কমিশনের প্রশ্ন

ভবঘুরে নিবাস নির্মাণ প্রস্তাবে পরামর্শক ব্যয় ২০ কোটি

মফিজুল সাদিক
মফিজুল সাদিক মফিজুল সাদিক , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:৩৫ এএম, ২৫ মার্চ ২০২৪

বিদ্যমান ছয়টি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রকে ভবঘুরে নিবাসে রূপ দিতে প্রস্তাব দিয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। এটি একেবারেই প্রচলিত কাজ। এ কাজের জন্যই পাঁচ ধরনের পরামর্শক বাবদ ২০ কোটি ৩৪ লাখ ৩০ হাজার টাকার বিলাসী প্রস্তাব করেছে অধিদপ্তর। এমন অহেতুক আবদার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয়ের আরও নানান খাত নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সাধারণ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) তৈরি করা হয়। অথচ সমীক্ষা প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে প্রকল্প প্রস্তাবনা করেনি সমাজসেবা অধিদপ্তর। সমীক্ষা প্রকল্পের ব্যয় প্রাক্কলন নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০৭ কোটি ১২ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। কিন্তু মূল প্রকল্পের প্রস্তাবিত মোট প্রাক্কলন ধরা হয়েছে ৯০৭ কোটি ৪৯ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। ফলে সমীক্ষা প্রতিবেদন থেকে আরও ২০০ কোটি টাকা বাড়তি প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। এ বিষয়ে সভা করে বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছে কমিশন। প্রকল্প এলাকাভিত্তিক ব্যয় বিভাজন ছক যথাযথভাবে পূরণ করা হয়নি। এছাড়া প্রকল্প গ্রহণের যৌক্তিকতা পটভূমিতে যথাযথভাবে উল্লেখ থাকা আবশ্যক বলে জানায় কমিশন।

কমিশনের প্রশ্ন, ভবঘুরে নিবাস নির্মাণ প্রস্তাবে পরামর্শক ব্যয় ২০ কোটি

‘বিদ্যমান ছয়টি সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র (ভবঘুরে নিবাস) পুনঃনির্মাণ’ প্রকল্পে এ ঘটনা ঘটেছে। প্রকল্পটি অনুমোদনের পর তিন বছর মেয়াদে বাস্তবায়ন করা হবে। নগরীর মিরপুর-১, নারায়ণগঞ্জের গোদানাইল, গাজীপুরের পুবাইল ও কাশিমপুর, মানিকগঞ্জের বেতিলা ও ময়মনসিংহের ধলা সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে ভবঘুরে নিবাস পুনঃনির্মাণ করা হবে। পিইসি সভার জন্য প্রকল্পটি নিয়ে কার্যপত্র তৈরি করা হয়েছে। এতে নানা ধরনের মতামত তুলে ধরেছে কমিশন।

এটা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। আমরা পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠিয়েছি, যাচাই-বাছাই চলছে। আমরা এমন অনেক প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠাই। সরকার চাইলে অনুমোদন হবে, না হলে না হবে।- সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মোহা. সাদিকুল হক

প্রকল্প প্রসঙ্গে সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মোহা. সাদিকুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। আমরা পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠিয়েছি, যাচাই-বাছাই চলছে। আমরা এমন অনেক প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠাই। সরকার চাইলে অনুমোদন হবে, না হলে না হবে।’

আরও পড়ুন

জানা যায়, প্রকল্পের আওতায় ড্রইং-ডিজাইন কনসালট্যান্ট খাতে সাত কোটি, ডাটাবেজ ম্যানেজমেন্ট ও অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার পরামর্শক খাতে আড়াই কোটি, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কনসালট্যান্ট খাতে এক কোটি ২৬ লাখ, আইসিটি হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার কনসালট্যান্ট খাতে এক কোটি ২৬ লাখ এবং ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম খাতে পরামর্শকের জন্য আট কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশ খাতই প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়।

