ফারইষ্ট লাইফের অনিয়ম তদন্তে আইডিআরএ

সাঈদ শিপন
সাঈদ শিপন সাঈদ শিপন , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৫০ পিএম, ২৪ ডিসেম্বর ২০১৮

পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বেসরকারি জীবন বীমা কোম্পানি ফারইষ্ট ইসলামী লাইফ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘন করেছে বলে প্রমাণ পেয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। এ কারণে কোম্পানিটির বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সব অনিয়ম ক্ষতিয়ে দেখতে তদন্তে নেমেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

এ লক্ষ্যে বীমা কোম্পানিটির বিনিয়োগের বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণসহ ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বীমা আইন লঙ্ঘন করে বিনিয়োগ করায় কোম্পানিটির বিরুদ্ধে কেন আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে না তার কারণও জানতে চাওয়া হয়েছে।

আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ফারইষ্ট ইসলামী লাইফ বড় ধরনের অনিয়ম করেছে বলে আইডিআরএ’র কাছে তথ্য আছে। প্রতিষ্ঠানটি স্থায়ী সম্পদ ও সরকারি বন্ডে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে আইন লঙ্ঘন করছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে বিনিয়োগের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নেয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা করছে না। এ কারণে কোম্পানিটি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কী ধরনের অনিয়ম করেছে তা ক্ষতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এরই অংশ হিসেবে গত ৩ ডিসেম্বর আইডিআরএ থেকে ফারইষ্ট ইসলামী লাইফের বিনিয়োগ সংক্রান্ত কিছু তথ্য চেয়ে প্রতিষ্ঠানটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বরাবর চিঠি দেয়া হয়। চিঠিতে তথ্য দেয়ার জন্য কোম্পানিটিকে ৭ দিন সময় বেঁধে দেয়া হয়।

তবে বেঁধে দেয়া সময় অতিক্রম হলেও ফারইষ্ট লাইফ থেকে কোনো তথ্য দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন আইডিআরএ’র সদস্য গোকুল চাঁদ দাস। রোববার (২৩ ডিসেম্বর) তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ফারইষ্ট ইসলামী লাইফ থেকে এখনও কোনো জবাব দেয়া হয়নি।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম করা হলে ফারইষ্ট ইসলামী লাইফের বিষয়ে কোন ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা বসে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। এখনও বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান-সদস্যরা বসেননি। সুতরাং কী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে তা আগেই আমার পক্ষে বলা সম্ভব না।

এদিকে আইডিআরএ সূত্রে জানা গেছে, ফারইষ্ট ইসলামী লাইফ থেকে চলতি বছরের প্রথম (জানুয়ারি-মার্চ), দ্বিতীয় (এপ্রিল-জুন) এবং তৃতীয় প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিনিয়োগ সংক্রান্ত পাঠানো প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনা করে অস্পষ্টতা পাওয়া গেছে। কোম্পানিটি জমি, বিল্ডিং, ফ্লোর, ফ্ল্যাট ইত্যাদি সম্পদ-সংক্রান্ত যে তথ্য দিয়েছে তাতে আইন লঙ্ঘন করে বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে আইডিআরএ মনে করছে। এ কারণে যেসব ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা পাওয়া গেছে তার বিষয়ে ব্যাখা চাওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে ফারইষ্ট ইসলামী লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বরাবর পাঠানো কারণ দর্শানো-সংক্রান্ত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, স্থাবর সম্পত্তি (জমি, বিল্ডিং, ফ্লোর, ফ্ল্যাট ইত্যাদি) খাতে প্রথম প্রান্তিকে বিনিয়োগ ৮৬৫ কোটি ২ লাখ ৯০ হাজার ৭৭৮ টাকা। যা দ্বিতীয় প্রান্তিকে বেড়ে হয় ৮৯৯ কোটি ৫৫ লাখ ৯৬ হাজার ৩৪ টাকা। তবে তৃতীয় প্রান্তিকে এ খাতে বিনিয়োগ কমে ৮০৩ কোটি ৪৭ লাখ ৪৭ হাজার ৭৫৮ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

