলছে। তাদের অধীনে বিজেএমসির যে কয়টা মিল রয়েছে সেগুলোর বেতন দেয়ার পয়সা থাকে না, পাট কেনার পয়সা থাকে না, সরকারকে সবসময় ভর্তুকি দিতে হয়। আবার নতুন করে এ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে বেসরকারিকরণ না করে পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে এলে সরকারের ক্ষতি আরও বেড়ে যাবে। এতে করে সরকারের বাজেটের ওপর চাপ বাড়বে। আমি এ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেয়াকে সমর্থন করি না।

পলিসিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. জায়েদি সাত্তার জাগো নিউজকে বলেন, এসব উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠান সরকারি খাতে রাখার কোনো যুক্তি নেই। এসব প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেয়া উচিত। সরকারের কাজ হচ্ছে সরকার পরিচালনা করার পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তারদের জন্য নীতিনির্ধারণ ও অবকাঠামো নির্মাণ করে দেয়া। এসব ব্যবসা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালানো সরকারের কাজ নয় বলে আমরা মনে করি। এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে অনেক আগেই সমাধান এবং আলোচনা হয়েছে। এগুলো বেসরকারি খাতের শিল্প, বেসরকারি খাতে রাখায় উচিত।

তিনি আরও বলেন, এগুলোকে সরকারিভাবে উৎপাদনে নিয়ে আসলে এতে করে সরকারের লাভ হবে না বরং ক্ষতিই বাড়বে। আর এর ক্ষতিপূরণটা দিতে হবে সাধারণ মানুষকে। সাধারণ মানুষের কর দেয়ার মাধ্যমে যে রাজস্ব আদায় হবে সেখান থেকে অর্থ দিয়ে এগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা থাকবে। এটা শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও যেখানে সরকারি উদ্যোগে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান চালানো হয় সেগুলো সবই ক্ষতিতে চলে।

বেসরকারিকরণ করা হলে ওইসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমস্যায় পড়তে হবে- এ বিষয়ে মতামত কী জানতে চাইলে এ অর্থনীতিবিদ বলেন, যারা এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মচারী ছিলেন তাদের তো একটা সমাধান করা হয়েছে। তাদের যেন পথে বসতে না হয় সেজন্য বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে একটা প্রথা চালু হয়েছে। এ ব্যবস্থাটা সরকারই করে থাকে এটাকে ‘গোল্ডেন হ্যান্ডসেক’ বলা হয়।

এমইউএইচ/বিএ

আপনার মতামত লিখুন :