ট্রেড ইউনিয়ন নির্বাচনে দৃষ্টান্ত ‘ইন্টারস্টফ অ্যাপারেল’
কারখানায় ইউনিয়ন গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলেই একসময় তা ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠতেন মালিকপক্ষ। তবে রানা প্লাজা ধসের পর বদলাতে শুরু করে সেই পরিস্থিতি। আন্তর্জাতিক ও সরকারের চাপে একের পর এক ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন বাড়তে থাকে। তথ্য বলছে, ১৯৮৩ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ৩০ বছরে দেশে ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে উঠেছিল মাত্র ১৩৮টি। অথচ ২০১২ সালের পর প্রতি বছরে গড়ে শতাধিক ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন পেয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন মহলের চাপ এবং নানান পন্থায় ট্রেড ইউনিয়নের সংখ্যা বাড়লেও বেশিরভাগ ইউনিয়নই কাগুজে। কারখানা পর্যায়ে কার্যক্রমে তাদের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। কারণ কোনো কোনো কারখানা থেকে মালিকপক্ষই নিজেদের পছন্দের শ্রমিকদের দিয়ে ট্রেড ইউনিয়ন নিবন্ধন করিয়ে নিচ্ছে। এমনকি নিজেদের পছন্দের শ্রমিককে সেখানে প্রতিনিধি নির্বাচিত করিয়েও নিচ্ছে।
ফলে ট্রেড ইউনিয়ন থাকলেও মূলত মালিকপক্ষের কথা ও কাজই বাস্তবায়ন করে থাকে ‘পুতুল ট্রেড ইউনিয়ন’। কোনো শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করা হলেও তার বিরুদ্ধে জোর প্রতিবাদ করার সাহস থাকে না ইউনিয়ন নেতাদের। দেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে এমন ট্রেড ইউনিয়ন গড়ে তোলার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।

তবে অভিযোগের বিপরীতও আছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের অন্যায় আবদারকে পাত্তাই দেয় না শ্রমিকপক্ষ- এমন বেশ কিছু কারখানাও রয়েছে। যেখানে শ্রমিক প্রতিনিধি কে হবেন, তা স্বচ্ছ ব্যালট পেপারের মাধ্যমে নির্বাচন করেন শ্রমিকরাই। নির্বাচন নিয়ে প্রচার-প্রচারণার সুযোগও থাকে।
নানা প্রতিশ্রুতি সম্বলিত লিফলেট ও ইশতেহার তৈরি করে ভোটারদের কাছে ভোট চাওয়া হয়। ব্যানার টাঙানো হয় কারখানার গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে। গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা পরবর্তী দুই বছরের জন্য শ্রমিকদের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন। অংশ নেন বিভিন্ন সভা-সেমিনার, আইএলওর জরিপ বা বায়ারদের নানা অনুষ্ঠানে। যেখানে মালিকপক্ষের কোনো হস্তক্ষেপ থাকে না।
এমনই এক কারখানা রেনেসা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারস্টফ অ্যাপারেল লিমিটেড’। গাজীপুর কালিয়াকৈর চন্দ্রায় অবস্থিত এ পোশাক কারখানাটি। তবে নির্বাচনের এত প্রচার-প্রচারণার মধ্যেও পোশাক কারখানার কাজের কোনো ব্যাঘাত ঘটে না। কাজের ফাঁকে কিংবা বিরতিতে প্রচারের কাজটি সেরে নেন প্রার্থীরা। তাছাড়া নির্বাচন উপলক্ষে প্রার্থীদের প্রচারের জন্য কিছুটা ছাড় দিয়ে থাকে কারখানাটি।

ইন্টারস্টফ অ্যাপারেল লিমিটেড বলছে, প্রতি দুই বছর পর পর কারখানাটিতে শ্রমিক প্রতিনিধি নির্বাচন হয়ে থাকে। এখানে প্রার্থী যাতে ভোটারদের কাছে ভোট চাইতে পারে এ জন্য ভোটের সময়ে প্রার্থীকে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে শ্রমিকরা তাদের নেতাকে বুঝে নেওয়ার সুযোগ পান। তারাই কারখানার ছয় হাজার শ্রমিকের নেতৃত্ব দেন বায়ার, আইএলও বা মালিকপক্ষের কাছে।
তবে ইন্টারস্টফ অ্যাপারেল লিমিটেডে শ্রমিক নির্বাচনে যে কেউ প্রার্থী হতে পারবেন না। তার মনোনয়ন ফরম বৈধ হতে হবে নির্বাচন পরিচালনা বোর্ড হতে। এ জন্য বেশ কিছু শর্ত মানতে হয় প্রার্থীদের। প্রথমত, প্রার্থীকে অবশ্যই কারখানার নিয়মিত শ্রমিক হিসেবে অন্তত ছয় মাস কাজ করতে হবে। কারখানার মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখাসহ কোনো শ্রমিকের ক্ষতিসাধন করেনি, কোনো শ্রমিককে আঘাত (কষ্ট) করেনি- এমন নজির থাকতে হবে। তবেই তিনি প্রার্থী হিসেবে বৈধ হবেন।
কারখানার এ ট্রেড ইউনিয়নের নির্বাচন পরিচালনায় রয়েছে স্বচ্ছ নির্বাচন কমিশন। এ কমিশনে পাঁচজন সদস্যের তিনজনই শ্রমিকদের মধ্যে থেকে আসা। অন্য দুজনের একজন অ্যাডমিন এবং হিসাব বিভাগ থেকে। ভোটের দিন নির্বাচন পরিচালনায় অংশ নেওয়া পোলিং এজেন্ট, নির্বাচন কমিশনের সম্মানী, খাবার ও নাস্তার অর্থের যোগান দেয় কারখানা। নির্বাচন যাতে সুষ্ঠুভাবে হয় এ জন্য কারখানাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পরিদর্শনে আসেন।