এ হিসাবে কোম্পানিটির জমি, বিল্ডিং, ফ্লোর, ফ্ল্যাট ইত্যাদি খাতে প্রথম প্রান্তিকের চেয়ে দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৩৪ কোটি ৫৩ লাখ ৫ হাজার ২৫৬ টাকার সম্পত্তি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকের চেয়ে তৃতীয় প্রান্তিকে ৯৬ কোটি ৮ লাখ ৪৮ হাজার ২৭৬ টাকার সম্পত্তি হ্রাস পেয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বলছে, সম্পত্তি বৃদ্ধি বা হ্রাসের অর্থ হলো সম্পত্তি ক্রয় বা বিক্রয়। বীমা কোম্পানির সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে আইডিআরএ’র অনুমোদন নেয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আবার এই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ১৯৫৮ সালের বীমা বিধিমালার ১০এ বিধির ‘জি’ উপবিধি দ্বারা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এই বিধিমালা অনুযায়ী বিনিয়োগ বীমা গ্রাহকদের দায়ের ২০ শতাংশের বেশ হবে না। কিন্তু বাস্তাবে কোম্পানির বিনিয়োগ ২০ শতাংশের অধিক রয়েছে।

এ ছাড়াও কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত অন্যান্য খাতে ফারইষ্ট ইসলামী লাইফের প্রথম প্রান্তিকে বিনিয়োগ ২৮২ কোটি ১৫ লাখ ৮ হাজার ৩৩৮ টাকা। দ্বিতীয় প্রান্তিকে খাতটিতে বিনিয়োগ ৮৩৫ কোটি ১১ লাখ ৭ হাজার ৭১৫ টাকা এবং তৃতীয় প্রান্তিকে ৭৯৬ কোটি ১ লাখ ৮১ হাজার ৩১৬ টাকা। সে হিসাবে এ খাতে কোম্পানিটির বিনিয়োগ প্রথম প্রান্তিকের চেয়ে দ্বিতীয় প্রান্তিকে ৫৫২ কোটি ৯৫ লাখ ৯৯ হাজার ৩৭৭ টাকা বেড়েছে। তবে দ্বিতীয় প্রান্তিকের চেয়ে তৃতীয় প্রান্তিকে ৩৯ কোটি ৯ লাখ ২৬ হাজার ৩৯৯ টাকা কমেছে।

এ বিনিয়োগের বিষয়ে আইডিআরএ বলছে, সম্পত্তি বৃদ্ধি বা হ্রাসের অর্থ হলো সম্পত্তি ক্রয় বা বিক্রয়। ১৯৫২ সালের ১০এ বিধির ‘কে’ উপবিধি অনুযায়ী এ খাতের (জমি, বিল্ডিং, ফ্লোর, ফ্ল্যাট বাদে আইডিআরএ অনুমোদন লাগে এমন বিনিয়োগ) বিনিয়োগের আগে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিতে হয় এবং বিনিয়োগের পরিমাণ বীমা গ্রাহকদের দায়ের সাড়ে ৭ শতাংশের বেশি হবে না। কিন্তু ফারইষ্ট ইসলামী লাইফের বিনিয়োগ সাড়ে ৭ শতাংশের ওপরে, যা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

কারণ দর্শানো নোটিশে বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য এবং আইন লঙ্ঘনের বিষয় তুলে ধরে বলা হয়েছে, বিনিয়োগ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কোন অনুমোদন নিয়ে থাকলে তার কপি ও বিস্তারিত বিবরণীসহ বিনিয়োগ বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

কারণ দর্শানো নোটিশে আরও বলা হয়েছে, বীমা আইনের বিধান মোতাবেক সরকারি সিকিউরিটিজ খাতে বীমা গ্রাহকদের দায়ের ৩০ শতাংশ বিনিয়োগ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও ফারইষ্ট ইসলামী লাইফ তা পরিপালন করেনি। এ বিষয়ে বিগত কর্তৃপক্ষের সময়েও নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আপনারা পরিপালন করেনি। বীমা আইন লঙ্ঘনের দায়ে আইনের বিধান মোতাবেক কেন কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না তার কারণসহ ব্যাখ্যা প্রয়োজন।

কারণ দর্শানো ওই নোটিশে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ফারইষ্ট ইসলামী লাইফের সব স্থায়ী আমানতের দলিলের ফটোকপি স্থায়ী আমানতের বিবরণীসহ চাওয়া হয়েছে। যা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার সত্যায়িত করতে হবে। একই সঙ্গে জীবন বীমাটির সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলোর নামে ক্রয় করা সম্পদের তারিখ অনুযায়ী বিবরণী চেয়েছে আইডিআরএ।

সার্বিক বিষয়ে ফারইষ্ট ইসলামী লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হেমায়েত উল্লাহর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। আর কোম্পানিটির চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলামের মোবাইল ফোনে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে অপর প্রান্ত থেকে বলা হয়, স্যার নামাজে আছেন। আমি কামাল বলছি। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না। আপনি ১০-১৫ মিনিট পরে ফোন দেন। এরপর ওই মোবাইলে একাধিকবার ফোন দেয়া হলে বারবার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়।

এমএএস/এমএমজেড/এমএস