যারা বিপজ্জনক সময়ে কথা বলে, ইতিহাস তাদের মনে রাখে: পানাহিকে চিঠি
নির্বাসিত ইরানি চলচ্চিত্রকার জাফর পানাহিকে খোলা চিঠি লিখেছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকার প্রসুন রহমান। ইরানের এই বিপজ্জনক এই সময়ে পানাহির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে ‘সিনেমা এবং বিবেক: জাফর পানাহির সঙ্গে সংহতি’ শিরোনামে ফেসবুকে চিঠিটি পোস্ট করেন তিনি। সেখানে প্রসুন লিখেছেন, ‘যারা বিপজ্জনক সময়ে কথা বলে, ইতিহাস তাদের মনে রাখে।’
আজ (১৫ জানুয়ারি) বৃহস্পতিবার বিকেলে পোস্ট করা ওই চিঠিতে প্রসুন লিখেছেন, ‘এই চিঠি আপনার কাছে আদৌ পৌঁছাবে কি না, জানি না। তবু লিখছি আপনার সঙ্গে সংহতির প্রকাশ করতে, দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ বাংলাদেশ থেকে, যেখানে আমাদের অনেকেই ইতালীয় নব্যবাস্তববাদের নৈতিক স্বচ্ছতা ও তার প্রভাবে গড়ে ওঠা ইরানি চলচ্চিত্রের নীরব সাহস থেকে সিনেমা বানানো শিখতে শিখতে বড় হয়েছি। এই ধারাগুলো আমাদের শিখিয়েছে — শব্দের বাড়াবাড়ি ছাড়াই সত্য কীভাবে অস্তিত্বশীল হতে পারে, সাধারণ মানুষের জীবনের মধ্যদিয়েই কীভাবে প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে, আর বাস্তবতা কীভাবে ভিন্নমতের ভাষা হয়ে উঠতে পারে।’
জাফর পানাহির জীবন ও সিনেমাযাত্রার সংগ্রাম স্মরণে প্রসুন লিখেছেন, ‘আপনার পথচলা — নিষেধাজ্ঞা, গ্রেপ্তার, কারাবাস, ভ্রমণ-বাধা ও নিরন্তর নজরদারিতে থাকা কোনো বিচ্ছিন্ন ট্র্যাজেডি নয়। এটি সেই দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ, যেখানে ইরানের শিল্পী ও চলচ্চিত্রকাররা ক্ষমতার কাছে কল্পনাকে সমর্পণ করতে অস্বীকার করেছেন বলে নির্যাতিত হয়েছেন। মোহাম্মদ রাসুলফ, কেইওয়ান কারিমি থেকে শুরু করে অভিনেতা, নারী চলচ্চিত্রকার, কবি, সংগীতশিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম শাস্তি পেয়েছেন হিংসা বা ঘৃণার জন্য নয়, বরং সততা ও সাহসের জন্য। সিনেমা ও শিল্প ভয়ংকর হয়ে উঠেছিল, কারণ সেগুলো এমন এক বাস্তবতা তুলে ধরেছিল, যেটিকে ক্ষমতা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।’
‘আব্বাস কিয়ারোস্তামি থেকে ফরুখ ফরুখজাদ, আপনার নিজের কাজ থেকে শুরু করে আপনার সমসাময়িকদের সৃষ্টিতে, ইরানি চলচ্চিত্রকাররা এমন এক চলচ্চিত্রভাষা গড়ে তুলেছেন, যেখানে নীরবতা অনেক সময় স্লোগানের চেয়েও বিস্তারিত। আর এই মানবিকতাই কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থাগুলোর সবচেয়ে বড় ভয়।’
উত্তাল ইরানের প্রসঙ্গ টেনে প্রসুন লিখেছেন, ‘সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোতে যখন আপনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইরানের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান এবং বলেন যে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র তার বৈধতা হারিয়েছে ও টিকে থাকতে যে কোনো কিছুর আশ্রয় নেবে, তখন আপনি কোনো উসকানিদাতা হিসেবে কথা বলছেন না। আপনি কথা বলছেন একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী হিসেবে। আপনি সেই কাজটিই করছেন, যা সিনেমা তার সবচেয়ে সৎ রূপে সবসময় করেছে, যেখানে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হয়, সেখানে বাস্তবতার কথাই উচ্চারণ করা হয়, এবং নীরবতার মধ্যদিয়ে নিষ্ঠুরতাকে স্বাভাবিক করে তুলতে অস্বীকার করা হয়।’
