এলএনজিতে প্রাণ ফিরেছে চট্টগ্রামে

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০১:১৮ পিএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

চট্টগ্রামের গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন কর্মকাণ্ডে দীর্ঘদিনের স্থবিরতায় প্রাণ এসেছে এলএনজির (তরলায়িত প্রাকৃতিক গ্যাস) হাত ধরে। মাত্র বিশ দিনের ব্যবধানে একেএকে খুলতে শুরু করেছে বন্ধ থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সার কারখানাসহ বিভিন্ন মিল-কলকারখানা। সর্বশেষ শুক্রবার (১৪ সেপ্টেম্বর) থেকে উৎপাদন শুরু হয়েছে চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানায় (সিইউএফএল)। অথচ গ্যাসের অভাবে দীর্ঘ ৯ মাসেরও বেশি সময় বন্ধ ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি। একই সময়ে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে বেসরকারি কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার লিমিটেডেও (কাফকো)। এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর থেকে উৎপাদনে ফিরেছে শিকলবাহা ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ওই দিনই গ্যাস সরবরাহ শুরু হয় রাউজান তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে।

সব মিলিয়ে এলএনজির সুফল মিলতে শুরু করেছে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সংকটে নাকাল চট্টগ্রামে। গতি এসেছে শিল্প উৎপাদনেও। গত ১৮ আগস্ট থেকে আমদানি এলএনজির সরবরাহ শুরু হয় বন্দরনগরীতে। এখন গড়ে সরবরাহ মিলছে তিনশ’ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস।

চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘গ্যাসের অভাবে ৯ মাসেরও বেশি বন্ধ ছিল ইউরিয়া সার কারখানা। গত ৪ সেপ্টেম্বর এলএনজি লাইন থেকে চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর কারখানার সব মেশিনারিজ চালু হতে সময় লেগেছে প্রায় ১০ দিন। শুক্রবার থেকে ইউরিয়া সার উৎপাদন শুরু হয়েছে।’

তিনি আরো জানান, চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানার দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ৭০০ টন। ৯ মাস আগে কারখানা বন্ধ হওয়ার সময় দৈনিক ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টন সার উৎপাদন হত। গ্যাসের চাপ কম থাকায় তখন উৎপাদন কমে এসেছিল।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্টিবিউশন লিমিটেডে (কেজিডিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী খায়েজ আহমদ মজুমদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘এলএনজি সরবরাহ বাড়ায় বড় শিল্প-কারখানায় গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে। চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। চাহিদা মতো গ্যাস পাচ্ছে সিইউএফএল। এ ছাড়া রাউজান-বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও গ্যাস সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এ সরবরাহ দৈনিক ৫শ’ মিলিয়ন ঘনফুটে উন্নীত হবে। এতে চট্টগ্রামে আবাসিকের পাশাপাশি শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে গ্যাস সঙ্কট দূর হবে।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আপাতত আবাসিকে নতুন করে সংযোগ দেয়ার সম্ভাবনা নেই।’

সূত্র জানায়, কক্সবাজারের মহেশখালী এলএনজি টার্মিনাল থেকে গত ১০ সেপ্টেম্বর থেকে চট্টগ্রামের রাঙ্গাদিয়া সেন্ট্রাল জেনারেটিং স্টেশন হয়ে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হয় কেজিডিসিএলের পাইপ লাইনে। এর আগে চট্টগ্রামে পরীক্ষামূলক এলএনজি সরবরাহ শুরু হয় গত ১৮ আগস্ট। প্রথমে ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট এবং পরে ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত এলএনজি সরবরাহ হচ্ছিল। ১০ সেপ্টেম্বর থেকে তা বেড়ে হয়েছে ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

দেশের গ্যাস সঙ্কট নিরসনে ২০১০ সালে গৃহীত হয় এলএনজি প্রকল্প। এরপর ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জির সঙ্গে চুক্তি হয়। এর দুই বছরের মধ্যেই মহেশখালীর মাতারবাড়িতে নির্মিত হয় এলএনজি টার্মিনাল। মধ্যপ্রাচ্যের কাতার থেকে প্রথম দফায় গত ২৪ এপ্রিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯০০ ঘনমিটার এলএনজি নিয়ে যে জাহাজটি মাতারবাড়ি উপকূলে আসে,
সেটিই ব্যবহৃত হচ্ছে ভাসমান টার্মিনাল হিসেবে। গত ৮ সেপ্টেম্বর ১ লাখ ৩৮ হাজার ঘনমিটার এলএনজি নিয়ে আসে দ্বিতীয় জাহাজ। এ জাহাজ থেকে ভাসমান টার্মিনালে এলএনজি স্থানান্তরের কাজ চলছে বাংলাদেশ রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনায়।

চট্টগ্রামে শিল্প, বাণিজ্যিক এবং আবাসিক মিলে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক প্রায় ৪৮০ থেকে ৫শ’ মিলিয়ন ঘনফুট। কেজিডিসিএল সরবরাহ করতে পারত সর্বোচ্চ ২৮০ থেকে ৩শ’ মিলিয়ন ঘনফুট। চট্টগ্রামের সেমুতং গ্যাস ক্ষেত্র থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কর্ণফুলী গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থা সঙ্কটে পড়ে যায়। জেলায় সব মিলিয়ে গ্রাহক ৫ লাখ ৮০ হাজার। শিল্প, বাণিজ্যিক, সার কারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও চা বাগানের মতো বৃহৎ গ্রাহকের সংখ্যা ৪ হাজার ৯২। রি-ফুয়েলিং স্টেশন রয়েছে ৭০ থেকে ৮০।

এএ/এনডিএস/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :