সভাপতির ‘দৌরাত্ম্যে দিশেহারা’মোহাম্মদপুর বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:০৫ পিএম, ২১ জানুয়ারি ২০১৯

স্বেচ্ছাচারিতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারে মোহাম্মদপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সভাপতি আমিনুর ইসলাম খোকা বিদ্যালয়কে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সভাপতির বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ শিক্ষক, শিক্ষক প্রতিনিধি ও শিক্ষার্থীদের।

প্রকাশনা কোম্পানির কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে নিম্নমানের বই সিলেবাসে অন্তর্ভুক্তি, পাঠদানের সময় ক্লাসে গিয়ে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত ও চাকরিচ্যুত করার ভয়-ভীতি, খণ্ডকালিন শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্য, বিদ্যালয়ের তহবিলের অর্থ ব্যক্তিগত খাতে ব্যয়সহ নানা অনিয়ম করে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ খোকার বিরুদ্ধে।

প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষক প্রতিনিধি অভিযোগ করেন, সভাপতি আমাদের প্রাপ্ত নানা সুবিধা থেকে বঞ্চিত করেছেন। তিনি যখন-তখন আমাদের সঙ্গে খাপার ব্যবহার করেন। তার বসার জন্য স্কুলের ফান্ড থেকে ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে চেম্বার বানানো হয়েছে। সেখানে তার বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে আড্ডা দেন। তাদের আড্ডায় আপ্যায়ন বাবদ স্কুল ফান্ডের অর্থ ব্যয় করা হয়। অথচ বিজ্ঞানের ছাত্রীদের ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য ল্যাব তৈরির কথা থাকলেও তা আজও করা হয়নি। এ কারণে গত ৫ বছরে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী ভর্তি কমে গেছে। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে প্রথম থেকে নবম-দশম ক্লাস পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৩০০ ছাত্রী রয়েছে। অথচ ৫ বছর আগে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ হাজারের বেশি।

বর্তমান কমিটির শিক্ষক প্রতিনিধি মোকাররম হোসেন সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, ‘খোকা সাহেব বিদ্যালয়ের একাডেমিক কমিটির চেয়ারম্যান হয়ে বিদ্যালয় একাডেমির সমস্ত কার্যক্রম তার হাতের মুঠোয় নিয়ে নিয়েছেন। এমপিওবিহীন শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট ও পিএফ ফান্ড বন্ধ করে দিয়েছেন। তার দৌরাত্ম্যে শিক্ষকরা দিশেহারা।’

তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘২০১৭ সালের ৮ আগস্ট প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে প্রত্যেক শিক্ষককে তিনি লাঞ্ছিত করেন। উচ্চতর ডিগ্রিধারী শিক্ষকদের সভাপতির হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে সব শিক্ষক পরের দিনই ক্লাস বর্জন করেন এবং সভাপতির পদত্যাগ দাবি করেন। ওইদিন আমাকেও বিদ্যালয় থেকে বের করে দেয়ার হুমকি দেন তিনি।’

একাধিক শিক্ষক প্রতিনিধি অভিযোগ করে বলেন, তিনি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র অর্থের বিনিময়ে পরীক্ষার পূর্বে তার পছন্দের প্রার্থীদের কাছে ফাঁস করে দেন। তার অনিয়মের জন্য বিদ্যালয়ের পড়ালেখার মান কমে গেছে। অনেকেই বিদ্যালয় ছেড়ে অন্য স্কুলে ভর্তি হচ্ছে। গত ৬ বছরে ২৪০০ ছাত্রী থেকে কমে ১৩০০ জনে নেমেছে বলেও জানান তারা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ছাত্রী জানান, চেয়ারম্যান স্যার ক্লাসে ঢুকে আমাদের ক্লাস টিচারদের নানাভাবে অপমান করেন। আমাদের সামনে স্যারদের বিভিন্ন ভুল ধরে তাদের বকাঝকা ও শাসানো হয়। নীরব হয়ে আমরা শুধু দেখে যাই।

তারা আরও বলেন, যদি আমাদের স্যাররা কোনো অন্যায় করে থাকেন তবে সভারুমে বা চেয়ারম্যান স্যারের রুমে নিয়ে শাসন করতে পারেন। কিন্তু তা না করে আমাদের সামনেই স্যারদের অপমান করা হয়। যা আমাদের খুব কষ্ট দেয়।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আমিনুল ইসলাম খোকা বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা। আমি গত সাত বছর ধরে এ প্রতিষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। এর মধ্যে শিক্ষকদের বেতন-বোনাস বৃদ্ধিসহ নানা ধরনের সুবিধা দেয়া হয়েছে। এ সবের কারণে শিক্ষার্থীদের ভালো ফলের দিকে জোর দিয়েছি। শিক্ষার্থীরা খারাপ রেজাল্ট করলে শিক্ষকদের জবাবদিহিতার মধ্যে আনা হয়েছে। এতে কিছু শিক্ষক নারাজ হয়ে গেছেন। তাদের ইচ্ছেমতো চলতে না দেয়ায় তারা আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে নালিশ করছেন। স্বচ্ছভাবে প্রতিষ্ঠান চালাতে গিয়ে আমি তাদের শত্রু হয়ে গেছি।’

ক্লাসে গিয়ে শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করার বিষয়ে জানতে চাইলে আমিনুল ইসলাম খোকা বলেন, ‘লাঞ্ছিত করার বিষয়টি সত্য নয়। কোনো ক্লাসে ফল খারাপ হলে আমি কমিটির সদস্যদের নিয়ে ক্লাস ভিজিট করতে গিয়ে সেই ক্লাস শিক্ষকদের সর্তক করে দিয়ে থাকি। রেজাল্ট কেন খারাপ হয়েছে তা জানতে চাওয়া হয়। এসব লাঞ্ছিতের মধ্যে পড়ে না।’

শিক্ষার্থী হ্রাস পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে আগে ৬-৭ বিষয়ে ফেল করলেও তাদের উপরের ক্লাসে উঠানো হতো। আমি এসে তা বন্ধ করেছি। এ কারণে আগের চেয়ে কিছুটা শিক্ষার্থী কমে গেছে।’

জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন সরকার বলেন, ‘সভাপতির বিরুদ্ধে কিছু শিক্ষক অভিযোগ তুলেছেন।’ তবে প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে চলছে বলে জানান তিনি।

এমএইচএম/এনডিএস/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :