সঞ্চয়পত্রে বর্ধিত কর, আপনার মুনাফা কমবে কত?

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:০৭ পিএম, ২৫ জুলাই ২০১৯

সংসদের ভেতরে ও বাইরে বিরূপ সমালোচনা এবং ক্ষুদ্র আয়ের মানুষের উদ্বেগ উপেক্ষা করে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশের প্রস্তাব বহাল রেখেই গত ২৯ জুন অর্থবিল, ২০১৯ পাস হয়। ইতোমধ্যে উৎসে কর ১০ শতাংশ হার কাটাও শুরু হয়েছে।

উৎসে কর বাড়ানোর ফলে এ খাত খেকে বছরে সরকারের ৩ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় হবে বলে আশা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

এনবিআর সূত্র বলছে, এতদিন এ খাত থেকে আয় হতো ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সেটা এখন বেড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। তবে যদি সঞ্চয়পত্র বিক্রি কম বা বেশি হয়, তাহলে এ খাতে সরকারের সুদ পরিশোধের পরিমাণ বেশি বা কম হতে পারে। তখন এ খাতে সরকারের আয়ও কম বা বেশি হতে পারে। আসল হিসাব অর্থবছরের শেষে পাওয়া যাবে।

সূত্র জানায়, পারিবারিক সঞ্চয়পত্র শুধু নারীরা ক্রয় করতে পারেন। পেনশনার সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন অবসরভোগী চাকরিজীবীরা। উৎসে কর বাড়ার আগ পর্যন্ত নিয়ম অনুযায়ী একজন অবসরভোগী পেনশনার সঞ্চয়পত্রে সর্বাধিক ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ বা ক্রয় করতে পারতেন। ৫ শতাংশ কর কর্তনের পর ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগের ওপর বার্ষিক মুনাফা পেতেন ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৬০০ টাকা। উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ কর্তন করার ফলে এখন মুনাফা ৫ লাখ ৫৮ হাজার ৬০০ টাকা থেকে কমে হবে ৫ লাখ ২৯ হাজার ২০০ টাকা। একজন অবসরভোগী বার্ষিক ২৯ হাজার ৪০০ টাকা কম মুনাফা পাবেন। একইভাবে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত মুনাফা কমে যাবে।

এদিকে পাঁচ বছরের ব্যবধানে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। তবে মূল বাজেটে প্রক্ষেপিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এই ঋণ বৃদ্ধির পরিমাণ পাঁচগুণেরও বেশি।

প্রতি বছর সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার কী পরিমাণ ঋণ নেবে, তার একটি প্রক্ষেপণ বাজেটে উল্লেখ থাকে। কিন্তু বিগত পাঁচ বছরে সরকারের পক্ষ থেকে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্য স্থির থাকা সম্ভব হয়নি। যেমন ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল মাত্র ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বছর শেষে ঋণ নেয়া হয় ২৮ হাজার ৭০৫ কোটি টাকা। অন্যান্য বছর একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

এর ফলে প্রতিবছর সঞ্চয়পত্রের সুদবাবদ সরকারকে ব্যয় করতে হচ্ছে ৫৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। যেখানে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতাবাবদ বছরে ব্যয় হয় ৫৪ হাজার কোটি টাকা। তাই সঞ্চপত্রকে দেশের অর্থনীতির জন্য মাথাব্যথার কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই ২০১৮-এপ্রিল ২০১৯) সঞ্চয়পত্র থেকে নিট বিনিয়োগ এসেছে ৪৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকার এ সময়ে সঞ্চয়পত্র থেকে ৪৩ হাজার ৪৭৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা পুরো অর্থবছরের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৬৬ শতাংশ বেশি। জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি (২০১৮-১৯) অর্থবছরের ১২ মাসে সঞ্চয়পত্র থেকে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। এর মধ্যে জুলাই-এপ্রিল সময়ে ঋণ এসেছে ৪৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৬৫ শতাংশ। সব মিলিয়ে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৮১ হাজার ২৪১ কোটি টাকা।

এদিকে চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে এক লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হয়। এ ছাড়া নজরদারিও বাড়ানো হয়। তবে বিভিন্ন শর্ত আরোপ করার পরও সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেনি।

প্রাপ্ত তথ্য বলছে, একক মাস হিসাবে এপ্রিলে জাতীয় সঞ্চয় স্কিমগুলোতে নিট (প্রকৃত) বিনিয়োগ আসে তিন হাজার ৭৪১ কোটি টাকা, যা গত বছরের এপ্রিলে ছিল তিন হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা।

এর আগের অর্থবছর সঞ্চয়পত্র খাত থেকে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। কিন্তু অতিরিক্ত বিক্রি হওয়ায় ৪৬ হাজার ২৮৯ কোটি টাকা ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছিল সরকার।

এমইউএইচ/জেডএ/এমকেএইচ