‘যেসব দেশের চলচ্চিত্রকারদের নিজেদেরও আছে সেন্সরশিপ, ভয় ও আপস করার ইতিহাস, আমাদের কাছে আপনার কণ্ঠ গভীরভাবে অনুরণিত হয়। যখন অনুমতি দেওয়া হয় না, যখন সীমান্ত বন্ধ হয়ে যায়, যখন স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়, তখন সিনেমা হারিয়ে যায় না, বরং তা বিবেকের কর্মে রূপ নেয়।’
পানাহির সিনেমার উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, ‘আপনি একবার “দিস ইজ নট আ ফিল্ম” নামের একটি চলচ্চিত্র বানিয়েছিলেন। তবু সেটি ছিল চলচ্চিত্রই, কারণ সত্যের জন্য অনুমতির প্রয়োজন হয় না। আপনার কাজ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্যামেরা ডায়েরি হয়ে উঠতে পারে, ছবি প্রমাণে পরিণত হতে পারে, আর সব বাহ্যিক সহায়তা ছিনিয়ে নেওয়া হলেও গল্প বলার শক্তি টিকে থাকে।’
‘কেরালা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে আপনার শেষ চলচ্চিত্র ‘নো বিয়ার্স’ দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার, যার প্রভাব প্রদর্শনী শেষ হওয়ার অনেক দিন পরও আমাকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। আপনার সর্বশেষ সিনেমা ‘ইট ওয়াজ জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট’ এখনো আমাদের অনেকে দেখার অপেক্ষায় আছেন, কিন্তু কবে সেটা সম্ভব হবে জানি না। কারণ ইরানি চলচ্চিত্র আমাদের বাণিজ্যিক প্রেক্ষাগৃহে পৌঁছায় না। তবু দূরত্ব কখনই আপনার কাজের প্রভাবকে দুর্বল করতে পারেনি। একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের পথে আপনার চলচ্চিত্রের এই যাত্রায়, আমি চাই এই স্বীকৃতি যেন মূল্যায়ন নয়, বরং বিশ্বকে শোনার আরেকটি দরজা খুলে দেয়।’
খোলা চিঠিতে প্রসুন উল্লেখ করেছেন তাদের কথাও, যারা ক্যারিয়ার বাঁচাতে প্রতিবাদ করা থেকে বিরত থাকছেন। তিনি লিখেছেন, ‘এই চিঠি তাদের জন্যও, যেসব প্রতিষ্ঠান ইরানি সিনেমাকে উদযাপন করে, কিন্তু ইরানের দমন-পীড়নের মুখোমুখি হতে দ্বিধা করে, যেসব উৎসব সাহসের প্রশংসা করে, কিন্তু দায়িত্ব এড়িয়ে যায়, আর সেই শিল্পীদের জন্য, যারা মনে করেন নীরবতা তাদের ক্যারিয়ার রক্ষা করবে। ইতিহাস খুব কমই মনে রাখে কারা স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল। ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে, যারা কথা বলেছিল, যখন কথা বলা ছিল বিপজ্জনক।’
প্রসুন রহমান পরিচালিত সর্বশেষ সিনেমা ‘প্রিয় সত্যজিৎ’ মুক্তি পায় গত বছর। তার অন্যান্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘ঢাকা ড্রিম’, ‘সুতপার ঠিকানা’, ‘ফেরা’।
আরএমডি