কারখানাটির শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সব শ্রমিকই তাদের নেতা নির্বাচনের অংশ নেন। কাজের ফাঁকে এসে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। কেউ কেউ দুপুরের খাবারের বিরতিতে এসে ভোট দেন। কারখানার প্রতিটি ফ্লোরের দুপাশে বসানো হয় বুথ। বুথগুলো কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ৫টা পর্যন্ত চলা নির্বাচনের ফল রাতের মধ্যে ঘোষণা করা হয়।
২২টি ফ্লোরে পুরুষ ও নারীদের আনুপাতিক হারে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়। কোনো ফ্লোরে পুরুষ এবং নারীর সংখ্যা বেশি হলে একজন পুরুষ ও একজন নারী নির্বাচনে বিজয়ী হবেন। যেকোনো একটির সংখ্যা (পুরুষ-নারী) বেশি হলে সেখানে পুরুষ অথবা নারী একজন নির্বাচিত হয়ে থাকেন। নির্বাচিত এসব ফ্লোর প্রতিনিধিরা গোপন ভোটের মাধ্যমে একজন ভিপি নির্বাচন করেন। ভিপিসহ বিজয়ীরা দুই বছরের জন্য কাজ করার সুযোগ পান। তবে এসময়ের মধ্যে কোনো শ্রমিক চাকরি ছাড়লে নির্বাচনে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বিজয়ী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
এদিকে, কারখানার মালিকপক্ষও শ্রমিকদের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা রেখেছন। দীর্ঘদিন কর্মরত শ্রমিকরা চাকরি শেষে পাবেন মোট অঙ্কের অর্থ। নাইট ডিউটি করা শ্রমিকদের বেতন বা ওভারটাইম ছাড়াও রয়েছে খাবার ও নাস্তার বিল। করোনার শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শ্রমিকদের জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা দেওয়ার জন্য কারখানাতেই সার্বক্ষণিক চিকিৎসক থাকেন।

নির্বাচন পরিচালনা কমিটিতে শ্রমিকপক্ষের হয়ে দায়িত্ব পালন করা রিক্তা রানী সাহা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের নির্বাচনটি উৎসবমুখর পরিবেশে হয়। শ্রমিক প্রতিনিধি নির্বাচন আমরা উপভোগ করি। এখানে সব প্রার্থী সবার কাছে নিজের জন্য ভোট চেয়ে থাকেন। কোনো অন্যায়কারী বা অভিযোগ রয়েছে, এমন কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন না।’
ইন্টারস্টফ অ্যাপারেল লিমিটেডে ডিভিশনাল এজিএম এবং হেড অব কমপ্ল্যায়েন্স প্রদীপ কুমার নাথ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখানে কোনো বায়ার (ক্রেতা) এলে বা আইএলওর কোনো প্রতিনিধি পরিদর্শনে এলে শ্রমিক প্রতিনিধিদের পুরো টিম সঙ্গে থাকেন। সব কাজ-কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়। সব কাজে শ্রমিকদের অংশগ্রহণ করানো সম্ভব হয় না। এ জন্য শ্রমিকের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি এসব জায়গায় শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করেন।’
তিনি বলেন, ‘শ্রমিকরা তাদের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধি নির্বাচিত করেন। এখানে মালিকপক্ষের কোনো হস্তক্ষেপ থাকে না। পূর্ণ গণতান্ত্রিকভাবেই শ্রমিক প্রতিনিধি নির্বাচন হয়ে থাকে।’
বাংলাদেশ ওএসকে গার্মেন্টস অ্যান্ড টেক্সটাইল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ দত্ত জাগো নিউজকে বলেন, ‘এ ধরনের নির্বাচন অবশ্যই ইতিবাচক। তবে অনেক কারখানার মালিকপক্ষই এমন নির্বাচন চান না। তবে এখন আন্তর্জাতিক বা সরকারি চাপে অনেক কারখানায় ভালো নির্বাচন করছে। পালিত শ্রমিক নেতার চেয়ে ফেয়ার নির্বাচনের দৃষ্টান্ত ইন্টারস্টফ অ্যাপারেল তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে ইউনিয়ন শক্ত হয়, কথা বলা বা শ্রমিকের অধিকারের বিষয়টা গুরুত্ব পায়।’
ইএআর/এএএইচ/এমএস