কমিশনের প্রশ্ন, ভবঘুরে নিবাস নির্মাণ প্রস্তাবে পরামর্শক ব্যয় ২০ কোটি

ভবঘুরে নিবাসে বাড়তি পরামর্শক ব্যয় প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এ বি মির্জা আজিজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘কেন ভবঘুরে নিবাস নির্মাণে এত টাকার পরামর্শক ব্যয় ধরা হবে? ভবন নির্মাণের জন্য দেশে কি মানুষের আকাল পড়েছে? এটা যৌক্তিক নয়। ভবঘুরেদের জন্য নিবাস নির্মাণের বদলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা উচিত। এগুলো শুধু পয়সা নষ্ট। এই আকালের সময় এত টাকা দেওয়ার আগে চিন্তা করা জরুরি।’

প্রকল্পের মূল কার্যক্রম
এক লাখ ১৯ হাজার ৩০০ বর্গমিটার ভবন ও স্থাপনা নির্মাণ, ৮১৭৯টি আসবাবপত্র কেনা, ১২ হাজার ২২১টি যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি কেনা, কনসালটেন্সি (সফ্টওয়্যার ফার্ম ও ব্যক্তি) নিয়োগ, আউটসোর্সিং সেবাক্রয় পাঁচটি, এক হাজার ৭৯৯ জনকে প্রশিক্ষণ, ১৮ হাজার ৭৭০টি বিছানাপত্র, ২৮ হাজার ৪৪৪৫টি ব্যবহার্য সামগ্রী ও ২২ হাজার ৮০০টি পোশাক কেনাসহ বিজ্ঞাপন খাতে ব্যয় করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশন জানায়, ভবঘুরে নিবাসের জন্য বিছানাপত্র কেনায় তিন কোটি ৫৭ লাখ ৫৭ হাজার, ব্যবহার্য সামগ্রী কেনায় ৭ কোটি ২২ লাখ ৭৯ হাজার, পোশাক কেনায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ ১০ হাজার, ক্রীড়া সামগ্রীতে ৪ কোটি ৮৪ লাখ, আসবাবপত্র কেনায় ১৮ কোটি ৩৭ লাখ এবং যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি খাতে ১২ কোটি ৩৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

কেন ভবঘুরে নিবাস নির্মাণে এত টাকার পরামর্শক ব্যয় ধরা হবে? ভবন নির্মাণের জন্য দেশে কি মানুষের আকাল পড়েছে? এটা যৌক্তিক নয়। ভবঘুরেদের জন্য নিবাস নির্মাণের বদলে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা উচিত। এগুলো শুধু পয়সা নষ্ট। এ আকালের সময় এত টাকা দেওয়ার আগে চিন্তা করা জরুরি।- এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম

ব্যয় প্রাক্কলনের অধিকাংশ ক্ষেত্রে একক দর অত্যধিক বলে প্রমাণিত। ব্যয় আরও কমানোর সুপারিশ করা হয়। বিভিন্ন খাতের একক, পরিমাণ যেনতেনভাবে উল্লেখ না করে ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা প্রয়োজন। প্রকল্পে সম্মানী ভাতা নামে একটি খাত উল্লেখ থাকলেও সম্মানী নামে আরও একটি খাত প্রস্তাব করা হয়েছে। তাছাড়া প্রকল্পে দুটি যানবাহন হায়ারিং বাবদ দুই কোটি ৮৮ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হলেও গ্যাস ও জ্বালানি বাবদ ধরা হয়েছে তিন লাখ টাকা।

প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য

ভবঘুরে ও নিরাশ্রয় ব্যক্তি (পুনর্বাসন) আইন, ২০১১ (২০১১ সালের ১৫ নম্বর আইন) অনুসারে ভবঘুরে ও নিরাশ্রয় ব্যক্তিকে এ আইনে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আশ্রয় দান, নিয়ন্ত্রণ, পুনর্বাসন ও সামাজিকীকরণ ইত্যাদি।

এমওএস/এএসএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।